Home অতিথি কলম বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্যের মহাকাব্য: বাঙালির অস্তিত্বের উপাখ্যান

বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্যের মহাকাব্য: বাঙালির অস্তিত্বের উপাখ্যান

বাঙালির বারো মাস মানে বারোটা আলাদা অনুভূতি। চৈত্র-সংক্রান্তির ধুলো উড়িয়ে বৈশাখ আর জৈষ্ঠ্য যখন আসে, তখন মজ্জার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা জাগে। ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এ হলো আমাদের শিকড় আর হারানো শৈশবে ফেরার এক অলৌকিক ইশারা।

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 33 views 14 minutes read
A+A-
Reset

বাঙালির বারো মাস আসলে বারোটা পৃথক অনুভূতির নাম গো। আমাদের একেকটা মাস যেন একেকটা আলাদা রঙের শাড়ি বা ধুতি—যার ভাজে ভাজে লুকিয়ে থাকে উৎসব আর বিরহের হাজারো গল্প। কিন্তু যখন চৈত্র-সংক্রান্তির সেই খড়খড়ে তপ্ত রোদ্দুর আর ধুলো উড়িয়ে কালবৈশাখীর মাতম নিয়ে বৈশাখ আসে, আর তার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে রসাল জৈষ্ঠ্য হাজির হয়—তখন আমাদের মজ্জার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা খেলা করে। এই দুটো মাস আমাদের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের শুষ্ক তারিখ বা পঞ্জিকার পাতা নয় গো; এ হলো আমাদের ‘ঘরমুখো’ হওয়ার এক অলৌকিক ইশারা। এই সময়টা এলেই কেন জানি না শহরের এই দমবন্ধ করা কংক্রিটের জঙ্গলটা বড্ড অচেনা লাগে, মনটা কেবলই পালাই-পালাই করে।

বৈশাখ মানেই তো সেই নতুন জামার মাড়-দেওয়া গন্ধ, আর জৈষ্ঠ্য মানে বিকেলের বারান্দায় বসে আমের আঁটি চুষতে চুষতে জীবনকে এক অন্য নজরে দেখা। এই দুই মাস মানেই আমাদের হারিয়ে ফেলা সেই শিকড়, আমাদের ধুলোমাখা ধুতি পরা শৈশব আর এক অন্তহীন নস্টালজিয়া। যখন উত্তপ্ত দুপুরে রোদের ঝিলিক ঘাসের ওপর আলপনা আঁকে, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে দিদিমার সেই আচারের বয়াম আর পুরোনো রোয়াকে বসে পাড়ার দাদাদের আড্ডা। বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মানে আসলে এক ধরণের অবুঝ জেদ—পুরোনো সব জীর্ণতাকে পুড়িয়ে নতুন করে বেঁচে ওঠার জেদ। এ হলো সেই সময়, যখন গঙ্গা আর পদ্মার দু’পারের মানুষই বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে বলে ওঠে— ‘আমি আছি, আমরা আছি’। এই অস্থিরতাই তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, এই নস্টালজিয়াটুকুই তো আমাদের একমাত্র সম্বল।

ইতিহাসের পদচ্ছাপ ও পঞ্জিকার বিভাজন

বাংলা সনের ইতিহাসটা কিন্তু বেশ গোলমেলে, একদম গোলকধাঁধার মতো। আমরা যে ক্যালেন্ডার দেখে আজ উৎসব করি, তার শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হয় সেই সপ্তম শতকের গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের আমলে। অনেকে তো বলেন তিনিই এই অব্দের প্রবর্তক। আবার একটা বড় অংশ মনে করেন, মুঘল সম্রাট আকবর যখন দেখলেন হিজরি সনের সাথে আমাদের এদেশের খাজনা আদায়ের সময়টা ঠিক মিলছে না, তখনই তিনি তাঁর জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে দিয়ে তৈরি করালেন ‘ফসলি সন’। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সেই যে যাত্রা শুরু হলো, সময়ের বিবর্তনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের প্রাণের ‘বাংলা সন’—আমাদের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক আইডেন্টিটি।

