বাংলাস্ফিয়ার: রাশিয়ার অর্থনীতিকে নিশানা করে তৈরি ব্যাপক নতুন নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ স্থগিত রাখলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষে পাশ হওয়া আইনের প্রয়োগে এই বিরতি দেশের জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন বলে আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার এক নির্বাহী আদেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, রাশিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্ক থেকে ছাড় দিচ্ছেন তিনি। এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত এল, যখন ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করছেন। এমনকি ইউক্রেনের নতুন নেতা প্রয়োজন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিরল দ্বিদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কংগ্রেসে প্রস্তাবটি পাশ হওয়ার পর গত মাসে সেই আইনে সই করেছিলেন ট্রাম্প। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর অর্থের জোগান আরও দ্রুত বন্ধ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
কংগ্রেসে এই আইনের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। রাশিয়ার সরকারি আধিকারিক, ব্যাঙ্ক এবং রুশ জ্বালানি পরিবহণ চালু রাখা ট্যাঙ্কারগুলির তথাকথিত ‘ছায়া নৌবহর’-এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সংস্থান রয়েছে এতে। দু’দিনের মধ্যেই আইনটির বিধান কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম পাঁচ আমদানিকারক দেশের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতেও ট্রাম্পকে নির্দেশ দিয়েছে এই আইন। তবে যে দেশগুলি রাশিয়ার মোট প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং সেই আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ করেছে, তাদের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টায় আমেরিকা রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কিনতে রাজি হয়েছে বলে ট্রাম্প জানানোর এক সপ্তাহের মাথায় শুক্রবারের এই ঘোষণা এল। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে ক্রেমলিনের উপর আমেরিকা ও পশ্চিমি দেশগুলি বছরের পর বছর ধরে যে চাপ তৈরি করে এসেছে, ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত সেই নীতিকেই উল্টে দিয়েছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এর পর নভেম্বরে আরও পাঁচ লক্ষ টন এবং ‘তার পরপরই’ আরও দশ লক্ষ টন ডিজেল আসবে। তিনি লিখেছিলেন, তার পর ‘অল্প সময়ের মধ্যেই’ রাশিয়া অতিরিক্ত তিরিশ লক্ষ টন ডিজেল সরবরাহ করবে।
এই ঘোষণার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট। ছয় জন রিপাবলিকান-সহ মোট বারো জন মার্কিন সেনেটর ট্রাম্পকে ডিজেল চুক্তি বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার পাঠানো এক চিঠিতে দুই দলের ওই আইনপ্রণেতারা গত মাসে পাশ হওয়া ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’-এ দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেন।
নিজের সই করা আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার জ্বালানির উপর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ করা অথবা সেগুলি থেকে ছাড় দেওয়ার জন্য ট্রাম্পের হাতে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সময় ছিল। প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবে, নাকি ছাড় দেবে, সে বিষয়ে আগে আইনপ্রণেতাদের কিছু জানানো হয়নি।
শুক্রবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় জেলেনস্কি বলেন, ডিজেল চুক্তির ফলে অর্থ ‘আবার রাশিয়ায় ঢুকতে শুরু করবে’।
গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্প আচমকাই ঘোষণা করেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া পরস্পরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না করতে সম্মত হয়েছে। এই ঘোষণা জেলেনস্কিকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত করে দেয়। আগামী মাসে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাকেই দায়ী করেছেন ট্রাম্প। মূল্যবৃদ্ধির জেরে মার্কিন সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে তাঁর রিপাবলিকান পার্টির অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাতছাড়া হতে পারে।
সন্দেহ করা হচ্ছে, রাশিয়ার আসন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ রাখছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর পরিষেবাও সীমিত করা হচ্ছে বলে সন্দেহ রয়েছে, যাতে ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা ১৬১ কিলোমিটারের বেশি গতিতে উড়তে থাকা ড্রোনে তা ব্যবহার করা না যায়। তবে এই দুই অভিযোগের কোনওটিই আনুষ্ঠানিক ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার এই আইন সেনেটর ডারলিন গ্রাহামের নির্বাচনী প্রচারেরও অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলিনকে তাঁর ভাইয়ের মেয়াদের বাকি কয়েক মাসের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। ওই আসনে আরও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি।
এই সপ্তাহের গোড়ায় সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজের সঙ্গে এক বিতর্কে গ্রাহাম বলেন, আইনটি পাশ করাতে সাহায্য করতে পেরে তিনি ‘অত্যন্ত গর্বিত’। তবে আইনটি কী ভাবে কার্যকর করা হবে, তা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের আওতাতেই পড়ে বলে মেনে নেন তিনি। গ্রাহামকে সমর্থন জানিয়েছেন ট্রাম্প। আগামী সপ্তাহে সাউথ ক্যারোলাইনায় তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের প্রচারে অংশ নেওয়ারও কথা রয়েছে।
কলাম্বিয়ায় ওই বিতর্কে গ্রাহাম বলেন, “এই আইন প্রেসিডেন্টের হাতে এমন কিছু উপায় তুলে দেয়, যা তিনি চাইলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি সেগুলি ব্যবহার করতে চান, নাকি অন্য কোনও পথ নিতে চান, তা তাঁর সিদ্ধান্ত। তবে আমার মনে হয়, এর উদ্দেশ্য পেট্রলের দাম কমানো এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান ঘটানো। যুদ্ধ শেষ হলে পেট্রলের দামও কমবে।”