লিওনেল মেসির অবসর ঘোষণা: আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের সমাপ্তি

যা জানা জরুরি
- লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন।
- ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার অধিনায়ক সোমবার ইনস্টাগ্রামে হাতে লেখা একটি চিঠি পোস্ট করে জানিয়েছেন, জাতীয় দলের জার্সি আর পরবেন না তিনি।
- তিনি লিখেছেন, “এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত যা ব্যথা দিয়েছে এবং এখনও আমার আত্মার গভীরে ব্যথা দেয়, কিন্তু আমি বুঝি যে সঠিক সময় এসে গেছে।”…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার অধিনায়ক সোমবার ইনস্টাগ্রামে হাতে লেখা একটি চিঠি পোস্ট করে জানিয়েছেন, জাতীয় দলের জার্সি আর পরবেন না তিনি। সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য যন্ত্রণাদায়ক। তিনি লিখেছেন, “এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত যা ব্যথা দিয়েছে এবং এখনও আমার আত্মার গভীরে ব্যথা দেয়, কিন্তু আমি বুঝি যে সঠিক সময় এসে গেছে।”
এই ঘোষণার সঙ্গেই শেষ হলো দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক অসাধারণ অধ্যায়। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেকের পর থেকে মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচ খেলেছেন এবং ১২৫ গোল করেছেন। তিনি দেশের সর্বোচ্চ ক্যাপধারী ও সর্বোচ্চ গোলদাতা। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০২৬ সালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে ফাইনালে রানার্সআপ হন। সেই ম্যাচই হয়ে উঠল তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
মেসি জানিয়েছেন, ফাইনালের মাত্র দুই দিন পর—২১ জুলাই—তিনি এই কথাগুলো লিখেছিলেন। কিন্তু ঘোষণা পিছিয়ে দিয়েছিলেন। আগস্ট মাসে বাবা জর্জ মেসির মৃত্যুর পর সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়। জর্জ মেসি ছিলেন শুধু বাবা নন, দীর্ঘদিন ধরে ছেলের এজেন্টও। ৬৮ বছর বয়সে দীর্ঘ অসুস্থতার পর তিনি মারা যান। মেসি লিখেছেন, “আজ বাবার ঘটনার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।” 
ঘোষণার পোস্টে তিনি আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন অকপটে। তিনি বলেছেন, শুধু শেষ কয়েক বছরে ট্রফি জয়ের সময় নয়, তার আগেও তিনি সবসময় সব দিয়েছেন এই জার্সির জন্য। সমর্থকদের আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইন হওয়ার গর্ব অনুভব করাতে তিনি মাঠে সব রেখেছেন। এখন সময় কম। অধ্যায়গুলো শেষ হচ্ছে। এই অধ্যায়টি তাঁকে গভীরভাবে ব্যথা দিচ্ছে। তিনি আরও লিখেছেন, জাতীয় দলের অংশ হওয়া তিনি ভালোবেসেছেন, ভালোবাসেন এবং সবসময় ভালোবাসবেন। তিনি সব দিয়েছেন, আর দেওয়ার কিছু নেই। পেছনে অনেক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় আসছেন, যাঁদের সুযোগ পাওয়া উচিত।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ভেতর থেকে তাঁদের চিৎকার শুনতে তিনি খুব মিস করবেন। এখন তিনি মাঠের বাইরে থেকেই সমর্থন করবেন—ভালো সময়েও, খারাপ সময়েও। পরিবার, কোচ, সহযোদ্ধা ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেছেন, অবিস্মরণীয় স্মৃতি নিয়ে তিনি চলে যাচ্ছেন। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে তিনি সমর্থকদের এমন মুহূর্ত দিয়েছেন যা একসময় শুধু স্বপ্ন ছিল। শেষে তিনি লিখেছেন, “আমি তোমাদের ভালোবাসি! ধন্যবাদ ঈশ্বর, যে আমাকে আর্জেন্টাইন করেছেন। ভামোস আর্জেন্টিনা!”
এই অবসর শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়। এটি এক যুগের সমাপ্তি। মেসি আর্জেন্টিনাকে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের ফাইনালিসিমা জিতিয়েছেন। ২০১৪ ও ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি গোল্ডেন বল জিতেছেন। আটবার ব্যালন ডি’অর জয়ী এই কিংবদন্তি ক্লাব ফুটবলেও অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন। এখন তিনি ইন্টার মায়ামির হয়ে মেজর লিগ সকারে খেলা চালিয়ে যাবেন। সম্প্রতি তিনি মন্ট্রিয়লের বিপক্ষে চার গোল করে দলকে ৭-১ ব্যবধানে জিতিয়েছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হার মেসিকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তিনি পরে লিখেছিলেন, তাঁর পা আর চলছিল না। শারীরিক সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও তিনি পারছিলেন না। সেই ব্যথা এখনও কাটেনি। বাবার মৃত্যু সেই ব্যথাকে আরও গভীর করেছে। ফুটবল জগতে অনেকেই বলেছেন, মেসি আর কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল না। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করেছিল। তার পরও তিনি আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছেছিলেন। তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা খুব কম খেলোয়াড়ের ভাগ্যে জোটে।
আর্জেন্টিনার জন্য এখন নতুন অধ্যায় শুরু হবে। স্কালোনির দলে তরুণ খেলোয়াড়রা জায়গা করে নেবেন। মেসি নিজেই বলেছেন, তাঁদের সুযোগ দেওয়া উচিত। তবে সমর্থকদের মনে তিনি চিরকাল থাকবেন সেই খেলোয়াড় হিসেবে, যিনি দেশকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন এবং এক প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।
মেসির অবসর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে একটু ফাঁকা করে দিয়েছে। তাঁর মতো খেলোয়াড় সহজে আসে না। ছোটখাটো শরীর, অসাধারণ ব্যালেন্স, ভিশন এবং গোল করার ক্ষমতা—এসব মিলিয়ে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবেই স্মরণীয় থাকবেন। অনেকেই তাঁকে সর্বকালের সেরা বলে মনে করেন। সেই বিতর্ক চলবে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর অবদান নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
এখন মাঠে তিনি আর আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন না। তবে সমর্থকরা আশা করবেন, ক্লাব ফুটবলে তিনি আরও কিছুদিন মুগ্ধ করবেন। আর জাতীয় দলের ম্যাচে তিনি এখন একজন সমর্থক হিসেবেই থাকবেন—বাইরে থেকে চিৎকার করে, ভালো সময়েও খারাপ সময়েও।
ফুটবল একদিন শেষ হয়। কিন্তু কিছু খেলোয়াড় চিরকাল বেঁচে থাকেন সমর্থকদের স্মৃতিতে। লিওনেল মেসি সেই খেলোয়াড়দের একজন। আজ তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেন। সিদ্ধান্তটি তাঁকে ব্যথা দিয়েছে। সমর্থকদেরও দিয়েছে। কিন্তু তিনি যা দিয়ে গেলেন, তা চিরকাল থাকবে।
ভামোস আর্জেন্টিনা। ধন্যবাদ, লিও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



