মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-র কয়েক জন কর্মী ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়েছেন। তবে এর প্রভাব আদালতের তদন্তের কাজে পড়েনি। গাজা যুদ্ধাপরাধ-সহ বিভিন্ন মামলায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামিম খান।

চলতি মাসে আইসিসির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। ট্রাম্প প্রশাসনের বারবার আক্রমণের মুখে পড়া আদালতকে ‘বেপরোয়া’ আখ্যা দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ‘‘হয় আইসিসি তার হুমকি দেওয়া বন্ধ করবে, নয়তো আমরাই আইসিসির অবসান ঘটাব।’’

নতুন প্রধান প্রসিকিউটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত প্রসিকিউটরের দপ্তরের দায়িত্ব যৌথ ভাবে সামলাচ্ছেন নাজহাত শামিম খান। তাঁর দাবি, মার্কিন চাপ সত্ত্বেও আদালতের কাজের গতি কমেনি।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে গাজা যুদ্ধের তদন্ত-সহ বিভিন্ন মামলায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে আদালতের নির্দেশে প্রসিকিউটরের দপ্তরের পরবর্তী আবেদনগুলি গোপন রাখা হচ্ছে।

খানের কথায়, আদালতের কয়েক জন কর্মী ইতিমধ্যেই ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পেতে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অথচ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত তারিখ ৯ অক্টোবরের ছ’মাস পরে। তাঁর ব্যাখ্যা, নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত পরিধি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে ব্যাঙ্কগুলি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কড়াকড়ি করছে।

দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিজির এই ডেপুটি প্রসিকিউটর বলেন, ‘‘নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আদালতের উপর আরোপ করা হয়েছে। নীতিগত ভাবে আমাদের কর্মীদের ব্যক্তিগত স্তরে সরাসরি প্রভাবিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে শুনছি, তাঁদের কয়েক জন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন।’’

মার্কিন প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে নিজেদের পরিকাঠামোতেও বদল আনছে আইসিসি। মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে ইউরোপীয় বিকল্প ব্যবহার শুরু করেছে আদালত। ব্যাঙ্কিং পরিষেবা এবং স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা নিয়েও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সঙ্গে আলোচনা চলছে।

খান জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে তদন্তের পরিধি বা কাজের সক্ষমতা কমানোর কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের সব তদন্তই চলছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে কাজের সক্ষমতা বা কাজের পরিমাণ কমানোর কোনও সিদ্ধান্ত আমরা নিইনি।’’

তবে নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিক ভাবে কার্যকর হলে তার পূর্ণ প্রভাব কী হবে, তা এখনই অনুমান করা সম্ভব নয় বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।

এ বার নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য গোটা আদালত। তবে এর আগেও মার্কিন পদক্ষেপের মুখে পড়েছেন আইসিসির কর্মকর্তারা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের ১৩ জন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল ওয়াশিংটন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন খানও। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সামলানোর অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘‘ক্রেডিট কার্ড ছাড়া জীবন বেশ অসুবিধাজনক। বিশ্বজুড়ে কত কাজ যে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া করা যায় না, বিশেষ করে ভ্রমণের ক্ষেত্রে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।’’

তবে শরণার্থী শিবির কিংবা গণনৃশংসতার ঘটনাস্থলে গেলে নিজের এই অসুবিধাকে অন্য ভাবে দেখতে পারেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘‘আমরা নির্যাতিত মানুষগুলির মুখ দেখি। তাঁদের কাছে নিষেধাজ্ঞা বা ক্রেডিট কার্ডের কোনও প্রাসঙ্গিকতাই নেই। তাঁরা শুধু ন্যায়বিচার চান।’’

আইসিসির কাজে চাপ তৈরি হওয়ার একমাত্র কারণ অবশ্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নয়। আদালতের প্রাক্তন প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ নিয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। ব্রিটিশ এই আইনজ্ঞ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নাজহাত শামিম খানের সঙ্গে তাঁর কোনও পারিবারিক সম্পর্ক নেই। চলতি বছরের জুলাইয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলির ভোটাভুটির পর করিম খানকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের শেষ দিকের পর থেকে গাজা যুদ্ধ নিয়ে নতুন কোনও অভিযোগ প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। কেন তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তেমন তথ্য সামনে আসছে না, তার ব্যাখ্যায় খান জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশেই ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংক্রান্ত তদন্তের তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে। চলতি বছরের গোড়ায় আদালত নির্দেশ দেয়, বিচারকেরা অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত অভিযোগ এবং গ্রেফতারি পরোয়ানার আবেদন প্রকাশ করা যাবে না।

খানের কথায়, ‘‘তদন্ত এমন পর্যায়ে পৌঁছলেও, যখন পরবর্তী পদক্ষেপ প্রায় আসন্ন, আমরা তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতে পারি না। ফলে বাইরে থেকে মনে হতে পারে, কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু আমি আশ্বস্ত করতে পারি, ওই তদন্তে এবং অন্য তদন্তগুলিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে।’’

নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় রুবিয়ো আইসিসিকে ছ’মাস সময় দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই সময়ের মধ্যে আলোচনা করে মার্কিন উদ্বেগের সমাধান খুঁজতে হবে। কিন্তু ঠিক কী করলে ট্রাম্প প্রশাসন সন্তুষ্ট হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দীর্ঘদিন ধরেই আইসিসির প্রতি বৈরী মনোভাব দেখিয়ে এসেছে এই প্রশাসন।

চলতি মাসে কোনও প্রমাণ না দিয়েই রুবিয়ো দাবি করেন, সমুদ্রের ওপারে বসে থাকা বিশ্বায়নপন্থী ‘বিশেষজ্ঞরা’ চান, আইসিসি যেন মার্কিন নাগরিকদের বিচার করে। তবে খান জানিয়েছেন, রুবিয়ো ঠিক কাদের কথা বলছেন বা তাঁর বক্তব্যের অর্থ কী, তা স্পষ্ট নয়।

তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তাঁদের মধ্যে হয়তো এই ভুল ধারণা রয়েছে যে আমরা মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু আমরা কোনও মার্কিন নাগরিককে আদালতে হাজির করিনি।’’

আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে খান আরও বলেন, সেখানে তদন্তের অগ্রাধিকার হল তালিবান এবং ইসলামিক স্টেট খোরাসানের হাতে সংঘটিত অপরাধ। বিশেষ করে নারী, কিশোরী এবং অন্যান্য বিপন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধগুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চলতি মাসেই লিঙ্গের ভিত্তিতে নিপীড়নের অভিযোগে তালিবান সদস্যদের বিরুদ্ধে চারটি গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রকাশ্যে এনেছে আইসিসির প্রাক্‌-বিচার বিভাগ।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা এবং অন্য উপায়ে আদালতকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছেন আইসিসির রেজিস্ট্রার। আদালতের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন মহলও। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট চিন্তার স্বাধীনতার জন্য প্রদত্ত সাখারভ পুরস্কার দিয়েছে আইসিসি এবং তার কর্মকর্তাদের।

খানের মতে, এই স্বীকৃতি আদালতের কর্মীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, ‘‘এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা, যা আদালতের কর্মীদের শোনা প্রয়োজন।’’ একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ আদালতের ব্যয় নির্বাহে অর্থসাহায্য চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুতি।

খানের বক্তব্য, ‘‘আমাদের ঘিরে এত মনোযোগই বুঝিয়ে দেয়, আমরা কতটা প্রাসঙ্গিক। এই আদালত সেই সব নির্যাতিত মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ খুলে দেয়, যাঁদের যাওয়ার আর কোনও জায়গা নেই। তাঁরা রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের কথা শোনাতে চান।’’