ইরানে এখনও ‘এক-দু’টি নিশানা’ বাকি, হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের; পাল্টা দীর্ঘ যুদ্ধের সতর্কবার্তা তেহরানের

ইরানের বিরুদ্ধে ফের সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইরানের সামরিক শক্তির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও এখনও এক-দু’টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা বাকি। শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ফ্লরিডার বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, অবশিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলিতে হামলা চালাতে আমেরিকার দশ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ইতিমধ্যেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী। তবে বাকি লক্ষ্যবস্তুগুলির মধ্যে বিশেষভাবে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর উল্লেখ করেন তিনি। সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পরমাণু কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই স্থানে পারমাণবিক কার্যকলাপ চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান। ট্রাম্পের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই অবশ্য এখনও মেলেনি।

হামলার হুঁশিয়ারি দিলেও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চান না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি, যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে কথাবার্তা এগোচ্ছে। যদিও তেহরানের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না তিনি। ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বিপর্যস্ত হয়েছে বলে দাবি করে ট্রাম্প জানান, নতুন করে হামলা চালানোর জন্য ওয়াশিংটনের কোনও তাড়া নেই। তবে তাঁর মন্তব্যে সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা যে এখনও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তা স্পষ্ট।

মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও অবশ্য জানিয়েছেন, নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। কূটনৈতিক সমাধান পাওয়া গেলে আমেরিকা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। রুবিওর বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার নিষ্পত্তি চান। তবে প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ করার ক্ষমতা সম্পর্কেও ওয়াশিংটন আত্মবিশ্বাসী। অর্থাৎ, আলোচনার দরজা খোলা থাকলেও সামরিক বিকল্প আপাতত টেবিল থেকে সরছে না।

এই টানাপড়েনের মধ্যেই ৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে এই ভোটে। এর আগে নির্বাচনের পরে ইরানের বিরুদ্ধে ফের সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ফলে ভোটের ফল শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, তেহরানের সঙ্গে সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের নামে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে আমেরিকা ও ইজরায়েলকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যে কোনও হুমকির জবাব দেওয়া হবে দ্রুত ও কার্যকর ভাবে। সেই প্রতিক্রিয়া কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও সতর্ক করা হয়েছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সামরিক কমান্ডারদের।

রবিবার ইরানের সেনার মুখপাত্র মহম্মদ আকরামিনিয়া আরও কড়া বার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতপর্বের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধ কখন এবং কী শর্তে শেষ হবে, তা শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঠিক করতে পারবেন না। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যও একই সুরে বাঁধা। তাঁর হুঁশিয়ারি, আক্রমণ হলে তার জবাব দেওয়া হবে সমানুপাতিক ও কঠোর ভাবে। প্রতিক্রিয়ার সময়সীমা কিংবা পরিসর হামলাকারীরা ঠিক করতে পারবে না।

তবে পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেও মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে। কাতারের প্রতিনিধিরা তেহরান সফর করেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মহসেন রেজাইকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। রেজাই জানিয়েছেন, চিঠির ভাষায় পরিবর্তনকে তিনি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। যদিও ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করেছেন, মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের কোনও পরিকল্পনা আপাতত নেই। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই যোগাযোগ চলছে।

সংঘাতের আঁচ পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ইরানের বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহণ করা হয়। ফলে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে তার প্রভাব শুধু আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ, পরিবহণ খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও চাপে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটন ও তেহরান—দু’পক্ষই একদিকে আলোচনার সম্ভাবনা খোলা রাখছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা হুমকির বার্তাও জারি রাখছে। ট্রাম্পের দাবি, কয়েক মিনিটেই ইরানের অবশিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব। অন্যদিকে, তেহরানের হুঁশিয়ারি, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তা দ্রুত শেষ নাও হতে পারে। এখন দেখার, মধ্যস্থতাকারীরা সংঘাত ফের জ্বলে ওঠার আগেই কোনও গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছতে পারেন কি না।