প্রায় ২ লক্ষ ৮৮ হাজার টন রুশ ডিজেল নিয়ে সাতটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এখন আমেরিকার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু এই চালানের বৈধতা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক শুরু হওয়ায়, জাহাজগুলি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার বন্দরে পণ্য খালাস করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস এই ট্যাঙ্কারগুলির গতিবিধির উপর নজর রাখছে। চলতি মাসের গোড়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে আলোচনায় চূড়ান্ত হওয়া বিতর্কিত সরবরাহ চুক্তির প্রথম ধাপ এই চালান। ওই চুক্তির মাধ্যমে রুশ তেলের উপর বছরের পর বছর ধরে বহাল নিষেধাজ্ঞার নীতি থেকে সরে এসেছে আমেরিকা।
এর আগে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, বাল্টিক সাগরের রুশ তেল টার্মিনালগুলি থেকে তিনটি ট্যাঙ্কার রওনা দিয়েছে। কিন্তু জাহাজের গতিবিধি অনুসরণকারী ওয়েবসাইট-সহ একাধিক সূত্র খতিয়ে দেখে গ্রিনপিস সাতটি ট্যাঙ্কারের সন্ধান পেয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এখনও পর্যন্ত তাদের নজরদারিতেই এই চালানগুলির সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে এসেছে।
গ্রিনপিসের ইউক্রেন-সংক্রান্ত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শন বার্নির বক্তব্য, এখন যখন ট্যাঙ্কারগুলির অবস্থান মানচিত্রে চিহ্নিত করা যাচ্ছে, তখন মার্কিন কংগ্রেস কিংবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উচিত চালানগুলি আটকে দেওয়া।
তিনি বলেন, “ইউক্রেনের বিরুদ্ধে জঘন্য যুদ্ধ চালানোর জন্য রাশিয়াকে পুরস্কৃত করার বদলে তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা জারি করা দরকার। এই চালানগুলি আটকানো সম্ভব।”
সাতটি ট্যাঙ্কারের মধ্যে ‘টরাস’ ইতিমধ্যেই আমেরিকার তুলনামূলক কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। তবে মানচিত্রটি প্রথম প্রকাশের সময় অন্য পাঁচটি ট্যাঙ্কার ছিল ব্রিটেনের কাছাকাছি। তিনটি জাহাজ তখন ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যাচ্ছিল অথবা সেখানে প্রবেশ করছিল।
এদিকে ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলের শহর দনিপ্রোতে বৃহস্পতিবার সকালে একটি জনাকীর্ণ রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রুশ ড্রোন হামলায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর। চেরনিহিভ ও ক্রেমেনচুক—আরও দুই শহরে দিনের বেলার হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রায়ত্ত রেল সংস্থা উক্রজালিজনিৎসিয়া জানিয়েছে, দনিপ্রোর প্রধান স্টেশন থেকে একটি লোকাল ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি চলার সময় জেট ইঞ্জিনচালিত একটি দ্রুতগতির ড্রোন আঘাত হানে। সকাল প্রায় ১১টা নাগাদ হামলাটি হয়। দিনের বেলায় এ ধরনের হামলা তুলনামূলক বিরল। হামলার পর প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল মৃতদেহ।
গত ৯ অক্টোবর আকস্মিকভাবে ঘোষিত এক চুক্তিতে পুতিন আমেরিকাকে ১৮ লক্ষ টন ডিজেল সরবরাহ করতে রাজি হন। প্রথম দফায় অবিলম্বে ৩ লক্ষ টন পাঠানোর কথা ছিল। এই চালান পাঠানোর সুযোগ করে দিতে ট্রাম্প প্রচলিত নিষেধাজ্ঞা থেকে ছয় মাসের ছাড় ঘোষণা করেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন এবং পশ্চিমের অন্য প্রধান অর্থনীতিগুলি দফায় দফায় রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু এ বছরের শরতে ট্রাম্প সেই অবস্থান থেকে সরে এসে পুতিনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার চেষ্টা করছেন। অথচ রাশিয়া এখনও তার প্রতিবেশী দেশের উপর হামলা বন্ধ করেনি।
এই সপ্তাহের গোড়ায় কয়েক জন ডেমোক্র্যাট সেনেটরের নেতৃত্বে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি গোষ্ঠী ব্যাঙ্ক ও বন্দর কর্তৃপক্ষগুলিকে সতর্ক করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, রুশ ডিজেলের এই লেনদেন বা খালাসের কাজে যুক্ত হলে কংগ্রেসের তদন্ত-সহ অন্য আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হতে পারে।
নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট গভর্নর মিকি শেরিল জানিয়েছেন, তাঁর রাজ্যে এই ডিজেল খালাসের চেষ্টা হলে কী ভাবে তা আটকানো যায়, তা খতিয়ে দেখছেন তিনি। চুক্তিটিকে তিনি “দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেআইনি” বলে বর্ণনা করেছেন।
খবরে প্রকাশ, ওই তেল কিনতে মার্কিন সংস্থাগুলিকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউস। কিন্তু আগামী মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এত কাছে এসে আইনি ঝুঁকি নিয়ে ক্রেতারা এই লেনদেনে এগিয়ে আসবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এ বছরের বসন্তে ট্রাম্প ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে আমেরিকায় জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তাতেও ভাটা পড়েছে। জনমত সমীক্ষার ইঙ্গিত, নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেনেটের লড়াই এতটাই হাড্ডাহাড্ডি যে, শেষ পর্যন্ত কারা নিয়ন্ত্রণ পাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুক্তি ছিল, রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি ডিজেলের দাম কমাতে সাহায্য করবে। কিন্তু আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, চুক্তি ঘোষণার সময় প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৬.২৮ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৬.৩৩ ডলার।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চুক্তির তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এই বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ চলমান যুদ্ধের খরচ জোগাতে ক্রেমলিনকে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, “আড়ালে হওয়া চুক্তি” যুদ্ধক্ষেত্রে পুতিনকে আরও সুবিধা করে দেবে।
সাম্প্রতিক তেল রফতানি সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা করছে ক্রেমলিন। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর লক্ষ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জারি করা একটি প্রেসিডেন্টের ডিক্রিতে তেল রফতানি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।