Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে থাকা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীর কাছে পৌঁছে যায় দিল্লির বার্তা। সরকারি সূত্রের খবর, তাঁকে জানানো হয় যে শিক্ষামন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্ব তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে। খবর পেয়েই তিনি দ্রুত দিল্লি ফিরে এসে রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর এক্স (সাবেক টুইটার)-এ জোশী লেখেন, “আজ আমি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমার উপর যে আস্থা রেখেছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। গভীর দায়িত্ববোধ ও বিনয়ের সঙ্গে এই দায়িত্ব গ্রহণ করছি।”
যদিও আপাতত এটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বলেই মনে করা হচ্ছে, তবু এই দায়িত্ব জোশীর রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিজেপি নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার উপর কতটা ভরসা করেন, তারই প্রতিফলন এই সিদ্ধান্তে। দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি নিজের বাসভবনে জাতীয় পরীক্ষণ সংস্থা (এনটিএ)-র শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই সংস্থার কাজকর্ম নিয়েই মূলত আলোচনা হয়।
ধারওয়াড়ের সংগঠক থেকে জাতীয় রাজনীতির মুখ
৬৩ বছরের প্রহ্লাদ জোশীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমে। ১৯৯৪ সালে কর্ণাটকের হুব্বলির ইদগাহ ময়দান আন্দোলনের সময় তিনি প্রথম রাজ্য রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। উমা ভারতীর নেতৃত্বে কার্ফু অমান্য করে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা ঘিরে পুলিশের গুলিতে ছয়জনের মৃত্যু হয়। কর্ণাটকের রাজনীতিতে ‘মিনি অযোধ্যা’ নামে পরিচিত সেই ঘটনাই উত্তর কর্ণাটকে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এরপর ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তিনি ধারওয়াড় জেলা বিজেপির সভাপতি এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৪ সালে ধারওয়াড় উত্তর কেন্দ্র থেকে প্রথমবার লোকসভায় নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর ধারওয়াড় উত্তর কেন্দ্র বিলুপ্ত হলেও ধারওয়াড় কেন্দ্র থেকেই তিনি ধারাবাহিকভাবে জিতে আসছেন। এখনও পর্যন্ত তিনি কোনও লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত হননি।
কর্ণাটক বিজেপির সংকটে ভরসার মুখ
প্রয়াত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনন্ত কুমারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন জোশী। ২০১৩ সালে বি. এস. ইয়েদিয়ুরাপ্পার দলত্যাগের পর কর্ণাটক বিজেপি যখন বড় সংকটে পড়ে, তখন রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকেই। ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালে অনন্ত কুমারের মৃত্যুর পর থেকে দিল্লিতে কর্ণাটক বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন জোশী। ২০১৯ সালে তিনি সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী এবং কয়লা ও খনি মন্ত্রকের দায়িত্ব পান।
মোদী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকগুলির দায়িত্বে
মোদী সরকারের তৃতীয় মেয়াদে প্রহ্লাদ জোশীর হাতে ছিল ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন এবং নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রকের দায়িত্ব। খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ‘প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা’-র বাস্তবায়ন তদারকি করেন।
নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রী হিসেবে তিনি ‘পিএম সূর্য ঘর যোজনা’-র মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের রূপায়ণের দায়িত্ব সামলেছেন। অন্যদিকে ভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন আন্তঃমন্ত্রক গোষ্ঠীরও তিনি সদস্য, যারা বাজারদর পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সুপারিশ করে।
কর্ণাটকে ফেরার জল্পনা, এল শিক্ষামন্ত্রকের দায়িত্ব
সাম্প্রতিক রাজ্যসভা নির্বাচনে ক্রস ভোটিং এবং কর্ণাটক বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে জোশীকে রাজ্যে ফিরিয়ে সংগঠন শক্তিশালী করার জল্পনা চলছিল। অনেকের ধারণা ছিল, তাঁকে আবার কর্ণাটক বিজেপির নেতৃত্বে আনা হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে আপাতত সরিয়ে রেখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্বই তাঁর কাঁধে তুলে দিল কেন্দ্র।
সমস্যা সমাধানে দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ২০২৪ সালে হরিয়ানা-দিল্লি সীমান্তের শম্ভু এলাকায় কৃষক আন্দোলনের সময় আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিতর্কও ছিল
২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের আগে জেডিএস নেতা এইচ. ডি. কুমারস্বামী তাঁকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। তিনি উত্তর কর্ণাটকের ‘বিভাজনের রাজনীতি করা ব্রাহ্মণ নেতা’ বলে জোশীকে কটাক্ষ করেন। সেই সময় বিজেপি জিতলে জোশী মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন— এমন জল্পনাও চলছিল।
এখন অবশ্য তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট দূর করা। এনটিএ-কে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিতর্ক, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনরুদ্ধার— এই তিনটি বিষয়ই নতুন দায়িত্বে প্রহ্লাদ জোশীর সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে।