বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতায় ছাত্র বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ এখনও পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। রাজ্য সরকারের দাবি, ধৃতদের মধ্যে অন্তত একজনের অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যোগসূত্র ছিল। তবে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীই সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-ও স্পষ্ট জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের কোনও সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই।

এদিকে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, কলকাতার এই আন্দোলন প্রকৃত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। তাঁর অভিযোগ, এর আড়ালে “ইসলামি মৌলবাদী” গোষ্ঠীর সদস্যরা সক্রিয় ছিল এবং তারাই পরিকল্পিতভাবে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে তিনি প্রকাশ্যে কোনও প্রমাণ পেশ করেননি।

শুভেন্দু বলেন, গোয়েন্দা তথ্য এবং পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হচ্ছে যে, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের অনেকেই ছাত্র নন। তাঁর দাবি, আন্দোলনের আবহকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ও মৌলবাদী শক্তি পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজ্যে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে।

অন্যদিকে কলকাতা পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, পুলিশের উপর হামলা, ইট-পাটকেল ছোড়া এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি খতিয়ে দেখছেন। আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রের দাবি।

সরকারি সূত্রের বক্তব্য, ধৃতদের মধ্যে একজন অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু জানানো হয়নি। এই তথ্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বর্তমানে দলের সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নন। দলের বক্তব্য, বিচ্ছিন্ন কোনও ব্যক্তির অতীত পরিচয় দেখিয়ে গোটা দলকে দায়ী করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরও একই দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কেউই তাদের সংগঠনের সদস্য নন।

ককরোচ জনতা পার্টিও বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ অহিংস এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। যারা ভাঙচুর বা হিংসায় জড়িয়েছে, তাদের সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই। সিজেপির দাবি, আন্দোলনকে বদনাম করার জন্য বিভিন্ন অসামাজিক উপাদান ইচ্ছাকৃতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও রাজনৈতিক যোগসূত্র নিয়ে বিতর্ক আগামী দিনেও চলবে। কারণ একদিকে সরকার বিরোধীদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, প্রকৃত ছাত্র আন্দোলনকে দুর্বল করতেই এই ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে।

এদিকে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, সংঘর্ষে জড়িতরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এসেছিল কি না, তাদের মধ্যে কোনও সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছিল কি না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কীভাবে তাদের সমন্বয় করা হয়েছিল। প্রয়োজনে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে পুলিশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা। কারণ ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে যদি সত্যিই বহিরাগত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে থাকে, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। আবার কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনও গোষ্ঠীকে দোষী সাব্যস্ত করাও সমানভাবে অনুচিত। তাই তদন্তের ফল এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণই শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের নিষ্পত্তি করবে।