Table of Contents
ছাত্র আন্দোলন, প্রশ্নফাঁস, সামাজিক মাধ্যমের বিস্ফোরক প্রভাব, উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব—একাধিক ইস্যুতে মুখ খুললেন বিজেপি সাংসদ ও অভিনেতা রবি কিষাণ। The Indian Express-এর Idea Exchange অনুষ্ঠানে তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে যেমন উঠে এসেছে ছাত্রদের ক্ষোভের প্রতি সহানুভূতি, তেমনই স্পষ্ট হয়েছে মোদী সরকারের প্রতি তাঁর আস্থা।
সব মিলিয়ে রবি কিষাণের বক্তব্যে একটি রাজনৈতিক বার্তা বেশ পরিষ্কার—ক্ষোভকে অস্বীকার নয়, কিন্তু তার সমাধানের দায় সরকারের হাতেই; আর সেই সরকারকে তিনি এখনও বিশ্বাস করেন।
ছাত্রদের কষ্ট বুঝছেন, আস্থাও রাখছেন মোদীতে
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই ছাত্রদের যন্ত্রণা ও ক্ষোভকে খাটো করেননি রবি কিষাণ। চার সন্তানের বাবা হিসেবে পরীক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের উদ্বেগ তিনি বুঝতে পারেন বলেও জানান। তাঁর মতে, লক্ষ লক্ষ ছাত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা খেলেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাঁর অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট। রবি কিষাণের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছাত্রদের কথা শুনছেন। গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও বার্তাকেও তিনি সরকারের সংবেদনশীলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
তাঁর যুক্তি, দেশের ছাত্রদের উদ্দেশে যদি প্রধানমন্ত্রী রাতেও বার্তা দেন, তাহলে বোঝা যায় তাঁদের কণ্ঠস্বর সরকারের কাছে পৌঁছেছে। ছাত্রদের যৌক্তিক দাবিগুলি শেষ পর্যন্ত পূরণ হবে বলেও তিনি আশাবাদী।
অর্থাৎ, ছাত্রদের ক্ষোভকে স্বীকার করলেও সেই ক্ষোভের রাজনৈতিক দায় সরাসরি মোদী সরকারের ওপর চাপানোর বদলে সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা সরকারের হাতেই রয়েছে—এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন তিনি।
প্রশ্নফাঁসে আজীবন জেলের দাবি
প্রশ্নফাঁসের মতো অপরাধ ঠেকাতে আরও কঠোর আইনের পক্ষেও সওয়াল করেছেন রবি কিষাণ। তাঁর মতে, সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে বসে আলোচনা করলে এমন আইন তৈরি করা সম্ভব, যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্রশ্নফাঁস করার সাহস না পায়।
এমন অপরাধের জন্য আজীবন কারাদণ্ড হওয়া উচিত বলেও মত তাঁর।
রবি কিষাণের যুক্তি, প্রশ্নফাঁস শুধু একটি পরীক্ষার অনিয়ম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লক্ষ লক্ষ পরিবারের স্বপ্ন, অর্থ এবং বছরের পর বছর ছাত্রদের পরিশ্রম। সামান্য আর্থিক লাভের জন্য যারা এই অপরাধ করে, তাদের প্রতি কোনও সহানুভূতি থাকা উচিত নয় বলেই মনে করেন তিনি।
আন্দোলন হোক, কিন্তু ‘অন্য পথে’ নয়
ছাত্রদের প্রতিবাদের অধিকারকে অস্বীকার না করলেও আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে সতর্ক করেছেন রবি কিষাণ।
তাঁর বক্তব্য, ছাত্ররা যে নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে পথে নেমেছে, সেই মূল ইস্যুর সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক স্লোগান বা উদ্দেশ্য যুক্ত হয়ে গেলে আন্দোলনের আসল উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ছাত্রদের আন্দোলন যেন অন্য কোনও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, সেই বার্তাই দিয়েছেন তিনি।
এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিজেপির পক্ষ থেকে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার না করেও তার রাজনৈতিক ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যম—‘অজানা শক্তি’
সাক্ষাৎকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সামাজিক মাধ্যম নিয়ে রবি কিষাণের মন্তব্য।
তাঁর মতে, সামাজিক মাধ্যম এমন এক ‘অজানা শক্তি’, যা রাতারাতি কাউকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে, আবার মুহূর্তের মধ্যে কারও ভাবমূর্তিও ধ্বংস করে দিতে পারে।
আগে বহু ঘটনা ঘটলেও সেগুলি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত। এখন একটি ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে ডিজিটাল যুগে কোনও বিষয় সহজে চাপা রাখা সম্ভব নয়—এই বাস্তবতাও স্বীকার করেছেন তিনি।
তবে সামাজিক মাধ্যমের শক্তির পাশাপাশি এর দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপরও জোর দিয়েছেন। জনপ্রিয়তা বা অনুসারী বাড়ানোর জন্য দেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনও প্রচার করা উচিত নয় বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
উত্তরপ্রদেশে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি
ছাত্র আন্দোলন আগামী উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে কি না, সেই প্রশ্নেও যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী রবি কিষাণ।
তাঁর দাবি, উত্তরপ্রদেশের তরুণরা গত কয়েক বছরে তাঁদের পরিবার কী কী সুবিধা পেয়েছে, তা জানে। রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, শৌচাগার, মেয়েদের শিক্ষা, সরকারি চাকরি এবং পুলিশে নিয়োগ—এই উন্নয়নমূলক কাজগুলিই সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রশ্নফাঁস নিয়ে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হলেও সেই ক্ষোভ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নয় বলেও দাবি তাঁর। বরং তাঁদের মূল দাবি, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।
মোদী-যোগীর প্রতি আস্থার বার্তা
সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছেন রবি কিষাণ।
প্রধানমন্ত্রীকে তিনি একজন ভালো শ্রোতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান।
যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রসঙ্গে রবি কিষাণ বলেন, গোরখপুরের সাংসদ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, এই সম্পর্ক এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে সহায়ক হয়েছে।
গোরখপুরে গত আট বছরে এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, এইমস, সার কারখানা এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো পরিকাঠামোগত উন্নয়নকে তার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
রাম মন্দির ইস্যুতেও সরকারের পাশে
অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদান নিয়ে ওঠা তছরুপের অভিযোগ প্রসঙ্গেও সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন রবি কিষাণ।
তাঁর বক্তব্য, অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। কয়েকজনের দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাই এই ইস্যু উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে না বলেই তাঁর দাবি।
সেন্সরশিপে স্বাধীনতা, নির্মাতারও দায়
চলচ্চিত্রের সেন্সরশিপ নিয়েও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা বলেছেন রবি কিষাণ।
তাঁর মতে, সেন্সর বোর্ডের স্বাধীনতা থাকা দরকার। তবে একই সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। কোনও ছবি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় বা ইতিহাসকে বিকৃত করে, তাহলে নির্মাতাদের নিজেদেরই সেই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়া উচিত।
তবে সেন্সরশিপের কারণে বহু ভালো ছবি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এ কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।
সংগ্রাম থেকে রাজনীতির মঞ্চে
সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের কথাও বলেছেন রবি কিষাণ। মুম্বইয়ে এসে প্রায় ১৫ বছর সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ করেও অভিনয় ছাড়েননি তিনি। বড় সুযোগের অপেক্ষায় থেকেও লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন।
পরে ভোজপুরি ছবি ‘সইয়াঁ হামার’ তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। এরপর ভোজপুরি চলচ্চিত্র শিল্পকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন তিনি। তাঁর দাবি, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘লাপাতা লেডিজ’-এ অভিনয়ের জন্যও প্রশংসা ও পুরস্কার পেয়েছেন রবি কিষাণ। তাঁর বক্তব্য, অভিনয় এবং রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই তিনি সমান নিষ্ঠায় কাজ করছেন।
রবি কিষাণের রাজনৈতিক বার্তা কোথায়?
পুরো সাক্ষাৎকারটি খতিয়ে দেখলে রবি কিষাণের বক্তব্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল চোখে পড়ে।
তিনি একদিকে ছাত্রদের ক্ষোভ, প্রশ্নফাঁসের সমস্যা এবং সামাজিক মাধ্যমের বাড়তে থাকা শক্তিকে বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে বারবার তুলে ধরেছেন মোদী সরকারের সংবেদনশীলতা, আলোচনার মানসিকতা এবং কঠোর আইন আনার সম্ভাবনা।
অর্থাৎ, আন্দোলনকে অস্বীকার নয়, বরং তার ক্ষোভকে সরকারের সংস্কার ও সমাধানের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়াই তাঁর বক্তব্যের মূল সুর।
সামাজিক মাধ্যমকে তিনি গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে স্বীকার করেছেন, আবার তার অপব্যবহারের বিপদও তুলে ধরেছেন। একইভাবে ছাত্রদের প্রতিবাদের অধিকার মেনে নিয়েও আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, রবি কিষাণের সাক্ষাৎকারকে শুধু একজন অভিনেতা-সাংসদের ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখলে ছবির বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য বিজেপির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তার আভাস রয়েছে—ছাত্রদের আশ্বস্ত করা, প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি, সামাজিক মাধ্যমের শক্তিকে স্বীকার করা এবং একই সঙ্গে মোদী সরকারের ওপর আস্থা বজায় রাখা।