জার্মানির বাভারিয়ায় অ্যাডলফ হিটলারের প্রাক্তন পাহাড়ি আস্তানা ‘ঈগলস নেস্ট’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩৩ বছর বয়সি এক জার্মান নাগরিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আগুনে ঐতিহাসিক ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেটিকে আদৌ বাঁচানো যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আধিকারিকেরা।
শুক্রবার রাতে দক্ষিণ জার্মানির ওবারজালৎসবের্গের পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত কেলস্টাইনহাউস ভবনটিতে আগুন লাগে। প্রায় ২০০ জন দমকলকর্মী আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেন। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত ভবনটিকে আগুনের গ্রাস থেকে রক্ষা করা যায়নি। ঘটনায় কেউ আহত হননি।
পুলিশ জানিয়েছে, দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন, গোটা ভবন আগুনে জ্বলছে। অনেক উঁচু পর্যন্ত উঠে যাচ্ছিল আগুনের শিখা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৮৩৪ মিটার বা প্রায় ৬,০০০ ফুট উচ্চতায় ভবনটির অবস্থান হওয়ায় আগুন নেভানোর কাজে প্রবল বাধার মুখে পড়েন তাঁরা।
পুলিশের মুখপাত্র লিসা মায়ারের কথায়, শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য ভারী বিশেষ সরঞ্জাম নিয়েই কেবল ভবনটিতে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত প্রায় ৯টা ১৫ মিনিটে ধোঁয়া শনাক্ত করার যন্ত্র থেকে অগ্নিসংকেত বেজে ওঠে। দমকলকর্মীরা রাত ৯টা ৫০ মিনিট নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছন। ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ভবনে। ছ’টি পুর এলাকার দমকল বিভাগ থেকে কর্মীদের পাশাপাশি বাভারিয়ান রেড ক্রস, স্থানীয় পার্বত্য উদ্ধারকারী দল এবং পুলিশও উদ্ধারকাজে যোগ দেয়।
প্রবল হাওয়া ও বৃষ্টির কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও সমস্যা হয়। পরে বৃষ্টি বদলে যায় বছরের প্রথম তুষারপাতে। কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালানোর পর গভীর রাতে দমকলকর্মীদের সরে আসতে হয়। শনিবার সকাল ৭টা নাগাদও আগুন জ্বলছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের তীব্রতা কমলেও ভবনটি থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকে।
জার্মান সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তদন্তকারীদের সন্দেহ, ইচ্ছাকৃত ভাবে আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। দমকলকর্মীরা ভবনের ভিতরে কাউকে পাননি।
জার্মান ট্যাবলয়েড বিল্ড-কে পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, ‘‘ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাড়িটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।’’ সংবাদসংস্থা এএফপি-র এক আলোকচিত্রীর বিবরণ অনুযায়ী, পাহাড়ি আস্তানাটির দিকে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
গ্রেফতার হওয়া ৩৩ বছর বয়সি ব্যক্তি জার্মান নাগরিক। ওই এলাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকলেও তিনি সেখানে থাকতেন না। সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি, তাঁর মধ্যে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা গিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের পিছনে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে ঘটনায় অন্য কারও যুক্ত থাকার ইঙ্গিত এখনও মেলেনি।
নাৎসি ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত নিদর্শন ‘ঈগলস নেস্ট’। ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়। ১৯৩৯ সালে নিজের জন্মদিনে ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন হিটলার। নাৎসি নেতাদের জন্য পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি এই অবকাশযাপনের আস্তানা পরে ঐতিহাসিক বৈঠকস্থল হিসেবেও পরিচিতি পায়। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, হিটলার নিজে সেখানে খুব কমই গিয়েছিলেন।
পাহাড় কেটে তৈরি একটি রাস্তা দিয়েই ভবনটির কাছে পৌঁছনো যায়। নাৎসি নেতারা প্রথমে একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেন। তার পর পাহাড়ের ভিতরে বসানো পিতলের লিফটে ১২৪ মিটার উঠে মূল ভবনে পৌঁছতেন।
নাৎসি শাসনের ‘উন্মত্ততার’ স্মারক হিসেবে ভবনটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তার ওয়েবসাইট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘ঈগলস নেস্ট’ ঘিরে নানা কিংবদন্তি তৈরি হয়। মার্কিন যুদ্ধের চলচ্চিত্রেও একে প্রায়ই নাৎসি নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকস্থল হিসেবে দেখানো হয়েছে।
১৯৫২ সাল থেকে ভবনটিতে একটি রেস্তোরাঁ এবং ইনস্টিটিউট ফর কনটেম্পোরারি হিস্ট্রির একটি প্রদর্শনী রয়েছে, যেখানে তার নাৎসি অতীত তুলে ধরা হয়। হিটলারের তৃতীয় রাইখের বিষাক্ত উত্তরাধিকারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ভবনটি এমন এক শাসনের স্মৃতি বহন করে, যার হাতে হলোকস্টে লক্ষ লক্ষ ইহুদি নিহত হন। রোমা জনগোষ্ঠী, যৌন ও লিঙ্গসংখ্যালঘু মানুষ এবং কমিউনিস্টরাও নাৎসি নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হন।
ভবনটির মালিক বাভারিয়ার রাজ্য সরকার। অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি কী ভাবে পুনরুদ্ধার করা হবে, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি, ইতিহাসবিদ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বাভারিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োয়াখিম হেরমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘ওখানে আমরা একটা ধ্বংসস্তূপ ফেলে রাখব না।’’ তাঁর বক্তব্য, ভবনটির ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে রাখার কাজ চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
এই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছে সংবাদসংস্থা এএফপি।