ট্রাম্পের স্বাস্থ্য, ৭ প্রশ্ন!

যা জানা জরুরি
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাস্থ্য নিয়ে ফের ধোঁয়াশা।
- হোয়াইট হাউসের দাবি, তিনি ‘চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী’ এবং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে ‘সম্পূর্ণ সক্ষম’।
- কিন্তু প্রকাশিত স্বাস্থ্য-তথ্যে একাধিক ফাঁকফোকর রয়েছে বলে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর জোনাথন রাইনার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাস্থ্য নিয়ে ফের ধোঁয়াশা। হোয়াইট হাউসের দাবি, তিনি ‘চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী’ এবং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে ‘সম্পূর্ণ সক্ষম’। কিন্তু প্রকাশিত স্বাস্থ্য-তথ্যে একাধিক ফাঁকফোকর রয়েছে বলে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর জোনাথন রাইনার। প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির দীর্ঘদিনের চিকিৎসক রাইনার ট্রাম্পের চিকিৎসা, শারীরিক উপসর্গ এবং বিভিন্ন পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তুলেছেন সাতটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন।
চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের সর্বশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলা হয়েছিল। ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে প্রায় তিন ঘণ্টার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যুক্ত ছিলেন ২২ জন বিশেষজ্ঞ। কম্পিউটারভিত্তিক ইমেজিং, হৃদ্যন্ত্রের পরীক্ষা, ক্যানসার শনাক্তকরণসহ একাধিক প্রতিরোধমূলক পরীক্ষা করা হয়। প্রেসিডেন্টের চিকিৎসকের দাবি, হৃদ্যন্ত্রের পরীক্ষায় কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। এমনকি স্মৃতিশক্তি ও চিন্তনক্ষমতা যাচাইয়ের ‘মন্ট্রিয়ল কগনিটিভ অ্যাসেসমেন্ট’-এ ট্রাম্প ৩০-এর মধ্যে ৩০ পেয়েছেন।
তার পরেও প্রশ্ন থামেনি। কারণ, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, ট্রাম্পের দুই পায়ের নীচের অংশ ফুলে যাওয়ার পর তাঁর ‘ক্রনিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সি’ ধরা পড়েছে। এই সমস্যায় পায়ের শিরা ঠিকমতো রক্ত হৃদ্যন্ত্রের দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে না। বয়স্কদের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে পরিচিত সমস্যা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুরুতর নয়। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য ছিল, পরীক্ষায় গভীর শিরায় রক্ত জমাট, ধমনির অসুখ কিংবা হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার কোনও প্রমাণ মেলেনি।
তবে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে রাইনার প্রশ্ন তুলেছেন অন্য জায়গায়। তাঁর বক্তব্য, সমস্যা ট্রাম্পের নির্দিষ্ট কোনও রোগ নিয়ে নয়; বরং সমস্যা হল তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতটা তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।
ডিক চেনির চিকিৎসক হিসেবে ২৭ বছর কাজ করেছেন রাইনার। চেনি ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তাঁর হৃদ্রোগ, স্টেন্ট বসানো, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, রক্ত জমাট বাঁধা এবং ডিফিব্রিলেটর স্থাপনের মতো বিষয় জনসমক্ষে এসেছিল। তাঁর তুলনায় ট্রাম্পের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনেক বেশি সীমিত বলেই মনে করছেন রাইনার।
১. ২২ জন বিশেষজ্ঞ কেন?
একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ২২ জন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হল কেন? এত বড় চিকিৎসকদল কি নিছক পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ ছিল, নাকি কোনও নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যা খুঁজে দেখতেই এত বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করা হয়েছিল? হোয়াইট হাউস এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
২. হাতে কালশিটে দাগের কারণ কী?
ট্রাম্পের হাতে বারবার কালশিটে দাগ দেখা যাওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নের তালিকায় রয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নিয়মিত করমর্দন এবং অ্যাসপিরিন সেবনের কারণেই এমন হতে পারে। রাইনার জানতে চেয়েছেন, প্রেসিডেন্ট কত মাত্রায় অ্যাসপিরিন খান এবং তাঁর বয়স ও শারীরিক অবস্থার জন্য সেই মাত্রা উপযুক্ত কি না। অতিরিক্ত অ্যাসপিরিন রক্তপাত এবং সহজে কালশিটে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৩. পা ফোলা ‘দীর্ঘস্থায়ী’ হল কীভাবে?
