ইউরোপজুড়ে পড়া পথবিক্ষোভ শনিবার জার্মানিতেও পৌঁছবে এবং ফ্রান্সে নতুন করে জোরদার হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আয়োজকেরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আশা করছেন। তবে সেই কর্মসূচির আশপাশে সম্ভাব্য লুটপাট ও দাঙ্গা ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ছাত্রবিক্ষোভে কেঁপে উঠেছে ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, আলবেনিয়া ও ফ্রান্স। কোথাও কোথাও সেই বিক্ষোভ হিংসাত্মকও হয়েছে। ফ্রান্সে হ্যালোউইন উপলক্ষে আন্দোলনকারীরা আবার দেশজুড়ে পথে নেমে জীবনযাত্রার বাড়তে থাকা খরচ এবং অপর্যাপ্ত জনপরিষেবার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের ডাক দিয়েছেন।
জার্মানিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর একটি শিথিল জোট, ‘জেন জেড রেগেল্ট’—যার অর্থ মোটামুটি ‘জেন জেডই সামলাচ্ছে’—৩০টিরও বেশি শহরে সমর্থকদের পথে নামার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, স্কুলশিক্ষা, জলবায়ু সুরক্ষা ও আবাসন খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা ফিরিয়ে আনার যে কোনও পরিকল্পনারও বিরোধিতা করছে তারা।
ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউ-র সংসদীয় দলের সদস্য আলেকজান্ডার থ্রোম বাণিজ্যবিষয়ক সংবাদপত্র ‘হান্ডেলসব্লাট’-এ লিখেছেন, “ফ্রান্সে যে ধরনের দৃশ্য দেখা গিয়েছে, যে কোনও মূল্যে তা ঠেকাতে হবে।”
কিন্তু বিরোধী গ্রিন পার্টির সহনেতা ফেলিক্স বানাশাক আগেভাগেই গোটা যুববিক্ষোভকে সন্দেহের চোখে দেখার চেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
আরএনডি সংবাদগোষ্ঠীকে তিনি বলেন, “সিডিইউ যে ভাষা ব্যবহার করছে, তাতে এই বিক্ষোভগুলিকে আগাম অপরাধমূলক বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এগুলিকে লুটপাটকারী দলের কাজ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এমন বক্তব্য মানুষকে আরও উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।”
বার্লিনের পুলিশপ্রধান বারবারা স্লোভিক মাইসেল জানিয়েছেন, রাজধানীতে অতিরিক্ত ১,৫০০ পুলিশকর্মী মোতায়েন করবেন তিনি। যদিও মানুষ বা সম্পত্তির ওপর হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করার বিশেষ কারণ তাঁর কাছে নেই।
তিনি বলেন, “পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত লুটপাট চালানোর প্রস্তুতি হচ্ছে, এমন কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমাদের কাছে নেই।”
শনিবার বিকেলে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে প্রায় ১০ হাজার বিক্ষোভকারীর জমায়েত হওয়ার কথা। তাঁদের অধিকাংশই স্কুলপড়ুয়া, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং তাঁদের অভিভাবক। সন্ধ্যার গোড়ায় মিটে এলাকায় আরও একটি ছোট জমায়েতের পরিকল্পনা রয়েছে।
কোলোন, মিউনিখ, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও হামবুর্গেও বড় সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।
‘জেন জেড রেগেল্ট’-এর উদ্যোক্তারা সমাজমাধ্যম ও নিজেদের ওয়েবসাইটে অংশগ্রহণকারীদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, “আমাদের প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণ—এর কোনও ব্যতিক্রম নেই। আমরা যে সমস্ত আদর্শে বিশ্বাস করি, হিংসা তার সব কিছুর বিরোধী। একমাত্র শান্তিপূর্ণ পথেই আমরা একসঙ্গে কিছু অর্জন করতে পারি।”
শুক্রবারের মধ্যে এক লক্ষ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ ওয়েবসাইটে নাম নথিভুক্ত করে জানিয়েছেন, তাঁরা বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
তবে স্কুলপড়ুয়াদের স্বার্থে রাজনৈতিক স্তরে দাবি জানানো সংগঠন ‘ফেডারেল পিউপিলস কনফারেন্স’ শনিবারের বিক্ষোভ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। তাদের বক্তব্য, এই উদ্যোগের সাংগঠনিক কাঠামো “অস্পষ্ট” হওয়ায় কর্মসূচিগুলি কীভাবে এগোবে, তা অনুমান করা কঠিন।
জার্মানির স্কুলশিক্ষার ফলাফলে উল্লেখযোগ্য অবনতির বিষয়টিকে সামনে রেখে সংগঠনটি ২০ নভেম্বর বার্লিনে আলাদা বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছে। তাতে শিক্ষক এবং অন্য যুব আন্দোলনের কর্মীরাও যোগ দেবেন।
এদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ বলেছেন, শনিবার “অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ” দিন হয়ে উঠতে পারে। নতুন দফার বিক্ষোভকে ঘিরে হিংসা দমন করতে বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনী-সহ ৭০ হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নুনেজ বলেন, উগ্র গোষ্ঠীগুলি সমাজমাধ্যমে হ্যালোউইন উপলক্ষে হিংসাত্মক জমায়েতের ডাক দিয়েছে। তাঁর মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মূল বিক্ষোভগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার পরেই জনশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় বিপদ দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, “আমরা দেখছি, শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন অংশ, উগ্র হয়ে ওঠা অতিবাম গোষ্ঠী এবং ‘জিলে জোন’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের কিছু উগ্র অংশ ফ্রান্সের বহু শহরে রাত আটটা থেকে রাস্তায় জমায়েত হওয়ার জন্য একাধিক আহ্বান জানাচ্ছে।”
নুনেজের বক্তব্য, এই আহ্বানগুলির সঙ্গে “বেশ কিছু অত্যন্ত উগ্র বার্তা” ছড়ানো হচ্ছে। তার মধ্যে কয়েকটিতে “বিপ্লব”-এরও ডাক দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, কোনও ধরনের বাড়াবাড়ি কর্তৃপক্ষ “একেবারেই বরদাস্ত করবে না” এবং নিরাপত্তা বাহিনী “অত্যন্ত কঠোর” ব্যবস্থা নেবে।
দোকানপাট রক্ষায় আগের সপ্তাহান্তে যে ব্যবস্থাগুলি নেওয়া হয়েছিল, সেগুলি আরও জোরদার করা হবে বলে নুনেজ জানিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হলেও অধিকাংশ কর্মসূচি “শহরের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে”, করতে দেওয়া হবে না।
প্যারিসে কী ঘটবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শ্রমিক সংগঠন এবং হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের ডাকা দু’টি পৃথক মিছিলের শহরের কেন্দ্রস্থল দিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তার বদলে শহরের দক্ষিণ-পূর্বের একেবারে প্রান্তে একটি মিছিলের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। কেন্দ্রস্থল থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন উভয় পক্ষের আয়োজকেরাই।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, গত শনিবার চার লক্ষ ১০ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। সে দিন বিপুল পুলিশি উপস্থিতির কারণে ১৭ অক্টোবরের প্রথম দফার গণবিক্ষোভের সময় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক হিংসা ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি অনেকটাই ঠেকানো গিয়েছিল।
কম মজুরি, জীবনযাত্রার খরচ এবং জনপরিষেবার অবনতির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শ্রমিক সংগঠন ও হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও। তাঁদের দাবি, পড়াশোনার পরিবেশ ও পরিকাঠামোর উন্নতি করতে হবে। আগামী ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
পড়ুয়াদের দাবি মেটাতে সরকার কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সমস্যায় জর্জরিত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থা বদলানো এবং স্কুল সংস্কারের জন্য স্থানীয় প্রশাসনগুলিকে ঋণ দেওয়া। কিন্তু ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, এই পদক্ষেপগুলি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।