তবে একটা মজার ব্যাপার খেয়াল করেছেন? দুই বাংলার নববর্ষের তারিখের মধ্যে কিন্তু এখন একটা সূক্ষ্ম অথচ বেশ খটমটে ফারাক তৈরি হয়েছে। ১৯৬৩ সালে ওপারে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাঁরা বিজ্ঞান আর আধুনিকতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, বৈশাখ থেকে ভাদ্র—এই পাঁচ মাস হবে ৩১ দিনে, আর আশ্বিন থেকে চৈত্র হবে ৩০ দিনে। এই হিসাব মেনেই বাংলাদেশে ১৪ই এপ্রিল দিনটিকে পহেলা বৈশাখ হিসেবে একদম পাকাপাকিভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

আর এপারে আমাদের কী অবস্থা? আমরা আজও সেই প্রাচীন ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ আর জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর ভরসা করে তিথি-নক্ষত্র গুনে পঞ্জিকা বানাই। আমাদের দিন শুরু হয় সূর্যোদয় থেকে, আর মাসের দৈর্ঘ্য ঠিক হয় সূর্যের রাশি পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে। ফলে মহাজাগতিক ঘূর্ণনের কারণে আমাদের নববর্ষ মাঝেমধ্যে এক দিন পিছিয়ে যায়। এই যে ওপারে ১৪ তারিখ আর এপারে কখনও ১৪ কখনও ১৫—এই একদিনের ব্যবধান আসলে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা আর আমাদের সেই চিরায়ত ঐতিহ্যের মধ্যে এক চমৎকার লুকোচুরি খেলা। মানচিত্রের কাঁটাতার তো ছিলই, এখন সময়ের এই এক দিনের দূরত্বও যেন আমাদের বৈচিত্র্যকেই মনে করিয়ে দেয়। দিন যাই হোক না কেন, উৎসবের মেজাজটা কিন্তু গঙ্গা আর পদ্মা—দু’পাড়েই একবারে সেই একই তারে বাঁধা!

সাহিত্যের আয়নায় বৈশাখ: রুদ্র ও তাপস

বৈশাখ বললেই আমাদের মতো বাঙালির কানে সবার আগে বাজে রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ আহ্বান—

“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, / অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”

রবি ঠাকুর বৈশাখকে দেখেছিলেন এক ‘তাপস’ হিসেবে, যে তার কঠোর তপশ্চর্যার আগুন দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত মলিনতা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়। তাঁর কাছে বৈশাখ মানে কেবল ক্যালেন্ডারের শুরু নয়, বৈশাখ মানে এক নির্মোহ আত্মশুদ্ধি। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন? ঠাকুর কিন্তু তাঁর জীবনের ‘শেষ’ পর্বেও এই বৈশাখী মেজাজে নিজেকে বদলেছেন বারবার।

যখন তিনি শেষের কবিতা লিখছেন, তখন তাঁর কলমে ফুটে উঠছে এক আধুনিক প্রেমের জয়গান, যা প্রথাগত সম্পর্কের শেকল ভাঙতে চায়। অমিত আর লাবণ্যের সেই বিচ্ছেদও যেন বৈশাখের এক পশলা বৃষ্টির পর শান্ত আকাশের মতো সুন্দর। আবার একদম শেষে, যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শুয়ে ‘শেষ লেখা’-র কবিতাগুলো লিখছেন, তখন কোনো অলঙ্কার নেই, কোনো আতিশয্য নেই। চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদম নিরাভরণ গলায় তিনি বলছেন—

“সত্য যে কঠিন, / কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, / সে কখনো করে না বঞ্চনা।” বৈশাখও তো সেই কঠিন সত্যের মতোই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়—রূঢ় কিন্তু অকৃত্রিম।

