তালিবানের দরজায় বিশ্ব

যা জানা জরুরি
- আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।
- অথচ নারী অধিকার হরণ, সংখ্যালঘুদের উপর দমন, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ এবং কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ—কোনও কিছুই তালিবানের সঙ্গে বিশ্বের কূটনৈতিক দূরত্ব ধরে রাখতে পারছে না।
- বরং সময় যত গড়াচ্ছে, কাবুলের শাসকদের সঙ্গে একের পর এক দেশ সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। অথচ নারী অধিকার হরণ, সংখ্যালঘুদের উপর দমন, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ এবং কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ—কোনও কিছুই তালিবানের সঙ্গে বিশ্বের কূটনৈতিক দূরত্ব ধরে রাখতে পারছে না। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, কাবুলের শাসকদের সঙ্গে একের পর এক দেশ সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির আশঙ্কা, এই ‘বাস্তববাদী’ কূটনীতি শেষ পর্যন্ত তালিবানের উপর আন্তর্জাতিক চাপই দুর্বল করে দিচ্ছে।
২০২১ সালে কাবুল দখলের পর তালিবান সরকারকে কার্যত একঘরে করে রেখেছিল বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। সেই নীতি এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। ভারত, কাতার, চিন, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার একাধিক দেশ তালিবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। রাশিয়া তো এক ধাপ এগিয়ে আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর গত মাসে কাবুলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও করেছে।
পশ্চিমের দেশগুলিও আর পুরোপুরি দূরে নেই। গত জুনে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা তালিবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের আফগানিস্তানে ফেরানো নিয়ে আলোচনা করেন। ইউরোপীয় কমিশন বৈঠকটিকে ‘কারিগরি আলোচনা’ বলে গুরুত্ব কমালেও তালিবান সেটিকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই প্রচার করেছে। ব্রিটেনও কাতারে থাকা আফগানিস্তান মিশনের মাধ্যমে তালিবানের সঙ্গে ‘সীমিত ও বাস্তববাদী’ যোগাযোগ বজায় রেখেছে। জার্মানি-সহ পশ্চিম ইউরোপের অন্তত পাঁচটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ আফগান দূতাবাস বা কনস্যুলেটও এখন তালিবান-নিযুক্ত প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে।
সমস্যা এখানেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলির বক্তব্য, তালিবানের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ রাখা সম্ভব নয়—মানবিক সাহায্য পৌঁছনো কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে কাবুলের সঙ্গে কথা বলতেই হবে। কিন্তু সেই যোগাযোগের বিনিময়ে নারী ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট চাপ তৈরি হচ্ছে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আফগানিস্তান বিষয়ক গবেষক ফেরেশতা আব্বাসির মতে, তালিবানের নিপীড়নের নিন্দা করা এবং একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে অভিবাসন বা অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করার এই দ্বিমুখী নীতিই কাবুলকে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বার্তা দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
তালিবান আমলে আফগান নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরি করা বন্ধ হয়েছে। কিশোরীদের জন্য বিদ্যালয়ের দরজাও বন্ধ। কঠোর পোশাকবিধির পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সাংবাদিক এবং প্রতিবাদীদের উপর চলছে দমন-পীড়ন। নতুন আইনে নারীদের অধিকার আরও সংকুচিত হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের ভাষায়, আফগানিস্তান কার্যত ‘মানবাধিকারের সমাধিক্ষেত্র’ হয়ে উঠেছে।
তার পরও ভূরাজনীতি থামছে না। মধ্য এশিয়ার দেশগুলি আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যপথ, পাইপলাইন এবং সমুদ্রবন্দরে পৌঁছনোর সম্ভাবনা দেখছে। দেশটির বিপুল খনিজ সম্পদ চিন-সহ বিভিন্ন বিদেশি শক্তির আগ্রহ বাড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী ইসলামি জঙ্গিবাদ নিয়েও চিনের উদ্বেগ রয়েছে। রাশিয়ার কাছে আবার আফগানিস্তানে প্রভাব বাড়ানো আমেরিকার সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতারই অংশ।
ভারতও বদলে যাওয়া সমীকরণে কাবুলের দিকে এগোচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তালিবানের ক্রমবর্ধমান বিরোধকে সামনে রেখে নয়াদিল্লি আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। তালিবান বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ভারত সফরের পথও নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিয়ে সহজ করেছিল নয়াদিল্লি। রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের প্রতিনিধি তালিবান নেতাদের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ এবং অস্ত্র অবরোধের মতো ব্যবস্থাগুলিও ‘নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার’ আলোকে পুনর্বিবেচনার কথা বলেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক উষ্ণতায় তালিবানের নীতি নরম হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম। সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বে কট্টরপন্থীরাই এখনও ক্ষমতার কেন্দ্রে। ফলে বিশ্বের সঙ্গে তালিবানের যোগাযোগ যত বাড়ছে, প্রশ্নও তত বড় হচ্ছে—এই সম্পর্ক কি আফগানিস্তানের মানুষের অধিকার ফেরানোর পথ খুলবে, নাকি শুধু তালিবানের আন্তর্জাতিক বৈধতার রাস্তা মসৃণ করবে?
মানবাধিকারের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান ছাড়া দ্বিতীয়টিই সত্যি হয়ে উঠতে পারে। আর তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে আফগান নারী ও সাধারণ মানুষকেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



