Table of Contents
উপগ্রহ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—দাবানল ঠেকাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু স্পেনের দক্ষিণ কাতালোনিয়ায় আগুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভরসা রাখা হয়েছে একেবারে অন্যরকম ‘দমকল বাহিনীর’ উপর—উদ্ধার করা গাধার পাল!
দক্ষিণ ইউরোপে এ বছরের গ্রীষ্মের শুরু থেকেই একের পর এক ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। স্পেনেই ইতিমধ্যে ২ লক্ষ ৪০ হাজার একরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ‘টিভিসা ডঙ্কি ফায়ারফাইটার্স’ নামে একটি অলাভজনক সংস্থা পুরনো এক প্রাকৃতিক পদ্ধতিকেই নতুন করে কাজে লাগাচ্ছে।
সংস্থাটি পরিত্যক্ত ও নির্যাতিত গাধাদের উদ্ধার করে তাদের পুনর্বাসন করে। এরপর তাদের কাজে লাগানো হয় বনাঞ্চলের শুকনো ঘাস ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে। গাধারা সেই দাহ্য উদ্ভিদ খেয়ে ফেলায় স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয় অগ্নিনিরোধক ফাঁকা এলাকা বা ‘ফায়ারব্রেক’। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।
কীভাবে শুরু হল এই ‘গাধা বাহিনী’?
এই অভিনব উদ্যোগের শুরু ২০২০ সালে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা জোয়ান সেদো সান্স ২০১৩ সালে নিজের বাড়ির আশপাশে আগুন লাগার পর একটি বিষয় লক্ষ্য করেন—গাধারা নিচু ঝোপঝাড় ও শুকনো ঘাস পরিষ্কার করে দেওয়ায় আগুন ছড়ানোর মতো দাহ্য উপাদান অনেকটাই কমে যায়।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শুরু হয় প্রকল্পটি। বর্তমানে ৬২টি উদ্ধার করা গাধা সরকারি ও ব্যক্তিগত জমিতে চারণ করে বনাঞ্চলের দাহ্য ঘাস পরিষ্কার রাখছে।
তবে এই প্রকল্পের লাভ শুধু বন রক্ষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্যাতিত ও পরিত্যক্ত গাধারাও পাচ্ছে নতুন জীবন—নিয়মিত পশু-চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং নিজেদের দলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ।
এই দলে রয়েছে রবার্তো—একসময় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া একটি গাধা, যাকে কসাইখানায় পাঠানোর আগেই উদ্ধার করা হয়েছিল। রয়েছে পালোমাও, অতিরিক্ত বিস্কুট ও চিনির টুকরো খাওয়ানোর ফলে যে একসময় গুরুতর স্থূল হয়ে পড়েছিল।
কেন গাধাই?
গবেষকদের মতে, গাধারা স্বাভাবিকভাবেই এমন শুকনো ঘাস খেতে পছন্দ করে, যা খুব সহজে আগুন ধরে এবং দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। তাদের ভারী পায়ের চাপ শুকনো পাতার স্তরও ভেঙে দেয়। ফলে মাটিতে জমে থাকা দাহ্য পদার্থের পরিমাণ কমে।
বার্সেলোনার স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জর্দি বার্তোলোমে ফিলেয়ার মতে, গাধা, ভেড়া ও ছাগলের মতো বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণী একসঙ্গে ব্যবহার করলে বনভূমির বিভিন্ন স্তরের ঝোপঝাড় আরও কার্যকরভাবে পরিষ্কার করা যায়।
অবশ্য এই পদ্ধতি সব দাবানল ঠেকাতে পারে না। তবে আগুনের তীব্রতা কমানো এবং তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে।
‘দমকল বাহিনী’ নয়, প্রকৃতির নিজস্ব সমাধান
দমকলকর্মীরা প্রশিক্ষণের সময় যে অগ্নিনিরোধক ফাঁকা এলাকা তৈরি করেন, গাধারা নিয়মিত সেখানে ঘাস খেয়ে সেই পথ পরিষ্কার রাখে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে ওই পথ দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
আসলে এই উদ্যোগ নতুন কোনও আবিষ্কার নয়। এটি ঐতিহ্যবাহী পশুচারণভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনারই আধুনিক পুনরুজ্জীবন। স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যেই বুনো ঘোড়া, ভেড়া ও ছাগলকে ব্যবহার করে একই ধরনের প্রকল্প চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সহায়তা বাড়লে এই পদ্ধতি আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমানে ‘টিভিসা ডঙ্কি ফায়ারফাইটার্স’ মূলত অনুদান ও বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতার উপর নির্ভর করে কাজ চালাচ্ছে।
জোয়ান সেদোর কথায়, তাঁরা আসলে নতুন কিছু করছেন না। বরং গ্রামীণ জীবনের সেই পুরনো জ্ঞানকেই ফিরিয়ে আনছেন—যেখানে মানুষ ও প্রাণী একসঙ্গে মিলে প্রকৃতিকে রক্ষা করত।