আবার নজরুলের বৈশাখ কিন্তু একদম অন্য ধাতুতে গড়া। তাঁর কাছে বৈশাখ মানে শান্ত তাপস নয়, বরং হাতে ডমরু নেওয়া এক বিদ্রোহী কালভৈরব। তিনি যখন তাঁর তপ্ত কলমে গর্জে ওঠেন— “তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়”, তখন আমরা শিরদাঁড়ায় এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করি। নজরুল আমাদের শিখিয়েছিলেন যে ধ্বংসের তাণ্ডব না হলে নতুনের অভিষেক সম্ভব নয়; ওই কালবৈশাখীর ঝাপটানিটাই আসলে নতুন প্রাণের জন্মলগ্নের চিৎকার।

অন্যদিকে জীবনানন্দের কবিতায় বৈশাখ বড় বিচিত্র, বড় নিঝুম। তাঁর বৈশাখ মানে রুদ্র প্রলয় নয়, বরং এক বিষণ্ণ তপ্ত দুপুর। যেখানে চিল উড়ছে রৌদ্রের ঘ্রাণ মেখে, আর রোদে পোড়া ঘাসের ওপর বসে কেউ একজন মহাকালের হিসেব মেলাচ্ছে— “সবিতা দেখিয়াছি বৈশাখের নিরুদ্বেগ দুপুরে / ম্লান ঘাসে ব’সে ব’সে…”। আর আমাদের প্রিয় শঙ্খ ঘোষ? তিনি তো বৈশাখকে টেনে নিয়ে এলেন একদম আমাদের অন্দরমহলে। তিনি আমাদের দেখালেন যে বাইরের ওই গাছ উপড়ানো কালবৈশাখীই শেষ কথা নয়; আসল ঝড়টা তো বইছে আমাদের মনের আয়নায়। তাঁর কবিতায় বৈশাখ হয়ে উঠল আমাদের নিজেদের সাথে নিজেদের সংঘাতের এক নির্মম প্রতিফলন। বৈশাখ আমাদের বাইরে যত না পোড়ায়, শঙ্খবাবুর বয়ানে সে আমাদের ভেতরটাকে যেন তার চেয়েও বেশি খাঁটি করে দিয়ে যায়।

প্রতিরোধ ও বিবর্তনের শোভাযাত্রা

১৯৪৭ সালে সেই অভিশপ্ত দেশভাগের করাত যখন এক নিমেষে আস্ত একটা বাঙালি জাতিকে রাজনৈতিকভাবে দু’টো দেশে—পশ্চিমবঙ্গ আর পূর্ব বাংলায় চিরে দিল, তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল আমাদের নাড়ির টান বুঝি ছিঁড়ে গেল। মানচিত্র আলাদা হলো, পাসপোর্টের সিল পড়ল, কিন্তু বাঙালির বৈশাখ পালন করার আদিম আকাঙ্ক্ষাকে কি আর কোনো কাঁটাতার দিয়ে আটকে রাখা যায় গো? পাকিস্তান হওয়ার পর যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে ওপার বাংলার ভাষা আর সংস্কৃতির ওপর বারবার বিষাক্ত আঘাত এসেছে, তখন এই পহেলা বৈশাখই হয়ে উঠেছিল বাঙালির জাতিসত্তা রক্ষার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।

১৯৫৪ সালে যখন যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো, তখন পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করাটা ছিল কেবল একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; ওটা ছিল উর্দু-পাগল শাসকগোষ্ঠীর মুখে বাঙালির প্রথম সজোরে মারা চড়। ওটা ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের প্রথম বড় জয়। কিন্তু দমনের খেলা তো থেমে থাকেনি। ১৯৬৭ সালে যখন আইয়ুব সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ‘অ-ইসলামিক’ তকমা দিয়ে রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারের ওপর খাঁড়া ঝোলাল, তখন ছায়ানটের একদল সাহসী মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।

