১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত, সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা। তার পরেও ভারতে বিদ্যুৎ রফতানি চালু রাখল কাঠমান্ডু। কী ভাবে সম্ভব হল তা?

অগস্টের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালের বিদ্যুৎ পরিকাঠামো। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সঞ্চালন ব্যবস্থার ক্ষতির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা। অথচ এই বিপর্যয়ের মধ্যেও ভারতে বিদ্যুৎ রফতানি বন্ধ করেনি নেপাল। বরং, পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রফতানির অনুমোদন চেয়েছে তারা। কী ভাবে সম্ভব হল এই নজির?

সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত সময়ের আগেই ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য নেপাল সরকারের আবেদন অনুমোদন করেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক। মন্ত্রকের বক্তব্য ছিল, বন্যায় নেপালের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কমেছে দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা। ফলে বেড়েছে বিদ্যুতের প্রয়োজন।

কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেও কী ভাবে ভারতে বিদ্যুৎ রফতানি অব্যাহত রাখল নেপাল? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বর্ষার উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ, মরসুমি চাহিদা এবং বিদ্যুৎ বাণিজ্যের হিসাবনিকাশে।

বর্ষায় উদ্বৃত্ত, শীতে আমদানি

নেপাল মূলত ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি করে। এর সিংহভাগই যায় ভারতে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেডের (এনভিভিএন) মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি শুরু হয়।

নেপাল ও ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, তা ঋতুর উপরে নির্ভরশীল। বর্ষাকালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় দেশের চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকে নেপালের হাতে। সেই বিদ্যুতের বড় অংশই রফতানি করা হয় ভারতে। অন্য দিকে, শীতের শুষ্ক মাসগুলিতে জলপ্রবাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও হ্রাস পায়। তখন ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয় নেপালকে।

এনইএ-র বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে নেপালে মোট উপলব্ধ বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ১৮,৬২৪ মিলিয়ন ইউনিট। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত হয়েছে ১২,৩৯৪ মিলিয়ন ইউনিট। ভারতে রফতানি করা হয়েছে ৩,৮১৭ মিলিয়ন ইউনিট এবং বাংলাদেশে ১৪৮ মিলিয়ন ইউনিট।

তুলনায়, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে নেপালে মোট উপলব্ধ বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ১৫,৬৪১ মিলিয়ন ইউনিট। সে বছর দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত হয়েছিল ১১,৩৪৩ মিলিয়ন ইউনিট এবং ভারতে রফতানি হয়েছিল ২,৩৮০ মিলিয়ন ইউনিট।

অর্থাৎ, এক অর্থবর্ষের ব্যবধানেই ভারতে বিদ্যুৎ রফতানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। বেড়েছে রফতানি থেকে আয়ও। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে বিদ্যুৎ রফতানি করে নেপালের আয় হয়েছিল ১,৭৪৭ কোটি নেপালি রুপি। ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৯৩০ কোটি নেপালি রুপিতে।

উদ্বৃত্তই কি রক্ষাকবচ?

বন্যার পরেও ভারতে বিদ্যুৎ রফতানি চালু রাখার পিছনে বর্ষাকালীন উদ্বৃত্ত উৎপাদনকেই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন এনইএ-র মুখপাত্র অচ্যুতবাবু ঘিমিরে। তাঁর বক্তব্য, ২৬ অগস্টের বন্যার এক সপ্তাহের মধ্যেই আরও কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ভারতে বিদ্যুৎ রফতানির অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছিল নেপাল।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে ঘিমিরে বলেন, ‘‘বর্ষায় আমাদের হাতে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকে। সে কারণেই ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।’’

তবে শুধু উদ্বৃত্ত উৎপাদনই নয়, বন্যার পরে নেপালের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়াও এর একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন ভারত সরকারের আধিকারিকদের একাংশ।

বন্যায় ঘরবাড়ি, পরিকাঠামো ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুর্গত এলাকাগুলিতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় রফতানির জন্য কিছুটা বেশি বিদ্যুৎ হাতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

ক্ষতির পরিমাণ কম নয়

নেপালের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় বন্যার আঘাত ছিল যথেষ্ট গুরুতর। সে দেশের জ্বালানি মন্ত্রকের আগের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, কয়েকটি নির্মীয়মাণ প্রকল্প-সহ মোট ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রও।

ঘিমিরে জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ক্ষতির কারণে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় পৌঁছে দেওয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এর মধ্যে প্রায় ৭৪ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা সরাসরি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতে রফতানির অনুমোদন পাওয়া তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও ক্ষতির মুখে পড়ে। ওই তিন কেন্দ্রের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৫৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার বিদ্যুৎ ভারতে রফতানির অনুমোদন দিয়েছিল ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ)।

এর আগে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানিয়েছিল, ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্তত একটি—১৪ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার দেবীঘাট জলবিদ্যুৎকেন্দ্র—বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও ধাক্কা খেয়েছিল নেপাল। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানির সঙ্গে যুক্ত চিলিমে ও ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্র দু’টিও বন্যার কবলে পড়ে। তবে ঘিমিরে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহও ফের শুরু করেছে নেপাল।

বর্তমানে নেপালের মোট স্থাপিত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৪,২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রায় ৩,৭৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা চালু রয়েছে।

অর্থাৎ, বন্যায় বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর বড়সড় ক্ষতি হলেও বর্ষার উদ্বৃত্ত উৎপাদন এবং বিদ্যুতের চাহিদার ওঠানামা সামলে রফতানি চালু রাখতে পেরেছে নেপাল। তবে এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কতটা কমেছে, আর উদ্বৃত্ত উৎপাদনই বা কতটা সহায়তা করেছে, তার পূর্ণ হিসাব ছাড়া কোনও একটি কারণকেই একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা কঠিন।