ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির পরীক্ষা ঘিরে অনিয়মের অভিযোগে যে বেসরকারি সংস্থাটি এখন তদন্তের কেন্দ্রে, তার অতীতেও রয়েছে একের পর এক বিতর্ক। টিএসআর ডেটা প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেড বা টিডিপিএল নামে সংস্থাটির লখনউ দফতরে তল্লাশি চালিয়ে সেটি সিল করে দিয়েছে ঝাড়খণ্ড পুলিশ। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বেশ কিছু নথিও। উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ও বিধান পরিষদের সচিবালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই সংস্থার বিরুদ্ধে স্বজনপোষণ, অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল।

ঝাড়খণ্ড কর্মী নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত স্নাতক স্তরের পরীক্ষা বাতিল করার যে সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকার নিয়েছে, তার সূত্রেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে টিডিপিএল। অভিযোগ, ওই পরীক্ষার পরিচালনায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল। গত মাসে ঝাড়খণ্ড পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সংস্থার অন্যতম পরিচালক রামবীর সিংহ এবং কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মীকে গ্রেফতার করে। অন্য পরিচালক সত্যপাল সিংহ বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, তা জানা যায়নি বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি।

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিনিধিরা মঙ্গলবার লখনউয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চৌরাহার আদর্শ কমপ্লেক্সে সংস্থার নথিভুক্ত প্রধান দফতরে গিয়ে দেখেন, সেটি তালাবন্ধ ও সিল করা। দফতরটি ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় দু’টি ঘর নিয়ে তৈরি।

স্থানীয় মাড়িয়াঁও থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শিবানন্দ জানিয়েছেন, তিন দিন আগে ঝাড়খণ্ড পুলিশের পাঁচ সদস্যের একটি দল তল্লাশি পরোয়ানা নিয়ে লখনউয়ে এসেছিল। লখনউ পুলিশ তাদের অভিযানে সহায়তা করে। তল্লাশির সময় দফতরে কোনও কর্মী ছিলেন না। তদন্তকারীরা বেশ কিছু নথি বাজেয়াপ্ত করার পরে দফতরটি সিল করে দেন।

টিডিপিএলের বিরুদ্ধে অভিযোগ অবশ্য ঝাড়খণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২১-২২ সালে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা এবং বিধান পরিষদের সচিবালয়ে ১৮৬টি প্রশাসনিক পদে নিয়োগের পরীক্ষা নেওয়া তিনটি সংস্থার অন্যতম ছিল টিডিপিএল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানে উঠে আসে, ওই চাকরিগুলির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পেয়েছিলেন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের আত্মীয়েরা। সফল প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত পাঁচ জন টিডিপিএলের দুই পরিচালক রামবীর ও সত্যপালের আত্মীয় বলে অভিযোগ।

উত্তরপ্রদেশের ওই নিয়োগ মামলায় এলাহাবাদ হাই কোর্টের লখনউ বেঞ্চও কঠোর পর্যবেক্ষণ করেছিল। অনিয়মগুলিকে ‘স্তম্ভিত করার মতো’ বলে বর্ণনা করে আদালত নিয়োগ প্রক্রিয়ার সততা এবং স্বজনপোষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালত কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে দিয়ে তদন্তের নির্দেশও দিয়েছিল।

হাই কোর্ট উল্লেখ করেছিল, পরীক্ষার ফল কখনও প্রকাশ করা হয়নি, নির্বাচিত প্রার্থীদের পূর্ণ তালিকাও জনসমক্ষে আনা হয়নি। এমনকি মোট কত জন পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন, সেই তথ্যও অজানা থেকে যায়। উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট পরে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ খারিজ করে দিলেও মূল মামলাটি এখনও হাই কোর্টে বিচারাধীন।

আদালতের নথি অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বরাত পেয়েছিল কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ব্রডকাস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্টস ইন্ডিয়া লিমিটেড। তারাই পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব টিডিপিএলকে দিয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের সূত্রের দাবি, হাই কোর্টে মামলা শুরু হওয়ার পরে আর কোনও সরকারি পরীক্ষা পরিচালনার বরাত টিডিপিএলকে দেওয়া হয়নি।

রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিজের নথি বলছে, রামবীর সিংহ, সত্যপাল সিংহ এবং মহম্মদ তারিক ২০১০ সালের জুলাই মাসে টিডিপিএল প্রতিষ্ঠা করেন। তারিক ২০১৩ সালে সংস্থাটি ছেড়ে দেন। ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট জমা দেওয়া ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, রামবীর ও সত্যপালই সংস্থার একমাত্র দুই প্রবর্তক। দু’জনেরই সমান ৫০ শতাংশ করে মালিকানা রয়েছে। প্রত্যেকের হাতে পাঁচ হাজারটি করে শেয়ার। সংস্থাটি তাদের ৯৬৫ জন কর্মী রয়েছে বলে জানিয়েছে—যাঁদের সকলেই পুরুষ।

নথি অনুসারে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে সংস্থার কার্যক্রম থেকে আয় ছিল ৫ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা। পরের অর্থবর্ষে তা প্রায় চার গুণ বেড়ে ১৯ কোটি ৬২ লক্ষ টাকায় পৌঁছয়। ২০২৪-২৫ সালে কর মেটানোর পরে সংস্থার মুনাফা ছিল ৪৮ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা। ওই অর্থবর্ষে দুই পরিচালকই ১৮ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা করে বেতন নিয়েছিলেন। তাঁরা আরও চারটি সংস্থার পরিচালক।

উত্তরপ্রদেশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের গ্রাম উন্নয়ন আধিকারিক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগেও রামবীর ও সত্যপালের নাম জড়িয়েছিল। বিশেষ তদন্তকারী দলের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২১ সালের ৭ এপ্রিল তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে বিপুল নগদ অর্থ উদ্ধারের দাবিও করেছিল পুলিশ। বর্তমানে দু’জনেই সেই মামলায় জামিনে রয়েছেন। ঝাড়খণ্ডের পরীক্ষা-বিতর্ক এখন সেই পুরনো অভিযোগগুলিকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।