মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও এ বছর দ্বিতীয়বার ভারত সফরে এলে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে মূলত উঠে এসেছিল দু’টি প্রশ্ন—তিনি কার সঙ্গে দেখা করলেন, আর কোথায় কোথায় গেলেন।
গত সপ্তাহের সফরে রুবিও নয়াদিল্লি এড়িয়ে গেলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করলেন না। তার বদলে গেলেন দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বইয়ে। সেখানে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর ও শিল্পমহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। একই ভাবে নজর কেড়েছিল গুজরাতের জামনগর সফরও। সেখানেই রয়েছে রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজের সুবিশাল তেল শোধনাগার।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে ভারত ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপড়েন বেড়েছে। বিশেষ করে শুল্কনীতি এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও, বিদেশসচিব হিসেবে প্রথম ভারত সফরের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় রুবিওর ফের এ দেশে আসা বুঝিয়ে দেয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে ভারতের গুরুত্ব এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক মিলন বৈষ্ণব গত এক দশক ধরে বিশ্বে ভারতের অবস্থান, বিশেষত আমেরিকার সঙ্গে তার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনকে বৈষ্ণব বর্ণনা করেছেন ‘লাগামহীন’ বলে। তাঁর মতে, এই প্রশাসন ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
আমাকে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করা যেন মাইন পাতা জমির উপর দিয়ে হাঁটা। আন্তর্জাতিক জোটের প্রতি হোয়াইট হাউসের লেনদেনসর্বস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে এমন নির্বাচন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে কোনও পূর্বাভাসের উপরই আর পুরোপুরি ভরসা করা যাচ্ছে না।
বৈষ্ণবের কথায়, “আমার মনে হয়, কেউ যদি আপনাকে বলেন যে ঠিক কী ঘটছে এবং তাঁর সাজানো-গোছানো বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে তার প্রতিটি অংশ কী ভাবে মিলে যাচ্ছে, সবটাই তিনি জানেন, তা হলে তিনি আপনাকে মিথ্যা বলছেন।”
ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের এই ধোঁয়াশা নিয়েই তাঁর সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছিল। উঠে এসেছিল দুই দেশের মধ্যে বৈরিতাপূর্ণ রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধ, পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং রুবিওর সাম্প্রতিক সফরের প্রসঙ্গও।
ছবির পরিচিতি: গত বুধবার মুম্বইয়ের তাজ মহল প্যালেস হোটেলে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন মার্কো রুবিও। ছবি: কাইলি কুপার/রয়টার্স।
ট্রাম্পের চোখে সবই লেনদেন
রুবিওর সফরের আগে বেশ কয়েক জন ভাষ্যকার মার্কিন বিদেশসচিবের ‘অস্বাভাবিক’ সফরসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দিল্লি বাদ দিয়ে মুম্বই ও জামনগরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, বৈষ্ণবের মতে তা কিছুটা অতিরঞ্জিত। তিনি বলেন, “প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকই যে কোনও দেশের রাজধানীতে হতে হবে, এমন কোনও কথা নেই।”
তবে তার অর্থ এই নয় যে সফরের গন্তব্যগুলি গুরুত্বহীন। বৈষ্ণবের কথায়, “আমার অবশ্যই মনে হয়, জায়গাগুলি বেছে নেওয়া হয়েছে সচেতন ভাবেই। এই প্রশাসন, বিশেষ করে এই প্রেসিডেন্ট, বিদেশনীতি দেখেন ‘চুক্তি আদায়’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে। আর ব্যবসায়িক চুক্তি জোগাড় করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তা হলে মুম্বইয়ের চেয়ে ভাল গন্তব্য আর কী হতে পারে?”
জামনগর সফরেরও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। সেখানে রিলায়্যান্সের চেয়ারম্যান মুকেশ অম্বানির সঙ্গে দেখা করেন রুবিও। বৈষ্ণব বলেন, “আমেরিকায় এখন পেট্রলের দাম অত্যন্ত চড়া। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও তা একটি বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন দেখাতে চাইছে, দাম কমাতে যা যা করা সম্ভব, তার সবই তারা করছে। ভারত বিপুল পরিমাণ তেলের ক্রেতা, কিন্তু একই সঙ্গে পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যেরও বড় রফতানিকারক।”
তিনি আরও বলেন, “রুবিওর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, রিলায়্যান্সকে এবং সেই সূত্রে ভারতকে ভেনেজুয়েলার আরও বেশি অপরিশোধিত তেল শোধন করতে উৎসাহিত করা।”
সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি ভারতের সামনে একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু তেমনটা হবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান যে ঘন ঘন বদলায়, তা এখন আর নতুন কোনও বিষয় নয়।
বৈষ্ণব বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মোড় ছিল, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পরে ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তানকে বুকে টেনে নেওয়া।” বছরের পর বছর ধরে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের গুরুত্ব কমছিল, বিশেষ করে জো বাইডেনের আমলে। পাকিস্তানের তৎকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে বাইডেনের যোগাযোগের অভাবও সেই দূরত্বের ইঙ্গিত দিয়েছিল। বৈষ্ণবের কথায়, “কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত বহু নীতিনির্ধারক পাকিস্তানের দ্বিচারিতায় বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন—এক দিকে সহযোগিতার ভাষায় কথা বলা, অন্য দিকে মার্কিন স্বার্থের ক্ষতি করা।”
কিন্তু দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করতে সাহায্য করার জন্য। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে এমন এক বোমা হামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল, যাতে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। ভারতের সঙ্গে মে মাসের সংঘাতের পরে পাকিস্তানের গুরুত্ব ফের বাড়তে শুরু করে। সেই সংঘাত থামানোর কৃতিত্বও দাবি করেন ট্রাম্প। জুন মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান তিনি। তার আগে মুনির ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বৈষ্ণব বলেন, “এই উলটপুরাণের পিছনে আমি কয়েকটি কারণ দেখি: দাপুটে শাসকদের প্রতি ট্রাম্পের সুপরিচিত ঈর্ষামিশ্রিত আকর্ষণ, পাকিস্তানের চতুর কূটনীতি এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সদস্যদের জড়িয়ে জ্বালানি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত চুক্তির সম্ভাবনা।”
তাঁর মতে, চুক্তি, লেনদেন এবং তাৎক্ষণিক সাফল্যকে ট্রাম্প কতখানি গুরুত্ব দেন, এটি তার আরও একটি দৃষ্টান্ত। তিনি যোগ করেন, “নয়াদিল্লির কাছে এর অর্থ হল, ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সখ্য কিংবা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ২৫ বছরের বিনিয়োগ—কোনওটিই মার্কিন নীতির সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে যাওয়ার বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা দেয় না।”
সম্প্রতি একটি লেখায় বৈষ্ণবের সহকর্মী সমীর লালওয়ানি দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক বাক্যুদ্ধ শুনে যতটা মনে হয়, ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক আসলে তার চেয়ে বেশি ধাক্কা সামলাতে সক্ষম। নীরবে হলেও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হচ্ছে।
লালওয়ানি যেমন উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালে ভারত ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সর্বকালীন সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলি প্রায় ৬,৮০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ বছর দুই দেশ রেকর্ড সংখ্যক যৌথ সামরিক মহড়াও চালিয়েছে।
আগামীর পথ কতটা মসৃণ?
এই সাফল্য সত্ত্বেও ভবিষ্যতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে “অন্তত তিনটি কারণে সতর্ক থাকা দরকার”, বলছেন বৈষ্ণব।
প্রথমত, একের পর এক মার্কিন পদক্ষেপ ভারতের স্বার্থে আঘাত করেছে। ২০২৫ সালে ভারতের উপর শাস্তিমূলক ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প। এ বছরের গোড়ায় তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে বটে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যচুক্তি এখনও হয়নি।
দ্বিতীয়ত, অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে এইচ-১বি ভিসা ও গ্রিন কার্ড নিয়ে হোয়াইট হাউসের বিধিনিষেধের অভিঘাত তুলনামূলক ভাবে বেশি পড়েছে সিলিকন ভ্যালির ভারতীয় কর্মীদের উপর।
বৈষ্ণব বলেন, “এর ফলে ভারতের দিকে আস্থার একটি প্রকৃত ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এবং তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে।” চলতি মাসের গোড়াতেই সেই অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছিল, যখন ভারতীয় পেশাজীবীদের সম্পর্কে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যকে নয়াদিল্লি ‘অত্যন্ত অপমানজনক’ বলে অভিহিত করে।
বৈষ্ণব আরও মনে করিয়ে দেন, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলি বড় বড় ঘোষণা করতে পারদর্শী হতে পারে, কিন্তু ঘোষণা হলেই যে তা বাস্তবায়িত হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
তাঁর শেষ সতর্কবার্তা, রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন উদ্যোগের উৎসাহে ভাটা ফেলতে পারে। বাণিজ্য আলোচনা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। জানুয়ারিতে মার্কিন বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লাটনিক দাবি করেছিলেন, মোদি ট্রাম্পকে ফোন করেননি বলেই বাণিজ্যচুক্তি হয়নি। নয়াদিল্লি এই ব্যাখ্যা মানেনি।
বৈষ্ণব বলেন, “এখন আমরা যে অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি, তার অনেকটাই বহু বছর আগে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল। চালু প্রকল্পগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এক কথা। কিন্তু সম্পর্কের অস্থিরতা নতুন উদ্যোগ নেওয়াকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।”
বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ভারত যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তা হলে সাফল্যের পথটি বৈষ্ণবের কাছে স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগটি রাজনৈতিক—ভারত যাতে একটি সবল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র হিসেবে টিকে থাকে, তা নিশ্চিত করা।”
তাঁর সংযোজন, “অর্থনীতির ক্ষেত্রে ভারত ভৌত ও ডিজিটাল পরিকাঠামোয় বিপুল নতুন বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সরকার সংস্কারের উদ্যোগ আরও জোরদার না করলে সেই বিনিয়োগের সুফল সীমিতই থেকে যাবে। দরকার আরও দক্ষ বিরোধ নিষ্পত্তি, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, পক্ষপাতহীন ভাবে কর আইন প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক বিধিব্যবস্থায় নিশ্চয়তা।”
শেষ পর্যন্ত, কোনও পক্ষেরই অন্য পক্ষকে অপ্রয়োজনীয় বলে সরিয়ে রাখার সামর্থ্য নেই। বিশ্বরাজনীতির এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের কৌশলগত ভিত কতটা অটুট থাকে, এখন পরীক্ষা তারই।