ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার সম্ভাবনার কথা ট্রাম্পের। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তেলচুক্তিকে নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে জ্বালানির দাম কমানো এবং ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফেরানোর প্রশ্নে রয়ে গিয়েছে একাধিক সংশয়।

তেলভর্তি একটি জাহাজকে সামনে রেখেই এ বার ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য করে নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করার ন’মাস পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। মঙ্গলবার টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টিতে নির্বাচনী জনসভায় ট্রাম্পের দাবি, উপকূলে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাঙ্কারটিতে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল রয়েছে।

আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই তেলচুক্তিকেই নিজের বিদেশনীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, ভেনেজুয়েলা এক সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। তার পরে অদূর ভবিষ্যতে সেটি আমেরিকার সমৃদ্ধ ৫১তম অঙ্গরাজ্য হয়ে উঠলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জনসভার মঞ্চ থেকে তিনি বলেন, এমনটা হওয়া অসম্ভব নয়।

গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে রাজধানী কারাকাসে মাদুরোর বাসভবন থেকে তাঁকে আটক করে মার্কিন বাহিনী। পরে ফৌজদারি অভিযোগের বিচারের জন্য তাঁকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর ভেনেজুয়েলায় যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে, তার পিছনে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন। সেই সরকারের সঙ্গেই তেলচুক্তি করেছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েকশো কোটি ব্যারেল তেল পাওয়া যাবে।

টেক্সাসের উপকূলে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজটির দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প একে তেলের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় বলে বর্ণনা করেন। তাঁর আরও দাবি, এই তেল পেতে মার্কিন করদাতাদের কোনও অর্থ খরচ করতে হচ্ছে না। জনসভায় ওঠার কিছুক্ষণ আগেই নিজের সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, আলাস্কা থেকে ভেনেজুয়েলা পর্যন্ত জ্বালানি ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে গোটা পশ্চিম গোলার্ধকে বিশ্বের জ্বালানি রাজধানীতে পরিণত করেছেন তিনি।

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল বক্তব্য স্পষ্ট: বিদেশে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সুফল সরাসরি আমেরিকার ঘরে পৌঁছচ্ছে। ভেনেজুয়েলার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে মার্কিন নাগরিকদের জন্যও।

ভোটের আগে তেলের বাজি

এই সাফল্যের দাবি অবশ্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে চাপে রয়েছেন ট্রাম্প। আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেবেন কয়েক কোটি মার্কিন নাগরিক। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং বহু দেশের পণ্যের উপর শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্তে তাঁর জনপ্রিয়তা ধাক্কা খেয়েছে। জনমত সমীক্ষাতেও তাঁর কাজের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ বাড়িয়ে নির্বাচনের আগে প্রশাসনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তার প্রভাব পড়ে আমেরিকার পেট্রলের দামেও।

এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল এনে জ্বালানির দাম কমানোর আশ্বাসকে প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছেন ট্রাম্প। সমাজমাধ্যমে তাঁর দাবি, শীঘ্রই জ্বালানির দাম দ্রুত কমতে শুরু করবে। কিন্তু তেল সরবরাহ বাড়লেই যে সাধারণ ক্রেতাদের খরচ সঙ্গে সঙ্গে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন, পরিবহণ, পরিশোধন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও শেষ পর্যন্ত দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

তেল আছে, গণতন্ত্র কোথায়?

তেলচুক্তির পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। সমালোচকদের অভিযোগ, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য ওয়াশিংটন যথেষ্ট চাপ দেয়নি। এখনও নির্বাচন হয়নি। ফলে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের তৎপরতা যতটা দৃশ্যমান, নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ ততটা নয়।

এই বৈপরীত্যই ট্রাম্পের সাফল্যের দাবিকে ঘিরে সংশয়ের অন্যতম কারণ। একদিকে তিনি ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা বলছেন, অন্যদিকে দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নটি অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে। তেল উৎপাদন ও বাণিজ্য থেকে আয় বাড়লেও তার সুফল সাধারণ ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে পৌঁছবে কি না, তা নির্ভর করবে সম্পদের ব্যবহার, রাজস্ব বণ্টন এবং দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভবিষ্যতের উপর।

অন্য দেশ বা ভূখণ্ডকে আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত করার কথা অবশ্য এই প্রথম বলেননি ট্রাম্প। এর আগে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা ও মেক্সিকো নিয়েও এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। এ বার সেই তালিকায় ভেনেজুয়েলার নাম জুড়ে দিয়ে তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং ভূখণ্ডের মালিকানাকে একই নির্বাচনী বক্তব্যে নিয়ে এলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তবে মঙ্গলবারের মন্তব্যকে ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত করার কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল নির্বাচনী জনসভার মঞ্চে উত্থাপিত একটি সম্ভাবনার কথা।

আপাতত তাই সামনে রয়েছে দু’টি মৌলিক প্রশ্ন। ভেনেজুয়েলার তেল আমেরিকার জ্বালানির দাম কতটা কমাতে পারবে? আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, দেশটির মানুষ কবে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ভাবে সরকার বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন?