মঙ্গলবার ইজরায়েলিরা ভোট দেবেন। আমার জীবদ্দশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হতে চলেছে এটি। আমিও ভোট দেব, যদিও আপাতত থাকি নিউ ইয়র্কে। বিদেশে বসে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই ইজরায়েলিদের। ভোট দিতে হলে নির্বাচনের দিন দেশের মাটিতে থাকতেই হবে। তাই স্ত্রীকে নিয়ে বিমানে উঠছি। তিন সন্তানকে রেখে যাচ্ছি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা এক জনের কাছে। শুধু একটাই প্রার্থনা, যুদ্ধ যেন না বেধে যায়, আর আমরা যেন দেশে আটকে না পড়ি।

কেন এই ঝুঁকি নিচ্ছি আমরা? কারণ, আমাদের সন্তানদের ফিরে আসার মতো একটা দেশ থাকা দরকার। কারণ, ইজরায়েলের বর্তমান সরকারকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। চাই, এই সরকারের বিদায় হোক। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি একজন গর্বিত ইজরায়েলি। দেশের প্রতি নিজের কর্তব্যকে গুরুত্ব দিই। সেনাবাহিনী ডাকলে যেমন হাজির হই, তেমনই ভোটের ডাকেও সাড়া দিই। আমার কাছে দুটোই নাগরিকের দায়িত্ব।

আমরা অবশ্য একা নই। ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ অভিযানে ব্রুকলিন থেকে বার্লিন—সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা ইজরায়েলিরা দেশে ফেরার টিকিট কাটছেন। এই সফরের খরচ জোগাতে হয়তো কয়েক মাস পর পরিবারের একটি বিয়েতে যাওয়া হবে না। তবু ভোট দিতে ফিরছি। আমাদের অনেকেই সম্প্রতি ইজরায়েল ছেড়েছেন। কেউ কাজের প্রয়োজনে, কেউ বা টানা তিন বছরের যুদ্ধ আর দেশের পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে।

আমার পরিবারের বাড়ি ওয়াহাত আল-সালাম/নেভে শালোমে। এই গ্রামে ইহুদি ও প্যালেস্টাইনি পরিবার পাশাপাশি বাস করে, একসঙ্গে বড় করে সন্তানদের। আবার সেখানে ফিরতে আমার আর তর সইছে না।

কিন্তু বারবার একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে—কেমন একটা দেশে ফিরব আমরা?

তিন বছরের প্রতিবাদ আর যুদ্ধ ইজরায়েলকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করেছে। দেশ চালাচ্ছে এমন এক সরকার, যার প্রধান চিন্তা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা। তবু একটা বিষয় এখনও আমাদের হাতে রয়েছে—ভোট দিয়ে শাসকদের সরিয়ে দেওয়ার অধিকার।

২০০৬ সালে হামাসের জয়ের পর থেকে পশ্চিম তীর ও গাজার প্যালেস্টাইনিরা আর নির্বাচন করার সুযোগ পাননি। সিরিয়া ও মিশরে চলছে কর্তৃত্ববাদী শাসন। প্রতিবেশী জর্ডনে এখনও রাজতন্ত্র। অথচ আমার প্যালেস্টাইনি প্রতিবেশীরা ইজরায়েলের নাগরিক, তাঁরাও মঙ্গলবার ভোট দেবেন। ইজরায়েলের গণতন্ত্র আজ ক্ষতবিক্ষত, সমানাধিকারের ঘাটতিও প্রকট। তবু তা এখনও বেঁচে আছে। আর তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সমুদ্র পেরিয়ে দেশে ফেরা আমার কর্তব্য।

গত এক বছর আমেরিকায় থেকে বুঝেছি, বিশ্বের চোখে ইজরায়েলিরা কতটা বদলে গিয়েছেন। শুধু ইজরায়েলি হওয়ার কারণে বয়কট করা হচ্ছে শিল্পকর্ম, চলচ্চিত্র—এমনকি মোসাদকে নিয়ে তৈরি আমার ব্যঙ্গাত্মক ছবিটিও। মনে হচ্ছে, গোটা বিশ্ব আমাদের সবাইকে এক করে দেখছে আমাদের উগ্রপন্থী সরকারের সঙ্গে।

আমেরিকা থেকে এই সংঘাতকে অনেক সময় সাদা-কালো নৈতিক লড়াই বলে মনে হয়। যেন ঠিক পক্ষটি বেছে নিলেই, ঠিক কথাগুলি বললেই, একটা যুদ্ধবিরতি হলেই শান্তি নেমে আসবে। এই ভাবনার আকর্ষণ বুঝি। দূরে বসে থাকা অবস্থায় এমন সরল সমাধানে বিশ্বাস করা সহজ। যখন সাইরেন বাজে অন্য কোথাও, তখন চোখ বন্ধ করে সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবার সুযোগ থাকে।

ইজরায়েলিদের সেই বিলাসিতা নেই। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হয় শত্রুদের সবচেয়ে খারাপ আচরণের জন্য, নিজেদের নেতাদের সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তের জন্যও। আবার একই সঙ্গে আশা রাখতে হয়, দু’পক্ষই হয়তো আরও ভালো কিছু করতে পারে।

আমাদের গ্রামে আমার সন্তানরা প্যালেস্টাইনি সহপাঠীদের সঙ্গে একই দ্বিভাষিক স্কুলে পড়ে। অথচ এই বাস্তবতার পাশেই রয়েছে আরেকটি কঠিন সত্য—একদিন হয়তো তাদেরও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে, যেমন দিয়েছি আমি ও আমার স্ত্রী। এই স্ববিরোধ নিয়েই বাঁচি আমরা। আগে বেঁচে থাকা, তারপর শান্তির কথা। কারণ, শান্তির জন্য লড়াই করতে হলেও তো বেঁচে থাকতে হবে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সকালে দক্ষিণ ইজরায়েলে নিরাপদ কক্ষে লুকিয়ে থাকা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে যখন একের পর এক আতঙ্কের বার্তা আসছিল, তখন সেনাবাহিনীর ডাকের অপেক্ষা করিনি। গাড়ি চালিয়ে চলে গিয়েছিলাম আমার পুরনো রিজার্ভ ইউনিটে। সে দিন আমার মতো হাজার হাজার ইজরায়েলি একই কাজ করেছিলেন। আপনার পরিবারের উপর কেউ হামলা চালালে আপনি লড়তে এগিয়ে যাবেনই।

আমার বিশ্বাস, ইজরায়েলি ও প্যালেস্টাইনিরা এই ভূখণ্ড ভাগ করে নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারেন। কিন্তু ৭ অক্টোবরের সেই সকাল আমার স্নায়ুতন্ত্রে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছে যে, বিশ্বাস আর ভয় পাশাপাশি বাস করে। এক দিকে আমার মূল্যবোধ, অন্য দিকে শরীরের স্মৃতি। দুয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত লড়াই চলে।

এখন আর আশা করি না, এই লড়াইয়ে কোনও একটি পক্ষ চূড়ান্ত জয় পাবে। আমার চেনা অধিকাংশ ইজরায়েলিই এমন দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যান। দূর থেকে দেখলে একে ভণ্ডামি মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে এটাই রোজকার জীবন।

যুদ্ধ ভয়াবহ হয়েছে। গাজায় বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের গ্রামের প্যালেস্টাইনি পরিবারগুলিও সেখানে নিজেদের আত্মীয়দের কবর দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না যে ইজরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে, সরকারের আচরণকে সমর্থন করি। দুটো অবস্থান একসঙ্গে ধরে রাখা যায়—এক দিকে নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা, অন্য দিকে সরকারের কাজের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ পোষণ করা।

আর সেই ক্ষোভই আমাকে বিমানে উঠতে বাধ্য করছে।

প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর শরিকদের কাছে উগ্রপন্থার মোকাবিলার একটাই উত্তর—আরও বলপ্রয়োগ। সংঘর্ষের পরেও কেমন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়, তার কোনও দিশা তাঁরা দেখাননি। যেন যুদ্ধই একমাত্র পথ, আর যুদ্ধের পরের দিন বলে কিছু নেই।

আমার মতো ইজরায়েলিদের কথা সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা কয়েকটি শব্দে আমাদের জটিল বাস্তবতা ধরা পড়ে না। অথচ আমরা সর্বত্র রয়েছি। আমরা সামরিক পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করি, আবার এই সরকারের বিরুদ্ধে মিছিলেও হাঁটি। আমরা সন্তানদের বড় করি, আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে একটি দেশ গড়ার চেষ্টা করি। আর আমরা ভোট দিই।

এই হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনে প্রবাসী ইজরায়েলিরাই হয়তো হয়ে উঠবেন শেষ মুহূর্তের অপ্রত্যাশিত ফ্যাক্টর।

সত্যি বলতে, অনেক হিসাবনিকাশ করে এই সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়েই ফেলেছিলাম। মাত্র একটি ভোটের জন্য সমুদ্র পেরোনো, তার উপর সময়ের ফারাকে শরীরের ধকল—সব মিলিয়ে অঙ্কটা কঠিন। তার পরেই ঘটে গেল ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা। ইজরায়েলি যাত্রীতে ভরা বিমান, ককপিটে হামলাকারী, আর বিমানটি এগিয়ে চলেছে আমাদের দেশের বিমানবন্দরের দিকে। যাত্রীরা উদ্ধারের অপেক্ষায় বসে থাকেননি। নিজেরাই এগিয়ে গিয়ে হামলাকারীকে কাবু করেন। শেষ মুহূর্তে বিমানটি নাক তুলে ওপরে উঠে যায়।

আমার দেশের অবস্থাও যেন সেই বিমানের মতো। পতনের দিকে ছুটে চলেছে, অথচ উদ্ধার করতে কেউ আসবে না। আমাদেরই এগিয়ে যেতে হবে ককপিটের দিকে, নিজেদের হাতে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে হবে।

৭ অক্টোবর আমি হাজির হয়েছিলাম ইজরায়েলকে বাঁচানোর লড়াইয়ে। আর ২৭ অক্টোবর দেশে ফিরছি আরও একটি লড়াই লড়তে—যে দেশটিকে বাঁচাতে চাই, সেটি কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্তের লড়াই।

লড়ব, না উড়ব? আমি দুটোই বেছে নিচ্ছি।

(ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের ভাবানুবাদ)