বাংলাস্ফিয়ার: বেলজিয়ামে নিজেদের হাতে তৈরি ভোগ, সিঙ্গাপুরে ‘আনন্দ নাড়ু’ প্রতিযোগিতা। বাংলার বাইরে দুর্গাপুজোর আয়োজনেও অটুট চেনা স্বাদ, আচার আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ। পেশা ও বসবাসের ঠিকানা বদলেছে, কিন্তু শরৎ এলেই প্রবাসী বাঙালির কাছে ফিরে আসে পাড়ার পুজোর স্মৃতি। সেই স্মৃতিকেই পরের প্রজন্মের জীবনে জায়গা করে দিতে উৎসবের প্রস্তুতি।
বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পের উপকণ্ঠে ব্লাউয়ে রেগেনে পুজো করছে আগমনী বেলজিয়াম। ২০২৫ সালে কয়েকজন প্রবাসীর উদ্যোগে সংগঠনটির যাত্রা শুরু। কলাবউ স্নান, পুষ্পাঞ্জলি, সন্ধিপুজো—রীতি মেনেই সব আয়োজন। উদ্যোক্তা কোয়েল দাস জানিয়েছেন, বাংলা পঞ্জিকার তিথি মানতে কর্মব্যস্ততার মধ্যেও ছুটি নিয়েছেন তাঁরা। দেবীর প্রসাদ তৈরি হচ্ছে বাড়িতে। প্রতিদিন গুরুদ্বার থেকে হালুয়াও নিয়ে আসছেন এক স্বেচ্ছাসেবক। বাঙালিদের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও ভোগ রান্না, প্রসাদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হাত লাগাচ্ছেন।
সিঙ্গাপুরের লিটল ইন্ডিয়ায় বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন সিঙ্গাপুরের দুর্গাপুজোর ইতিহাস ১৯৫৬ সাল থেকে। এবারও ছবি আঁকা, সিঁদুরখেলা, গান এবং নানা অনুষ্ঠানে ভরা উৎসবসূচি। রয়েছে মহিলাদের ‘আনন্দ নাড়ু’ প্রতিযোগিতা। বর্ণালী ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ভোগ পরিবেশন থেকে সাজসজ্জা, দায়িত্ব ভাগ করে নেন সকলে। ব্যস্ত জীবনের মধ্যে এই কয়েকটি দিন দেশের পুরনো স্মৃতিতে ফেরার সুযোগ।
এই আয়োজনের পিছনে রয়েছে সাত দশকের সংগঠিত সামাজিক জীবন। অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ৫০টি পরিবারকে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু হয়েছিল। এখন সদস্য পরিবারের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। বিভিন্ন পেশার মানুষ এই সংগঠনে যুক্ত। পুরনো প্রজন্মের হাত থেকে দায়িত্ব নিয়েছেন নতুনেরা। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি রবীন্দ্রনজরুল জয়ন্তী, নাটক, গান, নৃত্য, খেলাধুলো ও মিলনোৎসবের মধ্যেও তাঁরা ধরে রাখছেন বাংলা সংস্কৃতির চর্চা।
পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাহিত্যচর্চাও। প্রতি বছর প্রকাশিত হয় দ্বিভাষিক পত্রিকা ‘মিলন’। সদস্যদের গদ্য, কবিতা ও ছবি সেখানে জায়গা পায়। ১৯৬০ সালে প্রথম প্রকাশিত এই পত্রিকার গোড়ার পর্ব ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি দপ্তরে প্রতিলিপি তৈরি করে হাতে পাতা সাজানো, স্ট্যাপল করা এবং ছাঁটার কাজ চলত। সেই ছোট উদ্যোগের ধারাবাহিকতা আজও বজায় রয়েছে। উৎসব তাই তাঁদের কাছে ভাষা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখারও উপলক্ষ।
সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সংগঠনের দুর্গাপুজো এখন ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে আকর্ষণ করে। গত ২৯ আগস্ট সত্তর বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে অতীতের স্মৃতির পাশাপাশি ভবিষ্যতের ভাবনাও উঠে এসেছে। সিঙ্গাপুরে জন্মানো তরুণ বাঙালিরা মঞ্চানুষ্ঠান, প্রযুক্তিগত আয়োজন এবং প্রচারের কাজে অংশ নিচ্ছেন। শিশু ও কিশোরদের জন্য সংগীত এবং সৃজনশীল চর্চার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বাংলা লোকসংগীতের সঙ্গে পপ, রক ও জ্যাজের নতুন সংলাপ তৈরিতে।
সংগঠনের কাজ উৎসবের বাইরেও বিস্তৃত। রক্তদান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আর্থিক বিষয়ে সচেতনতা এবং যুবসমাজের উদ্যোগে সহযোগিতা রয়েছে কর্মসূচিতে। বিভিন্ন পটভূমির মানুষকে একত্র করার আয়োজনও চলে। এই অভিজ্ঞতার তাৎপর্য হল, প্রবাসে সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার সঙ্গে স্থানীয় সমাজের অংশ হয়ে ওঠার সম্পর্ক তৈরি করা। শিশুদের জন্য পুজো তখন বাবা-মায়ের ফেলে আসা দেশের গল্পের পাশাপাশি নিজেদের বন্ধুত্ব ও স্মৃতির জায়গাও হয়ে ওঠে। সংগঠনের নেতৃত্বের লক্ষ্য, নতুন অভিবাসী পরিবারগুলির কাছেও এই পরিসর আপন হয়ে উঠুক। আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে চলচ্চিত্র, সংগীতনাট্য ও সাহিত্যের মাধ্যমে সদস্যদের প্রতিভা তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে। অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নতুনদের পথ দেখানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁরা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান।
তবু আয়োজনের সমস্ত আনন্দেও কলকাতার অভাব পুরোপুরি মেটে না। সিঙ্গাপুরবাসী রণজিৎ ভট্টাচার্যের কথায়, 'আরতির সময় চোখ বন্ধ করলে এখনও মনে পড়ে চেতলার পরিচিত পাড়ার মণ্ডপ'।