বিমল ইলাইচি’র বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়ার কারণে বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খান, অজয় দেবগন এবং টাইগার শ্রফকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠাল মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বা এফডিএ। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির প্রাথমিক মূল্যায়ন, বিজ্ঞাপনটিতে সরাসরি ইলাইচির কথা বলা হলেও তার উপস্থাপনা, সংলাপ এবং ব্র্যান্ডের পরিচিতির মাধ্যমে পরোক্ষে ‘বিমল পান মশলা’র প্রচার করা হচ্ছে। মহারাষ্ট্রে ওই ধরনের পণ্য নিষিদ্ধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিন অভিনেতার প্রত্যেকের সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

চলতি সপ্তাহেই তিন তারকার ঠিকানায় নোটিস পাঠানো হয়েছে। অজয় দেবগনের নোটিস গিয়েছে তাঁর জুহুর বাড়িতে, শাহরুখ খানের নোটিস পাঠানো হয়েছে বান্দ্রার ‘মন্নত’-এ। টাইগার শ্রফকে নোটিস দেওয়া হয়েছে তাঁর প্রযোজনা সংস্থা টাইগার শ্রফ প্রোডাকশনস এলএলপি-র মাধ্যমে। বিজ্ঞাপনটিতে তাঁদের ভূমিকা এবং একটি নিষিদ্ধ পণ্যের ব্র্যান্ডের সঙ্গে দর্শকের মানসিক সংযোগ তৈরির দায় নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এফডিএ-র নোটিসে বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনটি পরীক্ষা করে প্রাথমিক ভাবে মনে হয়েছে, এটি ‘বিমল’ ব্র্যান্ডের প্রচার করছে। বাজারে এই ব্র্যান্ড প্রধানত পানমশলার সঙ্গে যুক্ত। মহারাষ্ট্রের খাদ্য সুরক্ষা কমিশনার ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন, তার অধীনে এক বছর পানমশলা-সহ নির্দিষ্ট পণ্যের উৎপাদন, মজুত, পরিবহণ, বণ্টন এবং বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রশ্ন, ‘বিমল ইলাইচি’ নামটি ব্যবহার করে এমন ভাবে বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করা হয়েছে কি না, যাতে সরাসরি নিষিদ্ধ পানমশলা না দেখিয়েও মূল ব্র্যান্ডটির পরিচিতি ও বাজার ধরে রাখা যায়। বিজ্ঞাপনের দৃশ্যায়ন, সংলাপ, পণ্যের নাম এবং সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের বাজার-পরিচিতি মিলিয়ে এটি পরোক্ষ বা বিকল্প প্রচারের পর্যায়ে পড়ে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিন অভিনেতা বিজ্ঞাপনে সরাসরি উপস্থিত থেকে পণ্যটির অনুমোদনকারী মুখের ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে দায় কেবল প্রস্তুতকারক বা বিজ্ঞাপন সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে এফডিএ।

এই পদক্ষেপে খাদ্য সুরক্ষা ও মান আইন, ২০০৬-এর ২৪ নম্বর ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। ওই ধারায় বিভ্রান্তিকর বা প্রতারণামূলক খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। একই আইনের ৫৩ নম্বর ধারায় কোনও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এফডিএ-র বক্তব্য, অভিনেতারা ব্র্যান্ডের প্রচারক হিসেবে বিজ্ঞাপনটিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। তাই তাঁরা ‘বিজ্ঞাপন প্রকাশের পক্ষ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন কি না, তা আইনের অধীনে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। খাদ্য সুরক্ষা ও মান সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ও দাবি বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধিও নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য নোটিস পাঠানোর অর্থ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তিন অভিনেতার জবাব পাওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মহারাষ্ট্রে ২০১২ সাল থেকে তামাক বা নিকোটিনযুক্ত গুটখা এবং পানমশলা নিষিদ্ধ। খাদ্য সুরক্ষা ও মান আইনের ৩০(২)(ক) ধারার অধীনে প্রতি বছর এই নিষেধাজ্ঞা নবীকরণ করা হয়। সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই থেকে।

সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ গুটখা ও পানমশলার বিরুদ্ধে অভিযানও জোরদার করেছে এফডিএ। গত ২৫ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৬৫৮টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৫ কোটি ১১ লক্ষ টাকার নিষিদ্ধ পণ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। দায়ের হয়েছে ৫১৯টি এফআইআর, গ্রেফতার করা হয়েছে ৭০১ জনকে। নিষিদ্ধ সামগ্রী পরিবহণে ব্যবহৃত ৭৮টি গাড়ি আটক করা হয়েছে; পণ্য-সহ সেগুলির মোট মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। গত ১২ জুন এফডিএ কমিশনার তুকারাম মুন্ধে আধিকারিকদের নির্দেশ দেন, সংগঠিত ভাবে গুটখা ও তামাকজাত পণ্যের কারবার চালানোর উপযুক্ত মামলায় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে মহারাষ্ট্র সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইন বা মকোকা প্রয়োগের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে।

‘বিমল ইলাইচি’র প্রচার অবশ্য এই প্রথম নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে পড়ল না। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা মহানির্দেশালয় ‘বিমল ইলাইচি’র প্রচারক বিষ্ণু পাউচ প্যাকেজিং প্রাইভেট লিমিটেডকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছিল। অভিযোগ ছিল, বলিউড তারকাকে সামনে রেখে তরুণদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে পরোক্ষে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।

সংস্থাটি দাবি করেছিল, দেশের বাজারে ‘বিমল’ নামে কোনও তামাকজাত পণ্য তারা উৎপাদন করে না। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি হাই কোর্ট নিম্ন আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য দফতরের আবেদন খারিজ করে। আদালত বলেছিল, তামাকহীন পণ্যের বৈধ ব্যবসা এবং বিজ্ঞাপন চালানোর মৌলিক অধিকার সংস্থাটির রয়েছে। তবে একই ব্র্যান্ডের আড়ালে নিষিদ্ধ পণ্যের পরোক্ষ প্রচার হচ্ছে কি না, সেই বৃহত্তর বিতর্কের নিষ্পত্তি হয়নি।

মহারাষ্ট্র এফডিএ-র নতুন পদক্ষেপ সেই পুরনো প্রশ্নটিকেই আবার সামনে আনল—তারকারা কি শুধু বিজ্ঞাপনের মুখ, না কি জনস্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর কোনও ব্র্যান্ডের পরোক্ষ প্রচারের দায়ও তাঁদের নিতে হবে? শাহরুখ, অজয় ও টাইগারের জবাবের পর এই প্রশ্নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী অবস্থান নেয়, এখন নজর থাকবে সে দিকেই।