Home খবর মার্কিন-সৌদি পরমাণু চুক্তি: শান্তিপূর্ণ জ্বালানি নাকি বিশ্বজুড়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা?

মার্কিন-সৌদি পরমাণু চুক্তি: শান্তিপূর্ণ জ্বালানি নাকি বিশ্বজুড়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
9 views 3 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্য সৌদি আরবকে একটি আধুনিক বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা করা। বিদ্যুৎ উৎপাদন, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং তেলনির্ভরতা কমানোই এর প্রধান উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে। তবে পরমাণু বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ধরনের পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথ খুলে দিতে পারে।

সৌদি আরব বহুদিন ধরেই “ভিশন ২০৩০” কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিকল্প জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা, শিল্পায়ন এবং জল লবণমুক্তকরণ প্রকল্পে বিপুল শক্তির প্রয়োজন মেটাতে দেশটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া নতুন চুক্তি সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ।

কিন্তু আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মূল কারণ প্রযুক্তি নয়, বরং তার সম্ভাব্য ব্যবহার। কারণ বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি এবং সামরিক পরমাণু কর্মসূচির মধ্যে প্রযুক্তিগত দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রেই খুব বেশি নয়। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মতো প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথও খুলে দিতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনও দেশ যদি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে বেসামরিক কর্মসূচি থেকেই অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় ফিরে এসেছে ১৯৫৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ারের ঘোষিত “অ্যাটমস ফর পিস” নীতি। সেই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বহু মিত্র দেশকে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পরমাণু শক্তির ব্যবহার বাড়ানো। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে দেখা যায়, সেই প্রযুক্তি ও জ্ঞান ব্যবহার করে একাধিক দেশ পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বর্তমান চুক্তিকে অনেক বিশ্লেষক সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব এখন “নিউক্লিয়ার হেজিং”-এর যুগে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ কোনও দেশ আজই পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করলেও এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করছে, যাতে প্রয়োজনে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করা যায়। এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন নয়, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত বিকল্প খোলা রাখে।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক উত্তেজনা চলছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমন অতীতেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র অর্জন করে, তবে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটতে বাধ্য হবে। ফলে সৌদির বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি কেবল জ্বালানি প্রকল্প হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের কৌশলগত প্রস্তুতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এতে শুধু সৌদি আরব নয়, অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলিও নতুন হিসাব কষতে শুরু করতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক কিংবা মিশরের মতো দেশও নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি সম্প্রসারণে আরও আগ্রহী হতে পারে। এক দেশের সক্ষমতা বাড়লে প্রতিবেশীরাও নিরাপত্তার স্বার্থে একই পথে হাঁটার চেষ্টা করে—আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই প্রবণতাকেই বলা হয় “নিরাপত্তা দ্বিধা”। এর ফলেই শুরু হতে পারে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা।

এই প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এশিয়া ও ইউরোপের কিছু দেশও ক্রমশ এমন অবস্থানে যেতে পারে, যেখানে তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র তৈরি না করলেও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি বজায় রাখবে। ফলে বৈশ্বিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।

অবশ্য মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধি এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তদারকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ থাকবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় পরিচালিত হবে। সমর্থকদের মতে, সৌদি কর্মসূচিকে মার্কিন সহযোগিতার আওতায় রাখলে তা অন্য কোনও দেশের অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিগত সহায়তার তুলনায় বেশি স্বচ্ছ ও নিরাপদ থাকবে।

তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যেতে পারে একটি দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্তও। তাই আজকের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির ভিত্তি হয়ে উঠবে না—এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না।

এই কারণেই মার্কিন-সৌদি পরমাণু চুক্তিকে অনেক বিশেষজ্ঞ কেবল একটি জ্বালানি সহযোগিতা নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে সম্ভাব্য নতুন পরমাণু যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। যদি আরও দেশ “নিউক্লিয়ার হেজিং”-এর পথ অনুসরণ করে, তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের বর্তমান কাঠামো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি ও কৌশলগত অস্ত্র সক্ষমতার সূক্ষ্ম সীমারেখা ভবিষ্যতে কতটা অটুট থাকবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles