হাইলাইটস:

  • ইরানের তেল কেনায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে দেওয়া ছাড় অবিলম্বে প্রত্যাহার করল ট্রাম্প প্রশাসন।
  • একই দিনে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে ইরানের বিরুদ্ধে ফের সামরিক অভিযান শুরু করেছে আমেরিকা।
  • হোয়াইট হাউসের দাবি, যুদ্ধবিরতি ছিল “আচরণনির্ভর”; ইরান শর্ত ভাঙায় আর তা বহাল রাখার কারণ নেই।
  • তেহরান এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দিলেও নতুন করে সংঘাত ছড়ানোর আশঙ্কা তীব্র হয়েছে।
  • বিশ্ব জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সদ্য কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা মঙ্গলবার আরও জোরালো হল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছে, ইরানের তেল ও জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে এতদিন যে নিষেধাজ্ঞা-ছাড় বা ‘ওয়েভার’ কার্যকর ছিল, তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী।

মার্কিন অর্থ দফতর জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির পরেও ইরান আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সেই কারণেই আগের সমঝোতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, যুদ্ধবিরতি কোনও স্থায়ী রাজনৈতিক চুক্তি ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণরূপে “আচরণনির্ভর” ব্যবস্থা। অর্থাৎ, ইরান যদি আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে এবং উত্তেজনা না বাড়ায়, তবেই ছাড় ও সংঘাতবিরতি বহাল থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমেরিকার দাবি, তেহরান সেই শর্ত মানেনি।

এই অবস্থায় ইরানের তেল রপ্তানির উপর নতুন করে আর্থিক চাপ বাড়তে চলেছে। এতদিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কিছু দেশ বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে ইরানি জ্বালানি কিনতে পারত। সেই সুযোগ তুলে নেওয়ায় ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উপর বড় ধাক্কা আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

শুধু অর্থনৈতিক পদক্ষেপেই থেমে থাকেনি ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে ইরানের নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। অভিযানের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ করিডর। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানির দামে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই দীর্ঘ সংঘাতের পর দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। সেই সময় আশা করা হয়েছিল, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরপরই হরমুজ অঞ্চলে একাধিক নিরাপত্তা-সংকট দেখা দেওয়ায় সেই আশা দ্রুত ম্লান হয়ে যায়।

মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, তারা সংঘাত চায় না, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ-চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপসও করবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরান যদি আন্তর্জাতিক জলপথে হামলা চালিয়ে যায়, তবে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, তেহরান এখনও পর্যন্ত এই নতুন মার্কিন হামলা এবং নিষেধাজ্ঞা-ছাড় প্রত্যাহার নিয়ে বিস্তারিত সরকারি প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে অতীতে ইরান বারবার দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে সংঘটিত বহু ঘটনার জন্য তাকে অন্যায়ভাবে দায়ী করা হয় এবং মার্কিন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।

পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে বিশ্বের বড় অর্থনীতি এবং তেল আমদানিকারী দেশগুলি। কারণ হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিবহণ ব্যয়ও বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর।

কূটনৈতিক মহলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে আবার সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বেড়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়লে শুধু আমেরিকা ও ইরান নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়াই নতুন করে অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এখন বিশ্বশক্তিগুলির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।