ট্রাম্পের পা ফোলার সমস্যাকে ‘ক্রনিক’ বা দীর্ঘস্থায়ী বলা হলেও আগের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার উল্লেখ ছিল না কেন? সমস্যা যদি বহুদিনের হয়ে থাকে, তা আগে ধরা পড়েনি কেন? আর যদি নতুন হয়ে থাকে, তবে সেটিকে শুরুতেই ‘ক্রনিক’ বলা হল কোন ভিত্তিতে—এটাই রাইনারের প্রশ্ন।
৪. প্রকাশ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন কেন দেখান?
বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বৈঠকে ট্রাম্পকে কখনও কখনও তন্দ্রাচ্ছন্ন দেখানোর বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হয়েছে কি না, জানতে চেয়েছেন রাইনার। দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব ঘুমের সমস্যা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে ছবি বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখে কোনও চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না—রাইনার নিজেও তা স্বীকার করেছেন।
৫. হৃদ্যন্ত্র ও পেটের আলট্রাসাউন্ড কেন?
গত অক্টোবরে ওয়াল্টার রিডে ট্রাম্পের হৃদ্যন্ত্র ও পেটের আলট্রাসাউন্ড করা হয়েছিল। সেটি কি নিয়মিত প্রতিরোধমূলক পরীক্ষা ছিল, নাকি কোনও নির্দিষ্ট উপসর্গের কারণে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করেছিলেন? কেন এই পরীক্ষা প্রয়োজন হয়েছিল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
৬. তিনি ঠিক কী কী ওষুধ খান?
ট্রাম্প বর্তমানে কোন কোন ওষুধ সেবন করছেন, সেই পূর্ণ তালিকাও প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। রাইনারের মতে, ওষুধের তালিকা জানা গেলে হাতে কালশিটে দাগ, পা ফোলা কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্নতার মতো বিষয়গুলির সম্ভাব্য কারণ বোঝা সহজ হত।
৭. বারবার কগনিটিভ পরীক্ষা কেন?
ট্রাম্প একাধিকবার প্রাথমিক মানসিক দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু কেন বারবার এই পরীক্ষা প্রয়োজন হল? কোনও নির্দিষ্ট উদ্বেগ থেকেই কি তা করা হয়েছিল? আরও বিস্তারিত স্নায়ু-মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, করা হয়ে থাকলে তার ফল কী—এই তথ্যও প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন রাইনার।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেওয়া জরুরি—রাইনার ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চিকিৎসক নন। তিনি প্রকাশ্যে থাকা তথ্য ও নথি পর্যালোচনা করে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যকে কোনওভাবেই ট্রাম্পের রোগনির্ণয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে থাকা ব্যক্তির স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসাধারণ কতটা তথ্য জানার অধিকার রাখে?
মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিয়মিত নিজের কর্মক্ষমতার চিকিৎসাগত প্রমাণ প্রকাশে বাধ্য করার কোনও আইন নেই। নিক্সন প্রশাসনের সময় থেকে বার্ষিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন প্রকাশ একটি রাজনৈতিক রীতিতে পরিণত হলেও তা বাধ্যতামূলক নয়। সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেয়। তবে এর চতুর্থ ধারায় যে স্থায়ী সংস্থার সম্ভাবনার কথা রয়েছে, কংগ্রেস এখনও সেই ধরনের কোনও কমিশন গঠন করেনি।
ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেমি রাসকিন প্রেসিডেন্টের সক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য স্বাধীন ‘কমিশন অন প্রেসিডেনশিয়াল ক্যাপাসিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ফলে ট্রাম্পের স্বাস্থ্য নিয়ে বর্তমান বিতর্ক কেবল তাঁর পা ফোলা, হাতে কালশিটে দাগ বা পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন আরও বড়—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন নেতার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা সম্পর্কে নাগরিকের জানার অধিকার ঠিক কতটা?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



