তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেবন্ত রেড্ডির প্রস্তাবিত আমেরিকা সফরে রাজনৈতিক ছাড়পত্র দিল না কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রক। ফলে ব্রিটেন সফর শেষ করেই দেশে ফিরতে হচ্ছে তাঁকে। আমেরিকার বোস্টন ও নিউ ইয়র্কে যাওয়ার কথা থাকলেও সেই পর্ব বাতিল করা হয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা আমেরিকায় গিয়ে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক করবেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা চালাবেন।

বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী-সহ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের বিদেশ সফরের প্রস্তাব রাজনৈতিক ছাড়পত্র দেওয়ার আগে খতিয়ে দেখা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদমর্যাদা এবং ঘোষিত সফর-উদ্দেশ্যের সঙ্গে কর্মসূচির সামঞ্জস্য থাকা আবশ্যক। তাঁর কথায়, রেবন্ত রেড্ডির আমেরিকা সফরের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কর্মসূচি সেই মানদণ্ড পূরণ করেনি। তাই ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। অবশ্য তাঁর ব্রিটেন সফরে কেন্দ্র অনুমতি দিয়েছিল। তবে কোন নির্দিষ্ট কর্মসূচিকে আপত্তিকর বা অনুপযুক্ত মনে করা হয়েছে, বিদেশ মন্ত্রক তা বিস্তারিতভাবে জানায়নি।

তেলেঙ্গানা সরকারের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশ্বের প্রথম সারির শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলিকে হায়দরাবাদের সঙ্গে যুক্ত করা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং ভার্জিনিয়া টেকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা ছিল। তেলেঙ্গানার প্রস্তাবিত ‘ভারত ফিউচার সিটি’-তে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এবং যৌথ শিক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সরকারি সফরসূচিতে ২৬ আগস্ট নিউ ইয়র্কে ইন্ডিয়ান ওভারসিজ কংগ্রেসের একটি ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ অনুষ্ঠানের কথাও ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং সরকারি শিক্ষা-সফরের ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে ওই রাজনৈতিক কর্মসূচির সামঞ্জস্য নিয়েই কেন্দ্রের আপত্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। যদিও বিদেশ মন্ত্রক আনুষ্ঠানিকভাবে ওই অনুষ্ঠানকেই ছাড়পত্র প্রত্যাখ্যানের কারণ বলে চিহ্নিত করেনি।

কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রেবন্ত রেড্ডি। তাঁর বক্তব্য, দেশ গঠন এবং তরুণদের ভবিষ্যতের প্রশ্নে দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচনী হিসাবের ঊর্ধ্বে ওঠা উচিত। তিনি দাবি করেছেন, কেন্দ্রের জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলিকে তেলেঙ্গানায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছিল। রাজ্যের তরুণেরা যাতে বিদেশে না গিয়েও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান, সেটিই ছিল সফরের উদ্দেশ্য।

তেলেঙ্গানা মুখ্যমন্ত্রীর দফতর কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নেওয়া বলে অভিযোগ করেছে। কংগ্রেসও বিষয়টিকে ‘তুচ্ছ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে আক্রমণ করেছে। দলের বক্তব্য, একটি বিরোধী-শাসিত রাজ্যের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করতেই এই অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, সিদ্ধান্তটি কোনও দলীয় বিবেচনায় নয়; সফরের প্রস্তাবিত কর্মসূচি মুখ্যমন্ত্রীর সাংবিধানিক পদের উপযুক্ত কি না, সেই প্রশাসনিক মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে।

সরকারি কাজে বিদেশে যেতে হলে মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের মন্ত্রী, সাংসদ এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তাদের বিদেশ মন্ত্রকের রাজনৈতিক ছাড়পত্র নিতে হয়। সফরের উদ্দেশ্য, আমন্ত্রণকারী সংস্থা, বৈঠকের তালিকা, সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রভাব বিচার করে মন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় ভিসা-সংক্রান্ত ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

রেবন্ত রেড্ডিই অবশ্য এমন ছাড়পত্র না-পাওয়া প্রথম বিরোধী মুখ্যমন্ত্রী নন। অতীতে দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের বিদেশ সফর নিয়েও কেন্দ্রের আপত্তি দেখা গিয়েছে। প্রতিবারই বিরোধীরা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের অধিকারের প্রশ্ন তুলেছে; কেন্দ্র পাল্টা জানিয়েছে, বিদেশনীতি কেন্দ্রীয় তালিকাভুক্ত বিষয় এবং সরকারি সফরে অভিন্ন কূটনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।

রেবন্ত রেড্ডি তাঁর আধিকারিকদের আমেরিকা সফর চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত না থাকলেও শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন সংক্রান্ত বৈঠক এবং সমঝোতার প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ হচ্ছে না। তবে ঘটনাটি কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের পুরনো বিতর্ককেই নতুন করে সামনে আনল—রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে মুখ্যমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের স্বাধীনতা কতটা থাকবে এবং সেই সফর নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রের ক্ষমতার সীমা কোথায়।