বাংলাস্ফিয়ার: তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির কর্মীদের গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বাধা এবং বিদেশি পেশাদারদের সম্পর্কে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাল ভারত। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর বিদেশ মন্ত্রক বলেছে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য পূরণে সহায়ক নয়। ভ্যান্সের ব্যবহৃত ভাষাকেও ‘গভীর অপমানজনক’ বলে চিহ্নিত করেছে নয়াদিল্লি। ভারতীয় পেশাদারদের অবদান উপেক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রক।

বিতর্কের সূত্রপাত আটটি বড় প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা সংস্থার ক্ষেত্রে পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা ‘পার্ম’ কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তে। তালিকায় রয়েছে টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস, উইপ্রো, এইচসিএল, কগনিজ্যান্ট, ক্যাপজেমিনি, মাইক্রোসফট এবং অ্যাডোবি। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রশাসন জানায়, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির নতুন আবেদন নেওয়া হবে না; ইতিমধ্যে জমা পড়া আবেদনগুলির প্রক্রিয়াকরণও বন্ধ থাকবে।

এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ভ্যান্স অভিযোগ করেন, কিছু সংস্থা মার্কিন কর্মীদের সরিয়ে বিদেশিদের নিয়োগ করছে। মাইক্রোসফটকে নিশানা করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলির উচিত আমেরিকার দক্ষ কর্মীদের চাকরি দেওয়া। বিদেশি কর্মীদের বোঝাতে তিনি ‘ফরেন ইন্ডেনচার্ড সার্ভেন্টস’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন, যার অর্থ চুক্তির বাঁধনে আবদ্ধ বিদেশি শ্রমিক। এই শব্দচয়নেই বিশেষ আপত্তি জানিয়েছে ভারত।

বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, এমন বর্ণনা অযৌক্তিক এবং ভারতীয় পেশাদারদের শিক্ষা, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক অবদানকে অস্বীকার করে। আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয়রা সে দেশের অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনের পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মন্ত্রক মনে করিয়ে দিয়েছে, বহু প্রজন্মের অভিবাসীর শ্রম, উদ্যোগ ও উদ্ভাবন আমেরিকার উন্নতি এবং সমৃদ্ধিকে গড়ে তুলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিক শোষণের বেদনাদায়ক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত পরিভাষার ব্যবহার অত্যন্ত অপমানজনক।

‘পার্ম’ আসলে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে বিদেশি কর্মীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার বহু আবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই ব্যবস্থায় মার্কিন শ্রম দফতর যাচাই করে, সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য ও ইচ্ছুক মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে কি না। বিদেশিকে নিয়োগ করলে একই ধরনের কাজে নিযুক্ত মার্কিন কর্মীদের মজুরি কিংবা কাজের পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও বিবেচিত হয়।

তবে ভারতীয় কর্মীদের উদ্বেগের মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক একটি পার্থক্য স্পষ্ট করেছে। ‘পার্ম’ এবং এইচ-১বি ভিসা এক ব্যবস্থা নয়। ফলে ‘পার্ম’-এর আবেদন স্থগিত হওয়ার অর্থ, চালু এইচ-১বি ভিসা নিজে থেকেই বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। ভিসাধারী কিংবা তাঁর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের বর্তমান অবস্থানও শুধু এই সিদ্ধান্তের কারণে অবৈধ হয়ে যাচ্ছে না। যদিও সংশ্লিষ্ট সংস্থার যোগ্য কর্মীদের গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

স্থগিতাদেশ দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মীদের ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ নিয়োগের পরিকল্পনা করা সংস্থাগুলির পক্ষে আরও কঠিন হতে পারে। কর্মীদের কাছেও প্রশ্ন থাকবে, আমেরিকায় দীর্ঘমেয়াদি জীবন গড়ার যে পরিকল্পনা তাঁরা করেছেন, তার ভবিষ্যৎ কী। অনিশ্চয়তা বাড়বে পরিবারগুলির মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই।

নয়াদিল্লির যুক্তি, দক্ষ পেশাদারদের যাতায়াত দুই অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করে। এতে ভারতীয়দের সামনে কাজের সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলি উন্নত দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিযোগিতার সুবিধা পায়। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শেয়ারহোল্ডারদের সম্পদ বৃদ্ধিতেও এই কর্মীরা ভূমিকা রাখেন। তাই বিষয়টিকে পারস্পরিক লাভের ক্ষেত্র হিসেবেই দেখার আহ্বান জানিয়েছে ভারত। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এই বাস্তবতা স্বীকার করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে বিদেশ মন্ত্রক।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন কর্মসূচির অপব্যবহার এবং দেশীয় কর্মীদের সুযোগ কমে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এনেছে। মাইক্রোসফট সেই অভিযোগের জবাবে জানিয়েছে, তাদের অধিকাংশ এইচ-১বি আবেদন নতুন নিয়োগের জন্য নয়, বর্তমান কর্মীদের জন্য। ফলে প্রশাসনের অভিযোগ এবং সংস্থার ব্যাখ্যার মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ভারতের তরফে জানানো হয়েছে, বিষয়টির পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর রাখা হবে। আপাতত উদ্বেগের কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের ভবিষ্যৎ।