ঢাকার রমনা বটমূলের সেই যে বৈশাখী আয়োজন—সেটা কি কেবল গানবাজনা ছিল? একদম না! ওটা ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে সেদিন লড়াই করেছিলেন মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই), ওয়াহিদুল হক, সনজীদা খাতুন, ফরিদা হাসান আর কামাল লোহানীর মতো কিছু স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ। বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়েও তাঁদের সেই জেদ আর সুরের শক্তিতেই বাঙালির নববর্ষ এক জাতপাতহীন, অসাম্প্রদায়িক আর সার্বজনীন রূপ পেল।

আশির দশকে যখন আবারও সামরিক শাসনের বুট আমাদের কণ্ঠরোধ করতে চাইল, তখন সেই একই প্রতিরোধের সুর ধ্বনিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু হওয়া এক অভিনব মিছিলের মাধ্যমে। ১৯৮৯ সালে যখন পাপেট আর মুখোশ নিয়ে সেই মিছিল রাজপথে নামল, তখন তার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। সময়ের আবর্তে ১৯৯৬ সাল থেকে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে দুনিয়া জুড়ে স্বীকৃতি পেলেও, আমরা যারা ইতিহাসটা জানি, তারা বুঝি যে ‘আনন্দ’ শব্দটার ভেতরেই ছিল স্বৈরাচারকে অবজ্ঞা করার সেই আসল মেজাজ। আজ ২০২৬-এর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আবারও যখন সেই আদি নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ফিরিয়ে আনার এক জোরালো হাওয়া বইছে চারিদিকে, তখন মনে হয়—চক্রটা যেন পূর্ণ হচ্ছে। নাম বদলালেও বাঙালির সেই অদম্য জেদটা কিন্তু আজও একই আছে।

এস. এম. সুলতান ও কৃষকের বৈশাখ

বৈশাখের এই নাগরিক উদযাপনে শিল্পী এস. এম. সুলতানের সেই কালজয়ী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নতুন করে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের কাছে বৈশাখ মানে যখন নতুন জামা, শপিং আর লাল-সাদা পাঞ্জাবি; সুলতানের ক্যানভাসে বৈশাখ তখন বাংলার সেই খেটে খাওয়া মানুষের পেশিবহুল অস্তিত্বের লড়াই। তাঁর আঁকা সেই প্রকাণ্ড শরীরের কৃষকদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বৈশাখ মানে আসলে এক আদিম শক্তির উত্থান। সুলতান বিশ্বাস করতেন, বাংলার মাটির আসল মালিক যারা, সেই কৃষকরা কোনো দুর্বল মানুষ নয়; তারা প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা এক একজন ‘মহাবীর’।

সুলতান সাহেব চেয়েছিলেন এই উৎসবগুলো যেন কেবল আমাদের শহরের শিক্ষিত ড্রয়িংরুমের শৌখিন বিলাসিতা বা কফি হাউসের আড্ডার বিষয় হয়ে না থাকে। তাঁর কাছে বৈশাখ ছিল সরাসরি সেই মেঠো মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার ডাক। নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে তাঁর গড়া ‘শিশুস্বর্গ’ আসলে ছিল এক ভিন্ন সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর। সেখানে বৈশাখ মানে কেবল মেলার হুল্লোড় নয়, বরং কালবৈশাখীর ধ্বংসলীলা শেষে নতুন করে ঘর বাঁধার এক অদম্য জেদ।

তাঁর গ্রামবাংলার ছবিতে বৈশাখ আসে মাটির সাথে মানুষের সেই নিবিড় আর নাড়ির সম্পর্কের প্রতীক হয়ে। যখন শহরের বাবুরা এসি ঘরে বসে পান্তা-ইলিশের উৎসবে মাতেন, সুলতানের ক্যানভাস তখন মনে করিয়ে দেয় যে, বৈশাখ মানে চৈত্র শেষে ফেটে যাওয়া চৌচির মাটির ওপর লাঙল চালিয়ে সোনার ফসল ফলানোর এক কঠোর প্রতিজ্ঞা। তিনি চেয়েছিলেন মেলা মানে হোক গ্রামের মানুষের মিলনমেলা, যেখানে নাগরদোলার সাথে মিশে থাকবে ফসলের গান আর কৃষকের ঘামের গন্ধ। সুলতানের সেই অতিমানবীয় কৃষকদের অবয়বে বৈশাখ যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য হয়ে ধরা দেয়—যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শিকড়টা আসলে কাদার ভেতরেই পোঁতা, ড্রয়িংরুমের টবে নয়।

কালবৈশাখী ও হারানো আমবাগানের নস্টালজিয়া

সাহিত্যের গাম্ভীর্য বা ইতিহাসের কচকচানি সরিয়ে রেখে যদি একটু আমাদের ফেলে আসা স্মৃতির অলিগলিতে হাঁটি, তবে প্রথমেই নাকে এসে ধাক্কা দেবে কালবৈশাখীর ঠিক আগের সেই অদ্ভুত সোঁদা মাটির গন্ধ। জানেন তো, ওই গন্ধটা পৃথিবীর কোনো দামি পারফিউম কোম্পানি আজও তৈরি করতে পারল না! চৈত্র-বৈশাখী দুপুরে যখন চরাচর খা খা করত, হঠাৎ করেই উত্তর-পশ্চিম কোণটা কেমন জানি সিঁদুরে কালো হয়ে আসত। সেই ঘন অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই শুরু হতো প্রকৃতির এক অদ্ভুত মাতলামি।

গাছের ডালগুলো একে অপরের সাথে কুস্তি শুরু করত, আর আমরা—বাড়ির সব ‘পিলে চমকানো’ দুরন্ত দল—মায়ের কড়া শাসন আর বাবার চোখের রাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দৌড় দিতাম সেই পুরোনো আমবাগানটার দিকে। আকাশ চিরে যখন বিদ্যুতের ঝিলিক আর বাজ পড়ার শব্দ আসত, আমাদের বুকটা ঢিপঢিপ করলেও আম কুড়ানোর সেই পাগলামির কাছে সব ভয় ছিল তুচ্ছ। ঝোড়ো হাওয়ায় ধুলোমাখা মুখে, চোখ কচলাতে কচলাতে ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে টুপটাপ খসে পড়া সেই কাঁচা আমগুলো খুঁজে পাওয়ার মধ্যে যে কী রাজকীয় আনন্দ ছিল, তা আজকের এই ‘অনলাইন ডেলিভারি’র যুগে বোঝানো অসম্ভব!

মনে পড়ে সেই কাঁচা আমের বুক-ফাটানো টক স্বাদ? আমের গায়ে লেগে থাকা ধুলোটা গেঞ্জির কোণ দিয়ে মুছেই এক কামড়—নুন-লঙ্কার দরকার পড়ত না, বুনো আনন্দটাই ছিল আসল মশলা। ঝড়ের তাণ্ডব কমলে যখন কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরতাম, তখন দরজায় দাঁড়ানো মায়ের সেই ‘অগ্নিমূর্তি’ আর হাতের ঝ্যাঁটা বা বকুনি—আজ এই এসি-র ঠান্ডা ঘরে বসে ভাবলে মনে হয়, ওটাই তো ছিল আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পত্তি।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু-দুর্গার সেই অমর গল্প তো কেবল বইয়ের পাতায় নয় গো, আমাদের প্রত্যেকের শৈশব আসলে ওই আমবাগানের আনাচ-কানাচেই কোনো এক ‘হারানিধি’ হয়ে আজও লুকিয়ে আছে। আমরা হয়তো বড় হয়ে কোট-প্যান্ট পরে কর্পোরেট সিঁড়ি চড়ছি, কিন্তু কালবৈশাখীর মেঘ দেখলেই আজও আমাদের মনের ভেতরের সেই হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটা আম কুড়ানোর জন্য ছটফট করে ওঠে। ওই বাগান, ওই ঝড় আর ওই বকুনিই তো আমাদের শিকড়ের আসল মাটির প্রলেপ।

