হাইলাইটস:

  • সহকর্মী এমইপির ‘নিজের দেশে ফিরে যান’ মন্তব্যের বিরুদ্ধে সুইডেনে পুলিশে অভিযোগ।
  • অভিবাসনবিরোধী স্লোগান ঘিরে উত্তপ্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, উঠল বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ।
  • ঘটনার তদন্তে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট; শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি রিনিউ ইউরোপ গোষ্ঠীর।

অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। এক সহকর্মী এমইপির “নিজের দেশে ফিরে যান” মন্তব্যকে বর্ণবিদ্বেষমূলক ও ঘৃণাত্মক আখ্যা দিয়ে সুইডেনের পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন সুইডিশ এমইপি আবির আল-সাহলানি। ঘটনাটি ঘিরে ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

কীভাবে শুরু বিতর্ক?

ঘটনার সূত্রপাত গত মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব পাস হওয়ার পর।

ভোটাভুটির ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন উগ্র ডানপন্থী এমইপি পার্লামেন্ট কক্ষে সমস্বরে “ওদের ফিরিয়ে দাও” (Send them back) স্লোগান দিতে শুরু করেন। সেই স্লোগানকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত।

‘আমি নিজেকে কখনও এতটা অনিরাপদ অনুভব করিনি’

ইরাকে জন্মগ্রহণকারী এবং বর্তমানে সুইডেনের সেন্টার পার্টির এমইপি আবির আল-সাহলানি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ওই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান।

তিনি বলেন,

“আমি এই পার্লামেন্টে নিজেকে কখনও এতটা অনিরাপদ অনুভব করিনি। ওদের স্লোগান কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ছিল না; বরং তাদের বিরুদ্ধে ছিল, যারা শুধু ইউরোপে একটি ভালো জীবনের খোঁজে এসেছে।”

তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন বিতর্কের জন্ম হয়।

‘নিজের দেশে ফিরে যান’

সামাজিক মাধ্যমে আল-সাহলানির ভিডিওর নীচে ফিনল্যান্ডের ফিনস পার্টির এমইপি সেবাস্টিয়ান টিনকিনেন মন্তব্য করেন, “আরও কাঁদুন।”

অন্যদিকে ডেনমার্কের ডেনমার্ক ডেমোক্র্যাটস-এর এমইপি ক্রিস্টোফার স্টর্ম লেখেন,

“আপনার নিজের দেশে ফিরে যাওয়া উচিত।”

এই মন্তব্যকেই বর্ণবিদ্বেষমূলক ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করে স্টর্মের বিরুদ্ধে সুইডিশ পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন আল-সাহলানি।

অভিযুক্তদের পাল্টা দাবি

অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন দুই এমইপিই।

স্টর্মের দাবি, তাঁর মন্তব্য কোনওভাবেই বর্ণবিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্যে করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, আল-সাহলানি যদি পার্লামেন্টের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে এতটাই অসন্তুষ্ট হন, তাহলে তাঁর উচিত ছিল কিছুটা সময় নিয়ে বিষয়টি শান্তভাবে ভাবা।

অন্যদিকে টিনকিনেনও ই-মেলের মাধ্যমে জানান, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ “সম্পূর্ণ মিথ্যা” এবং তিনি পাল্টা আইনি পদক্ষেপের কথাও বিবেচনা করছেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বাড়ছে মেরুকরণ

এই ঘটনা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক বিভাজনকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

বর্তমানে পার্লামেন্টের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সদস্য উগ্র ডানপন্থী বা ডানপন্থী জনতাবাদী রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব এখনও তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

শাস্তির দাবি

আল-সাহলানির রাজনৈতিক গোষ্ঠী রিনিউ ইউরোপ প্রকাশ্যে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে।

গোষ্ঠীর নেত্রী ভালেরি আয়ের বলেন,

“আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলিতে বর্ণবিদ্বেষের কোনও স্থান নেই। যারা এটি ছড়ায়, তাদের অবশ্যই তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।”

তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি রবার্টা মেতসোলার কাছে চিঠি লিখে স্টর্ম ও টিনকিনেনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

মেতসোলার কড়া বার্তা

মেতসোলার দফতর জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সোমবার পার্লামেন্টে তিনি বলেন,

“আক্রমণাত্মক স্লোগান, বিদ্রূপ, সদস্যদের লক্ষ্য করে আঙুল তোলা কিংবা ভিডিও করা—এসব কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি সীমারেখা রয়েছে, আর সেটি অতিক্রম করা হয়েছে।”

তিনি স্পষ্ট জানান, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘নীরব থাকিনি’

আল-সাহলানি জানান, প্রথমে তিনি প্রতিবাদ করবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন।

তাঁর কথায়,

“আমার মতো গায়ের রঙের মানুষ ওই কক্ষে খুব বেশি নেই। আমি ভেবেছিলাম, যদি আমি কথা বলি, ওরা আমাকে কী বলবে?”

তবু শেষ পর্যন্ত তিনি নীরব থাকেননি।

তাঁর মতে,

“সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করা শুরু হলে, সেটাই আরও ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। তাই এই ঘটনার বিরুদ্ধে কথা বলা শুধু আমার নয়, পুরো ইউরোপের দায়িত্ব।”

উল্লেখ্য, যে অভিবাসন আইনকে ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত, সেটিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতিমধ্যেই “অযৌক্তিক, নিষ্ঠুর ও বৈষম্যমূলক” বলে সমালোচনা করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের একাধিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞও আইনটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।