স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রতিবাদী নাগরিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক, সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক সমালোচকদের দাগিয়ে দিতেই প্রধানমন্ত্রী এই নতুন তকমা ব্যবহার করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বৈধ মতভেদকেও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে চিহ্নিত করার এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত একদলীয় শাসন এবং স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাওবাদী চিন্তাধারার বিপদ সম্পর্কে দেশকে আরও সতর্ক হতে হবে। বহু বছর ধরে মাওবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিরা দেশের ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সরকারি কমিটিতে উপদেষ্টা হিসেবেও তাঁরা নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

মোদীর কথায়, সশস্ত্র নকশালদের জঙ্গল থেকে নির্মূল করে দেশকে সেই বিপদ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সশস্ত্র নকশালদের শক্তি কমলেও ‘দিমাগি নকশালরা’ এখনও রয়ে গিয়েছেন। তাঁরা সুযোগের অপেক্ষায় থেকে হিংসা ও অরাজকতার পথ খুঁজছেন এবং বিভিন্ন কৌশলে সমাজকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানান।

বিরোধীদের বক্তব্য, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে প্রধানমন্ত্রী আসলে কোনও নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বোঝাননি। তাঁর নিশানায় রয়েছেন সরকারের সমালোচক রাজনৈতিক নেতা, আন্দোলনকারী, অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবীরা। অতীতে সরকারের বিরোধীদের জন্য ‘আরবান নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’, ‘দেশবিরোধী’ এবং ‘পাকিস্তানের সমর্থক’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন শব্দবন্ধটি সেই রাজনৈতিক অভিধানেরই সম্প্রসারণ বলে তাঁদের অভিযোগ।

২০২১ সালে তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী ‘আন্দোলনজীবী’ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন। একই সঙ্গে ‘এফডিআই’-এর নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ফরেন ডেস্ট্রাকটিভ আইডিয়োলজি’ বা বিদেশি ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ সম্পর্কে দেশকে সতর্ক থাকতে হবে। পরে প্রবল কৃষক আন্দোলনের মুখে তিনটি আইনই প্রত্যাহার করে নেয় কেন্দ্র। বিরোধীরা সেই পর্ব মনে করিয়ে বলছে, গণআন্দোলনের দাবি মোকাবিলা করার পরিবর্তে আন্দোলনকারীদের তকমা দেওয়াই মোদী সরকারের পরিচিত কৌশল।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম বলেন, প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক বিরোধীদের অপমান করার জন্য নতুন শব্দ উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর মতে, ‘দিমাগি নকশাল’ হল প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিক্ষক ও গবেষকদের ‘আরবান নকশাল’ বলার পুরনো কৌশলের নতুন সংস্করণ।

চিদম্বরম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যদি তথাকথিত দিমাগি নকশালদের নির্মূল করতে চান, তার অর্থ দাঁড়াবে বিরোধীদেরই নির্মূল করা। তাতে একদলীয় শাসন এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের রাস্তা খুলে যাবে।” তাঁর অভিযোগ, যাঁদের এই ধরনের তকমা দেওয়া হয়েছে, তাঁদের কয়েকজন বিচার শেষ হওয়া তো দূরের কথা, বিচার শুরু না হয়েই প্রায় ছ’বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন।

কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুর অবশ্য বিষয়টির নিরাপত্তাগত দিকটিও স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সশস্ত্র বিদ্রোহ ও হিংসার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সতর্কতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু ‘দিমাগি নকশাল’-এর মতো অস্পষ্ট ও ব্যাপক তকমা গণতান্ত্রিক সমাজে বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।

তারুর বলেন, প্রকৃত অন্তর্ঘাতমূলক কাজ এবং বৈধ আদর্শগত মতভেদের মধ্যকার সীমারেখা মুছে গেলে সমালোচক, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের কণ্ঠরোধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানসম্মত গণতন্ত্রকে হিংসার বিরুদ্ধে দৃঢ় হতেই হবে, কিন্তু সেই লক্ষ্যে বাক্‌স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া বা বৌদ্ধিক মতভেদকে অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না।

কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলটের দাবি, যুবক ও ছাত্রদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভে প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি আতঙ্কিত। সরকার বা শাসক দলের বিরোধিতা করলেই কাউকে ‘দেশবিরোধী’ বলে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কৃষক আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের ‘খলিস্তানি’ বলা হয়েছিল। কংগ্রেস জাতগণনার দাবি তোলার পরেও ‘আরবান নকশাল’ তকমা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পাইলট বলেন, দেশের মানুষ এখন প্রশাসন, কর্মসংস্থান এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন করছেন। সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাঁদের পরিচিতিকে সন্দেহের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে স্পষ্ট, জনমানসে তৈরি হওয়া ক্ষোভে তিনি বিচলিত।

কংগ্রেসের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান জয়রাম রমেশও মোদীকে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর কথায়, প্রথমে বিরোধীদের ‘আরবান নকশাল’ বলা হয়েছিল, এখন তাঁদের নাম দেওয়া হচ্ছে ‘দিমাগি নকশাল’। এটি প্রধানমন্ত্রীর মরিয়া হয়ে ওঠার লক্ষণ। জয়রাম ব্যঙ্গ করে বলেন, যাঁদের প্রধানমন্ত্রী এই সব নামে আক্রমণ করেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদের তোলা বহু দাবিই সরকারকে মেনে নিতে হয়। তিনি মোদীকে ‘মাস্টার অ্যাবিউজার’ বলেও কটাক্ষ করেন।

সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি মনে করেন, ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দের মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতিকদেরই নিশানা করা হয়েছে। সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা বলেন, স্বাধীনতা দিবসের মতো গম্ভীর জাতীয় অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী সমালোচকদের আক্রমণ করার সুযোগ ছাড়েননি। অথচ দেশের মানুষ তাঁর সরকারকে যে প্রশ্নগুলি করছেন, সেগুলির উত্তর ভাষণে পাওয়া যায়নি।

রাজার অভিযোগ, ‘দেশবিরোধী’ বা ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-এর মতো ভিত্তিহীন রাজনৈতিক শ্রেণিবিভাগের তালিকায় আরও একটি উদ্ভট শব্দ যোগ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল প্রতিবাদকে কলঙ্কিত করা এবং সরকারকে প্রশ্ন করা ব্যক্তিদের ভয় দেখানো।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে যুবসমাজের ক্ষোভের কথাও তুলেছেন সিপিআই নেতা। তাঁর প্রশ্ন, ছাত্র ও তরুণরা শিক্ষা এবং নিয়োগব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে পথে নেমেছেন—প্রধানমন্ত্রী কি তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন? প্রায় এক লক্ষ সরকারি স্কুল কেন বন্ধ হয়েছে, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি কেন ঘটেছে এবং কোটি কোটি যুবক স্থায়ী ও নিরাপদ কাজের জন্য কেন লড়াই করছেন—এসব প্রশ্নের জবাব সরকারের দেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তৃণমূল নেতা ও প্রাক্তন সাংসদ সাকেত গোখলেও স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চ থেকে বিরোধীদের আক্রমণ করার সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যুবকদের উপরে বলপ্রয়োগ ও ছররা বন্দুক ব্যবহারের জন্য দুঃখপ্রকাশ করার বদলে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলেছেন। গোখলের পরামর্শ, প্রধানমন্ত্রীর উচিত অহং ত্যাগ করে ক্ষুব্ধ তরুণদের বক্তব্য শোনা।

এই বিতর্কের মধ্যেই লালকেল্লার সরকারি অনুষ্ঠানে লোকসভা ও রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং মল্লিকার্জুন খাড়্গের অনুপস্থিতি নিয়েও রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। গত বছরও তাঁরা অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। ২০২৪ সালে রাহুল উপস্থিত থাকলেও তাঁকে পঞ্চম সারিতে বসানো হয়েছিল বলে কংগ্রেস অভিযোগ করেছিল। দলটির বক্তব্য ছিল, লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে পিছনের সারিতে বসানো প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এবং গণতান্ত্রিক প্রথার প্রতি অসম্মানের পরিচয়।

‘দিমাগি নকশাল’ বিতর্ক তাই কেবল একটি শব্দের অর্থে সীমাবদ্ধ নেই। মূল প্রশ্নটি হল, হিংসাত্মক রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের সীমারেখা কোথায় টানা হবে। বিরোধীদের আশঙ্কা, সেই সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট করা হলে সরকারের সমালোচনাকেই নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। আর সেখানেই একটি রাজনৈতিক তকমা নাগরিক স্বাধীনতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।