হালখাতা ও জৈষ্ঠ্যের মধুমাখা পূর্ণতা

বৈশাখ যদি হয় আগুনের নাম, তবে জৈষ্ঠ্য হলো সেই দহন শেষে পাওয়া প্রকৃতির এক পরম আশীর্বাদ। আমাদের এই ‘মধু মাস’ মানেই তো বাঙালির রসনা-বিলাসের পূর্ণ যৌবন। বাজারের থলে উপচে পড়া হিমসাগর, ল্যাংড়া আর গোলাপখাস আমের সেই পাগল করা সুবাস—আহা! ওটা কেবল ফল নয় গো, ওটা একটা হাহাকার। আমের বোঁটা থেকে চুঁইয়ে পড়া কষ আর লিচুর সেই লাল টুকটুকে আভা যেন জানান দেয় যে প্রকৃতি তার সবটুকু ঐশ্বর্য বাঙালির পাতের জন্য উজাড় করে দিয়েছে।

আর জৈষ্ঠ্য মানেই তো সেই ‘জামাইষষ্ঠী’র ধুতি-পাঞ্জাবি আর আভিজাত্য। ভাবুন তো সেই দৃশ্যটা—শাশুড়ির হাতের পরম যত্নে তৈরি তেরো ব্যঞ্জন, থালার এক পাশে রাখা সেই ডাগর সাইজের ইলিশের গাদা আর পাশে সাজানো হরেক কিসিমের আম। এই উদ্যাপনগুলো তো কেবল খাওয়া-দাওয়া নয়, এগুলো আমাদের পারিবারিক মেলবন্ধনের এক একটা মজবুত ইঁট। সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই রসালো রম্যগদ্য বা বুদ্ধদেব বসুর নস্টালজিক স্মৃতিকথায় এই উৎসবগুলো তো বাঙালির এক পরম শৌখিন দলিলে পরিণত হয়েছে।

তবে নববর্ষের সেই আসল আমেজটা লুকিয়ে থাকত কিন্তু লাল মলাটের ‘হালখাতা’-য়। পয়লা বৈশাখ মানেই চন্দন আর ধুনোর গন্ধে আমোদিত সেই পাড়ার চেনা দোকানগুলো। নতুন ধুতি-পাঞ্জাবিতে সজ্জিত দোকানদার হৃষ্টচিত্তে সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন—সেখানে ব্যবসা আর বিশ্বাসের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটত। সেই যে জিলিপির রসে ভেজা আঙুল আর দোকানের নির্দিষ্ট স্বাদহীন কিন্তু বড্ড প্রিয় মচমচে মিষ্টির প্যাকেট—আজকের এই ক্যাশব্যাক আর ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে সেই ‘পার্সোনাল টাচ’টা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে গো।

আজ যখন বড় বড় শপিং মলে ট্রলি ঠেলি, তখন মনে পড়ে সেই ঘামে ভেজা বৈশাখী বিকেলের কথা, যেখানে বাবার আঙুল ধরে দোকানে গিয়ে একখানা ক্যালেন্ডার আর মিষ্টির প্যাকেট পাওয়ার মধ্যেই ছিল দুনিয়ার সমস্ত সার্থকতা। হালখাতার সেই খসখসে পাতার গন্ধ আর মিষ্টির রসমাখা শৈশব—এসবই তো আমাদের শিকড়, আমাদের বেঁচে থাকার রসদ। জৈষ্ঠ্যের দুপুরে আম-দুধ-ভাতের যে তৃপ্তি, তার কাছে পৃথিবীর সব ফাইভ-স্টার মেনুও নস্যি।

বিশ্বমঞ্চে নববর্ষ ও ডিজিটাল যুগের সংঘাত

আজ বাংলা নববর্ষের জোয়ার গঙ্গা-পদ্মা ছাড়িয়ে টোকিও থেকে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আজকের এই ডিজিটাল যুগে আমাদের জীবন যখন ওই ৫-ইঞ্চি স্ক্রিনে বন্দি, তখন বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের মাটির কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো অনেক কিছু দিতে পারে, কিন্তু কালবৈশাখীর সেই ঝোড়ো হওয়ার শিহরণ কি দিতে পারবে? পারবে কি কাঁচা আমের সেই নুন-লঙ্কার স্বাদ ফিরিয়ে দিতে? ডিজিটাল যুগে আমাদের ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’-এর ভিড়ে আমরা যেন সেই খড়খড়ে মাড় দেওয়া নতুন সুতির জামার আভিজাত্যকে কোথাও হারিয়ে ফেলছি।

