লুলার কাছে পরাজয়ের পর ফ্লাভিও বলসোনারো আমেরিকায় পালিয়ে গিয়েছেন বলে দাবি একাধিক সংবাদমাধ্যমের। পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা পেরোলেও হাজির হননি কট্টর দক্ষিণপন্থী সেনেটর। পরিবারের ঘনিষ্ঠদের দাবি, আমেরিকায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন তিনি।

রবিবার রিও ডি জেনেইরোয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ছবি: লুকাস নেভেস/নুরফোটো/শাটারস্টক।

রবিবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজয়ের পর কট্টর দক্ষিণপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিল ছেড়ে আমেরিকায় পালিয়ে গিয়েছেন বলে দাবি করেছে একাধিক সংবাদমাধ্যম। এই খবরের তীব্র নিন্দা করেছেন লুলা। ঘটনাটিকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েক জনকে উদ্ধৃত করে সংবাদ ওয়েবসাইট মেত্রোপোলেস জানিয়েছে, আমেরিকার পথে রওনা হয়েছেন ফ্লাভিও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিমানটি আকাশে রয়েছে।’ তবে সেটি কোথা থেকে উড়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি।

ফ্লাভিওর সহযোগীদের দাবি, মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর ফ্লোরিডায় পৌঁছনোর কথা। সেখানে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। মেত্রোপোলেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে।

ফ্লাভিওর দেশত্যাগের খবর সামনে আসতেই তাঁকে আক্রমণ করেছেন লুলা। ব্রাসিলিয়ায় নিজের ৮১তম জন্মদিন উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বলসোনারো পরিবার এমনই। ব্রাজিল ওদের দ্বিতীয় স্বদেশ। ওদের প্রথম স্বদেশ আমেরিকা, যার পদলেহনে ও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।”

লুলার আরও বক্তব্য, “আমি শুধু ভাবছি, সদ্য নির্বাচনে হেরে নিজের দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া একজন মানুষের বিবেকে কী চলছে… যার কোনও অপরাধ নেই, তার ভয়ও নেই। যে নাগরিক চুপিসারে নিজের দেশ ছেড়ে পালায়, তার নিশ্চয়ই কিছু দায় আছে। ব্রাজিল ছেড়ে চলে যাওয়ার এই কাজ লজ্জাজনক।”

বলসোনারোর সহযোগীরা ফোলিয়া দে সাও পাওলো সংবাদপত্রকেও জানিয়েছেন, তিনি আমেরিকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। তাঁদের দাবি, বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক আইনজীবী দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা তৈরি করেছেন এবং তা কার্যকর করার ব্যবস্থাও করেছেন। সংবাদপত্রটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিমানটির অবতরণের কথা ছিল।

সংবাদ চ্যানেল সিএনএন ব্রাজিলের দাবি, মঙ্গলবার ভোরে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকায় পালিয়েছেন ফ্লাভিও। অন্যদিকে, আমেরিকার বিদেশ দফতরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বলসোনারো ও তাঁর পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দিতে ভিসা দেওয়া হবে।

এই পরিস্থিতিতে ফ্লাভিওকে গ্রেফতারের দাবিও উঠেছে। লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির আইনপ্রণেতারা সুপ্রিম কোর্টের কাছে তাঁর গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইন্টারপোলের রেড নোটিসের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করারও অনুরোধ করেছেন তাঁরা।

সোমবারের পর থেকে ফ্লাভিওকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। মঙ্গলবার সকাল ১১টার মধ্যে ফেডারেল পুলিশের কাছে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তিনি হাজির হননি। ফলে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি সত্যিই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছে।

ব্রাজিলের সংবাদপত্র ও গ্লোবোর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার বন্ধু ও আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকের সময় ফ্লাভিওকে ‘যেন উন্মত্তের মতো দেখাচ্ছিল’। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে চলা একটি ফৌজদারি মামলার সূত্রে সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি তাঁর পাসপোর্ট বাতিলের নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার সকাল ১১টার মধ্যে নথিটি ফেডারেল পুলিশের কাছে জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি হাজির হননি।

উল্লেখযোগ্য বিষয়, ২০২৩ সাল থেকে ফ্লাভিওর ইতালীয় নাগরিকত্ব রয়েছে। তাঁর কাছে ইতালির পাসপোর্টও আছে বলে জানা গিয়েছে।

এদিকে, আর্জেন্টিনার সংবাদ ওয়েবসাইট ইনফোবে জানিয়েছে, সোমবার রাতে ফ্লাভিও সম্ভবত আর্জেন্টিনায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানকার পুয়ের্তো ইগুয়াসু থেকে একটি ব্যক্তিগত বিমানে আমেরিকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তবে শেষ পর্যন্ত বিমানটি ওড়েনি।

ফ্লাভিও এখনও লুলার কাছে পরাজয় স্বীকার করেননি। সোমবার প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় পাসপোর্ট বাতিলের প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা আমি কখনও ভাবিনি।”

ফ্লাভিওর ভাই, প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য এদুয়ার্দো বলসোনারো বর্তমানে আমেরিকায় স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন। গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে হারলে তাঁর ভাইয়ের ব্রাজিল ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।

ফোলিয়া দে সাও পাওলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ মহলের সহযোগীদের জানানো হয়েছিল যে ফ্লাভিও ইতিমধ্যেই আর্জেন্টিনায় চলে গিয়েছেন এবং সেখান থেকে আমেরিকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

তবে ব্রাজিলের নিয়মিত অভিবাসন তল্লাশিচৌকি দিয়ে ফ্লাভিওর দেশ ছাড়ার কোনও নথি পাওয়া যায়নি। তিনি আদৌ আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে নথি রয়েছে কি না জানতে দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ।

আর্জেন্টিনার টেলিভিশন চ্যানেল তোদো নোতিসিয়াসের দাবি, ফ্লাভিও সম্ভবত হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে আর্জেন্টিনায় ঢুকেছিলেন। কিন্তু তাঁর গতিবিধির খবর প্রকাশ্যে চলে আসায় ব্যক্তিগত বিমানে ওঠার পরিকল্পনা বাতিল করেন।

যে ফৌজদারি মামলার সূত্রে ফ্লাভিওকে পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছিল, তাতে বেটিং সংস্থাগুলিকে ঘিরে প্রায় ৬৮ কোটি পাউন্ড বা ৯০ কোটি ৫০ লক্ষ ডলারের অর্থ পাচার চক্রে তাঁর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে ফেডারেল পুলিশ। তবে এই তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।