গাজা যুদ্ধ, লেবানন সংঘাত ও ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার আবহে আয়োজিত ইজরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। ১২০ আসনবিশিষ্ট ইজরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ (Knesset) সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। তবে সরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে, যা ম্যাজিক ফিগার থেকে ৮টি আসন দূরে। অন্যদিকে প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায়, যৌথভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়ে এই ঝুলন্ত সমীকরণে প্রধান ‘কিংমেকার’ বা নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে আরব দলগুলি।

ইজরায়েলি সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ একক বৃহত্তম দল ‘লিকুদ’ (Likud - ২৭টি আসন)-এর নেতা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে প্রথমে সরকার গঠনের জন্য ৪২ দিনের আনুষ্ঠানিক সময় দেবেন। এই সময়ের মধ্যে সরকার গড়ার তিনটি সম্ভাব্য পথ বা সমীকরণ নিয়ে ইজরায়েলি রাজনীতির অন্দরে কড়া দরকষাকষি শুরু হয়েছে:

  • ১. আইজেনকোট-আরব জোট (Eisenkot-Arab Coalition): গাদি আইজেনকোটের ‘ইয়াশার’ (Yashar) ও সহযোগী দলগুলি যদি দুই আরব দল— ‘জয়েন্ট লিস্ট’ (Joint List - ১১টি আসন) ও ‘রাম’ (Ra'am - ৮টি আসন)-এর সমর্থন পায়, তবে তাদের আসন সংখ্যা দাঁড়িয়ে যাবে ৬৭-তে। তবে গাজা যুদ্ধ, হামাস নিধন অভিযান এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে আরব দলগুলির সঙ্গে আইজেনকোটের মতাদর্শগত তীব্র ফারাক রয়েছে। পাশাপাশি নেতানিয়াহু এই জোটকে ইজরায়েলের ইহুদি সত্তার পরিপন্থী বলে সরব হয়েছেন।

  • ২. নেতানিয়াহু-আইজেনকোট জাতীয় ঐক্য সরকার (National Unity Government): নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট নিজেদের দূরত্ব ভুলে যৌথভাবে সরকার গঠন করতে পারেন। তবে ৭ অক্টোবরের সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং একাধিক দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই ছাদের নিচে কাজ না করার যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার আইজেনকোট নিয়েছিলেন, তা একটি বড় বাধা।

  • ৩. ভাঙন ধরিয়ে বিরোধী সাংসদ কেনা (Poaching Defectors): নেতানিয়াহু রাজনীতিতে কৌশলগত চালে অভ্যস্ত। তিনি প্রতিপক্ষ জোটে থাকা নফতালি বেনেট (B'Yachad) বা অভিগদোর লিবারম্যানের মতো পুরনো ডানপন্থী সতীর্থদের নিজ শিবিরে ভিড়িয়ে ম্যাজিক ফিগার ৬১ স্পর্শ করার চেষ্টা চালাতে পারেন।

যদি এই তিনটি সমীকরণের একটিও সফল না হয়, তবে ইজরায়েলকে আগামী বছর ফের নতুন করে সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুই অন্তর্বর্তীকালীন (caretaker) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ভারতের কূটনীতি ও কৌশলগত সম্পর্কে কী প্রভাব?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত গভীর সুসম্পর্ক বহুবার আন্তর্জাতিক স্তরে দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর তেল আবিব সফরের সময় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে 'বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বে' উন্নীত করা হয়। ভারত তার সামরিক চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ ইজরায়েল থেকে আমদানি করে (যার মধ্যে রয়েছে আয়রন ডোম, বারাক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও নজরদারি ড্রোন)।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকদের মতে, ইজরায়েলে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কে কোনো আঁচ পড়বে না। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লিকুদ পার্টি ছাড়া নফতালি বেনেট বা ইয়াইর লাপিদের মেয়াদেও দিল্লির সঙ্গে জেরুজালেমের প্রতিরক্ষা, সাইবার প্রতিরক্ষা, কৃষি ও যৌথ প্রযুক্তি গবেষণার ক্ষেত্র একই গতিতে এগিয়েছিল। ফলে ইজরায়েলের কুর্সিতে নেতানিয়াহু থাকুন বা আইজেনকোট, ভারতের কৌশলগত অবস্থান অক্ষুণ্ণই থাকবে।