শেষ কথা: শিকড়ের টানে

আসলে যদি একটু তলিয়ে ভাবেন, তবে দেখবেন বাঙালির এই বৈশাখ আর জৈষ্ঠ্য মানে কেবল পঞ্জিকার দুটো পাতা নয় গো; এ হলো এক হাতে ধ্বংসের ডমরু, আর অন্য হাতে সৃষ্টির পরম মমতা। এ যেন এক অনন্ত প্রবহমান নদী, যা কোনো কাঁটাতার বা ধর্মের বেড়াজালে আটকে থাকেনি। সেই নদীর স্রোতে আজও মিশে আছে সপ্তম শতকের শশাঙ্কের তরবারির ঝনঝনানি থেকে আকবরের ফসলি সনের ঘাম, নজরুলের অগ্নিকুণ্ড থেকে শুরু করে শঙ্খ ঘোষের সেই শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ আত্মানুসন্ধান। এস. এম. সুলতানের ক্যানভাসের সেই পেশিবহুল কৃষকের জেদ থেকে শুরু করে রমনা বটমূলে ওয়াহিদুল হকের সেই কালজয়ী সুর—সবই তো এই বৈশাখের এক সুতোয় গাঁথা। আমরা আসলে এই মহাকাব্যেরই এক একটা ছোট্ট চরিত্র।

আজকের এই হাঁসফাঁস করা যান্ত্রিক যুগে, যেখানে আমরা সবাই কেবল একটা অন্ধ ইঁদুর দৌড়ে ছুটে চলেছি, তখন বৈশাখ এসে আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। সে এসে আমাদের কলার চেপে ধরে মনে করিয়ে দেয়—লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি! সে আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পুরনো জীর্ণতার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে শেখায়। আর ওই দহন শেষে যখন আমরা ক্লান্ত, তখন জৈষ্ঠ্য ঠিক একজন স্নেহময়ী মায়ের মতো এসে পরম মমতায় আমাদের হাতে তুলে দেয় সেই লড়াইয়ের মধুর ফল—আম, জাম, লিচুর সেই অমৃত স্বাদ।

জানবেন, যতদিন এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষের রক্তে কালবৈশাখীর সেই দুর্দান্ত অস্থিরতা আর পাগলামিটুকৈ বেঁচে থাকবে, ততদিন পৃথিবীর কোনো ডিজিটাল অ্যালগরিদম আমাদের এই শেকড়কে উপড়ে ফেলতে পারবে না। জেমস তাঁর গানে ঠিক এক অমর আর্তি নিয়েই প্রশ্ন করেছিলেন— “যদি ভুলে যাও কখোনোও আম পাকা বৈশাখ, যদি ভুলে যাও কখোনোও বৃষ্টি ভেজা দুপুর…।” আমরা যেন না ভুলি। আসুন না, এই কাঠফাটা রোদ আর কালবৈশাখীর মাতাল হাওয়ায় আমরা নিজেদের সেই হারিয়ে যাওয়া ধুলোমাখা শৈশবের কাছে অন্তত আর একবার ফিরে যাই। কারণ দিনের শেষে কথাটা বড্ড সত্যি—মাটির গভীরে শেকড় না থাকলে যেমন বিশাল মহীরুহও এক ঝড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে, ঠিক তেমনি এই নস্টালজিয়া আর বুক-চিরে-আসা আবেগ ছাড়া আমাদের এই বাঙালি পরিচয়ের আসলে আর কোনোই দাম নেই।


সাগর চৌধুরী প্রযুক্তি-বিশ্লেষক ও ডিজিটাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles