ইজরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে প্যালেস্টিনীয় দলগুলির আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাসে দেশের মূলধারার বিরোধীদের সামনে হাজির হয়েছে এক কঠিন প্রশ্ন। আরব ইজরায়েলিদের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটবেন তাঁরা, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক অনড় অবস্থানের জেরে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরার পথই প্রশস্ত করবেন?
মঙ্গলবার বুথফেরত সমীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকট একে ‘ইজরায়েলের জায়নবাদী জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের’ জয় বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু ভোটের প্রকৃত ফলাফল এবং সরকার গঠনের অঙ্ক তাঁর এই আত্মবিশ্বাসকে কতটা সমর্থন করবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
পুরনো ও নতুন নেসেটের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে চলেছে প্যালেস্টিনীয় দলগুলির প্রতিনিধিত্বে। তাদের আসনসংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে ১৭ বা ১৮ হতে পারে বলে পূর্বাভাস। তাতে ইজরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় বদল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আরব ইজরায়েলিদের রাজনৈতিক ভাবে প্রান্তিক করে রাখা বা তাঁদের উপেক্ষা করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠবে।
বুথফেরত সমীক্ষা অনুযায়ী, আইজেনকটের বিরোধী জোট এবং নেতানিয়াহুর শাসক জোট প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে। নেতানিয়াহুর লিকুদ বৃহত্তম একক দল হিসেবে উঠে আসতে পারে। কিন্তু ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গড়তে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনও পক্ষই পাচ্ছে না।
প্রকৃত ফলেও এই ছবি বজায় থাকলে, সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ কাকে দেওয়া হবে, তা স্থির করার দায়িত্ব পড়বে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের উপর। মনোনীত কোনও প্রার্থী ছয় সপ্তাহের মধ্যে সরকার গড়তে ব্যর্থ হলে পরবর্তী বিকল্পকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। ফলে সরকার গঠন নিয়ে টানাপড়েন দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তত দিন নেতানিয়াহুর জোটই তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে।
সমঝোতা ছাড়া উপায় নেই
আইজেনকট দাবি করতেই পারেন, আলোচনার মাধ্যমে নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে তাঁর ‘পরিবর্তন’ জোটের শরিকদের সঙ্গে প্যালেস্টিনীয় দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠী—জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আমের সমঝোতা প্রয়োজন। রা’আম হল ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা সংযুক্ত আরব তালিকার সংক্ষিপ্ত নাম।
রা’আমের নেতা মনসুর আব্বাসের সঙ্গে আলোচনা তুলনায় সহজ হতে পারে। নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী ঝোঁকের সরকারে এর আগেও অংশ নিয়েছিল তাঁর দল। সেই বেনেটই এখন আইজেনকটের জোটের অপেক্ষাকৃত ছোট শরিক। আব্বাসের ডেপুটি একজন ইহুদি জায়নবাদী। অতীতেও রাজনৈতিক সমঝোতায় আগ্রহ দেখিয়েছে দলটি।
মঙ্গলবার আব্বাস স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হল ‘এই নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, [বেজালেল] স্মোট্রিচ এবং [ইতামার] বেন-গভিরকে ক্ষমতা থেকে সরানো’।
তবে অঙ্কের হিসাব বলছে, রা’আমের সমর্থন পেলেই আইজেনকটের সরকার গঠনের পথ মসৃণ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বুথফেরত সমীক্ষার অধিকাংশ পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্যালেস্টিনীয় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে রা’আম অপেক্ষাকৃত ছোট দল হিসেবে সাতটি আসন পেতে পারে। বিরোধী জোটের অন্য শরিকরা সমঝোতায় রাজি হলেও, সেই সমর্থন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার পক্ষে যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে বোঝাপড়া আরও কঠিন হতে পারে। দলটির ১১ বা তারও বেশি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তাদের সমর্থন পেতে আইজেনকট চারটি শর্ত রেখেছেন। প্রথমত, ইজরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত মূল্যবোধ মেনে নিতে হবে। তৃতীয়ত, বর্তমানে বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি পাওয়া প্যালেস্টিনীয় ইজরায়েলি নাগরিকদেরও সেই পরিষেবার আওতায় আনার বিষয়টি মেনে নিতে হবে। চতুর্থত, হামাসকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে নিন্দা করতে হবে।
মঙ্গলবার ভোট গণনার সময় হাদাশের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ শবিতা অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, জোট গঠনের আলোচনায় আইজেনকটের পক্ষে একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। সমাজতান্ত্রিক দল হাদাশই জয়েন্ট লিস্টের বৃহত্তম শরিক।
শবিতার কথায়, ‘জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে শর্ত চাপিয়ে কাজ হবে না। আমরা সমমর্যাদায় আলোচনা করব, কারণ আমাদের পরস্পরকে প্রয়োজন।’
এই মন্তব্যে বিরোধীদের সামনে থাকা সমস্যাটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে প্যালেস্টিনীয় দলগুলির সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। অথচ সেই সমর্থন পেতে যে রাজনৈতিক আপস জরুরি, তা মেনে নিতে বিরোধী শিবিরের একাংশের আপত্তি রয়েছে।
বিরোধীদের ভুলেই নেতানিয়াহুর প্রত্যাবর্তন?
প্যালেস্টিনীয় দুই গোষ্ঠীর কোনও একটির সঙ্গে, কিংবা উভয়ের সঙ্গেই সমঝোতা না হলে, আইজেনকটের সামনে বিকল্প হতে পারে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সংসদে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটে আলাদা করে সমর্থন জোগাড় করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়ার উপর নির্ভরশীল এমন সরকার কত দিন টিকবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এই অস্থিরতা নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে। আর সেখানেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ। বিরোধীরা যদি নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন, তা হলে রক্ষণশীল ইজরায়েলি ইহুদিদের সমর্থন ফের সংহত করার সুযোগ পাবেন তিনি।
নেতানিয়াহু তখন দাবি করতে পারবেন, তাঁর নির্বাচনী স্লোগানই শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে—‘দক্ষিণপন্থা, না প্যালেস্টাইন’। হিব্রু ভাষায় স্লোগানটির দুই অংশে অন্ত্যমিল রয়েছে। কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর: প্যালেস্টিনীয় দলগুলির সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নকে সামনে রেখে ইজরায়েলের ভোটারদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মেরুকরণ আরও তীব্র করে তোলার সুযোগ পাবেন তিনি।
ইজরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘ তিন দশক ধরে ক্ষমতার শীর্ষে কিংবা তার কাছাকাছি থেকেছেন নেতানিয়াহু। একাধিকবার তাঁকে রাজনৈতিক ভাবে কোণঠাসা বলে মনে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই দরকষাকষি, জোট গঠন এবং রাজনৈতিক সমঝোতার অসাধারণ দক্ষতায় ফিরে আসার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।
এ বারও যে তিনি কোনও অপ্রত্যাশিত কৌশলে রাজনৈতিক বিপর্যয় এড়িয়ে যাবেন না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে যদি তিনি ফের ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তা হলে সেই প্রত্যাবর্তনের জন্য নিজের ঘোষিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছেই ঋণী থাকতে হতে পারে তাঁকে। ইজরায়েলের গভীর জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে ঐতিহাসিক সমঝোতা গড়ে তোলার বদলে বিরোধীরা যদি নিজেদের অনড় অবস্থানে আটকে থাকেন, তা হলে তাঁরাই নেতানিয়াহুর হাতে তুলে দেবেন রাজনৈতিক ভাবে বেঁচে ফেরার সুযোগ।
বুধবার ভোররাতে নাজারেথে জয়েন্ট লিস্টের বিজয়োৎসব থেকে দলের এক কর্মকর্তা বিরোধীদের সামনে থাকা এই দ্বন্দ্বটিকেই তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, ‘জায়নবাদী বিরোধীদের বেছে নিতে হবে—আধিপত্য বজায় রাখবেন, নাকি গণতন্ত্র গড়ে তুলবেন।’
ইজরায়েলের বিরোধীদের সামনে এখন প্রশ্নটা শুধু সরকার গঠনের নয়। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতি তাঁরা কতটা বাস্তবায়িত করতে চান, তারও পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে সবচেয়ে বড় সুবিধা পেতে পারেন সেই নেতাই, যাঁকে সরানোর জন্য তাঁরা একজোট হয়েছেন।