বাংলাস্ফিয়ার: গ্রিসের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট অলিম্পাস—যাকে প্রাচীন গ্রিক পুরাণে দেবতাদের আবাসভূমি বা ‘জিউসের সিংহাসন’ বলা হয়—তাকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site)-এর মর্যাদা দেওয়ার দাবি নতুন করে জোরদার করেছে গ্রিস। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, এই পর্বত শুধু গ্রিকদের নয়, সমগ্র মানবজাতির সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই আর দেরি না করে এর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জরুরি।
দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ৪৮তম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির বৈঠকে রবিবার থেকে অলিম্পাসের মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। বহু বছরের প্রচেষ্টার পর এবার গ্রিস আশাবাদী হলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও অনিশ্চিত।
ডিয়ন-অলিম্পাস এলাকার মেয়র ইভানজেলোস গেরোলিওলিওস স্মরণ করেন, চার দশকেরও বেশি আগে প্রথমবার অলিম্পাসের চূড়ায় ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন বদলে দিয়েছিল। তাঁর কথায়, “ওই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল যেন ইতিহাস, পুরাণ ও প্রকৃতি একসঙ্গে মিশে গেছে। সেই অনুভূতি আজও ভুলতে পারিনি।”
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৯১৮ মিটার উঁচু অলিম্পাসকে হোমারের রচনায় দেবতাদের আসন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, এখানেই দেবরাজ জিউস দেবসভা বসাতেন।
গ্রিস প্রথম ২০১৪ সালে অলিম্পাসকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। যুক্তি ছিল, এটি একদিকে যেমন অসামান্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক, তেমনই জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৩৮ সালে অলিম্পাসকে গ্রিসের প্রথম জাতীয় বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৮১ সালে ইউনেস্কো এটিকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২১ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ডিক্রির মাধ্যমে এটি জাতীয় উদ্যান হিসেবেও ঘোষিত হয়।
পর্বতটির পাদদেশে অবস্থিত লিটোখোরো শহর থেকে অল্প দূরেই একদিকে সবুজ বন, গিরিখাত, ঝরনা ও আলপাইন তৃণভূমি, অন্যদিকে এজিয়ান সাগরের মনোরম সৈকত—এই অনন্য ভৌগোলিক বৈচিত্র্য অলিম্পাসকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
গেরোলিওলিওসের মতে, “অলিম্পাসের গুরুত্ব পার্থেননের সমতুল্য। বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেলে শুধু মর্যাদা বাড়বে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পরিবেশ ও ইতিহাস রক্ষা করাও সহজ হবে।”
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৭০টি দেশে ১,৪২৮টি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল রয়েছে। গ্রিসে রয়েছে ২১টি বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল, যার মধ্যে মাত্র দুটি একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার অর্থ শুধু আন্তর্জাতিক সম্মান নয়; এর ফলে সংরক্ষণে ইউনেস্কোর কারিগরি সহায়তা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং প্রয়োজনে আর্থিক সহযোগিতাও পাওয়া যায়। পাশাপাশি উন্নয়নের চাপ ও অতিরিক্ত পর্যটনের মতো হুমকি মোকাবিলাও সহজ হয়।
গত এক দশকে অলিম্পাসে পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। শুধু গত বছরই প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ এই পর্বত ভ্রমণ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’ মুক্তির পর গ্রিসের প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।
অলিম্পাস জাতীয় উদ্যানের উপ-পরিচালক দিমিত্রিস পাপ্পাস বলেন, “আমরা পর্যটকদের স্বাগত জানাই, কিন্তু অতিরিক্ত ভিড় পরিবেশের জন্য বড় ঝুঁকি। বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেলে সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে।”
তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেড়ে চলা বন দাবানল এখন অলিম্পাসের সবচেয়ে বড় বিপদ। আগুন প্রতিরোধে বনপথ পরিষ্কার রাখা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সেতু ও রাস্তার উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।
অলিম্পাস শুধু পুরাণের জন্যই নয়, ধর্মীয় ইতিহাসের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি প্রাচীন উন্মুক্ত উপাসনাস্থলের সন্ধান মিলেছে, যেখানে প্রাচীনকালে জিউসের উদ্দেশে পশুবলি দেওয়া হত বলে মনে করা হয়। এছাড়া বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত গ্রিক অর্থোডক্স গির্জাগুলির একটি এবং একাধিক বাইজান্টাইন মঠও এই পর্বতমালায় অবস্থিত।
তবে অলিম্পাসের বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি এবারই মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইউনেস্কোর উপদেষ্টা সংস্থা আইকোমস এবং আইইউসিএন নাকি আরও তথ্য চেয়ে মনোনয়নটি গ্রিসের কাছে ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করেছে।
তবু গেরোলিওলিওসের বক্তব্য স্পষ্ট—“স্বীকৃতি মিলুক বা না-ই মিলুক, আর অপেক্ষার সময় নেই। অলিম্পাসে পর্যটকের চাপ ইতিমধ্যেই বহনক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গেছে। এখনই আরও কঠোর সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।”