দিল্লিতে তালিবানের ‘বিজয়’

যা জানা জরুরি
- নয়াদিল্লির মাটিতে প্রথম বার প্রকাশ্যে ‘বিজয় দিবস’ পালন করল তালিবান।
- ২০২১ সালের ১৫ অগস্ট কাবুল দখল করে ক্ষমতায় ফেরার পঞ্চম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের উপস্থিতি ঘিরে তৈরি…
- তালিবান সরকারকে এখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি ভারত।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নয়াদিল্লির মাটিতে প্রথম বার প্রকাশ্যে ‘বিজয় দিবস’ পালন করল তালিবান। ২০২১ সালের ১৫ অগস্ট কাবুল দখল করে ক্ষমতায় ফেরার পঞ্চম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের উপস্থিতি ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ কূটনৈতিক তাৎপর্য। তালিবান সরকারকে এখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি ভারত। কিন্তু দিল্লির এই উপস্থিতি যে কাবুলের সঙ্গে নয়াদিল্লির বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, সেই বার্তাই স্পষ্ট।
সোমবারের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন বিদেশ মন্ত্রকের পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান বিভাগের যুগ্মসচিব আনন্দ প্রকাশ। মঞ্চে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল ভারত ও তালিবান সরকারের পতাকা। ভারতে তালিবান সরকারের এমন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের আয়োজনও এই প্রথম।
অনুষ্ঠানে তালিবান নিযুক্ত আফগান দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত নূর আহমেদ নূর ভারত-আফগান সম্পর্ক আরও গভীর করার বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্য, পারস্পরিক সম্মান, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দু’দেশের সম্পর্কে ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক অংশীদারি এবং নিয়মিত যোগাযোগ আরও বাড়লে তা শুধু ভারত ও আফগানিস্তানের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে দাবি করেন তিনি।
নূরের কথায়, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। দূতাবাস ও বাণিজ্যিক প্রতিনিধিত্বও আগের তুলনায় সক্রিয় হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফরের পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে ‘গঠনমূলক বোঝাপড়া’। তালিবানের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিসহ একাধিক মন্ত্রীর ভারত সফর দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পরিসর বাড়িয়েছে বলেও জানান তিনি।
শুধু বর্তমান কূটনীতি নয়, দুই দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তালিবান প্রতিনিধি। তাঁর দাবি, কাবুল, হেরাত ও কান্দাহারের মতো আফগান শহরে একসময় ভারতীয় ব্যবসায়ী ও কাফেলাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আবার দিল্লি ও লাহোরের মতো শহরেও আফগান পণ্ডিত, কবি ও সুফিদের প্রভাব পড়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়েও ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে আফগানিস্তানের ‘ন্যায্য অধিকার’-এর পক্ষে ভারতের অবস্থানের প্রশংসাও করেন নূর। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তালিবানের বিদেশনীতি দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক সম্মান, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং অভিন্ন স্বার্থের উপর।
অনুষ্ঠানে একাধিক দেশের কূটনীতিকের উপস্থিতিও নজর কেড়েছে। ভুটান, ইরান, ইরিত্রিয়া, জামাইকা, নাইজার, প্যালেস্তাইন ও সার্বিয়ার রাষ্ট্রদূতরা অনুষ্ঠানে ছিলেন। চিন, রাশিয়া, কাতার, ইরাক, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিনিধিরাও যোগ দেন। তবে আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমি ও ইউরোপীয় দেশগুলির প্রতিনিধিদের দেখা যায়নি।
গত বছর তালিবানের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির দিল্লির সাংবাদিক বৈঠকে মহিলা সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এ বার অবশ্য অনুষ্ঠানে একাধিক মহিলা সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, তালিবানের ‘বিজয় দিবস’কে ঘিরে দিল্লির এই আয়োজন নিছক একটি কূটনৈতিক অনুষ্ঠান নয়। তালিবান চাইছে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে। আর ভারতও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়েও কাবুলের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা খোলা রাখছে। অর্থাৎ স্বীকৃতি এখনও দূর, কিন্তু সম্পর্কের বরফ গলছে—ধীরে, হিসেব কষেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



