আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের এমন ঢেউ উঠল কেন? ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্তরসূরি হতে চান যে রিপাবলিকান নেতারা, তাঁরা ভোটের ফল বেরোতেই আঙুল তুলেছেন তাঁর নীতির দুই প্রধান স্তম্ভের দিকে। একটি ইরান যুদ্ধ, অন্যটি আমদানি শুল্ক।

মঙ্গলবার রাতে ডেমোক্র্যাটদের অভাবনীয় সাফল্যের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি রিপাবলিকানরা। সমর্থনে এমন ধস নামল কেন, তার কারণ হাতড়াচ্ছেন তাঁরা। বৃহস্পতিবারও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, প্রতিনিধিসভার আরও কয়েকটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জিতেছেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে আলাস্কা ও মিসিসিপির সেনেট আসনের ফল তখনও চূড়ান্ত হয়নি।

টেক্সাস ও কানসাসের মতো পুরনো রিপাবলিকান দুর্গেও দলকে হারতে হয়েছে। এই পরাজয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ফ্লরিডার বিদায়ী গভর্নর রন ডিস্যান্টিস এবং টেক্সাসের সেনেটর টেড ক্রুজ, তিনজনই জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে মানুষের ক্ষোভের কথা বলেছেন। তাঁদের আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের দীর্ঘায়িত যুদ্ধ, তাঁর আক্রমণাত্মক বাণিজ্যনীতি, ইজরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক এবং রক্ষণশীল প্রার্থীদের অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়া ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী বিজ্ঞাপন।

আগেও প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান মনোনয়নের দৌড়ে নেমেছিলেন ক্রুজ। ফের লড়ার সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দেননি। বুধবার নিজের পডকাস্ট ‘ভার্ডিক্ট উইথ টেড ক্রুজ’-এ তিনি বলেন, “শুল্কের জন্য সব কিছুর দাম বড্ড বেড়ে গিয়েছে। আর ইরান যুদ্ধও বড্ড বেশি দিন ধরে চলছে। অল্প সময়ে চূড়ান্ত ফয়সালা করে যুদ্ধ শেষ করা উচিত ছিল। এ বার এর অবসান দরকার।”

বুধবার এক্স-এ এক দীর্ঘ পোস্টে ভ্যান্স লিখেছেন, “আমাদের হারের কারণ যুদ্ধ।” তাঁর কথায় ইঙ্গিত, ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ আমেরিকার মানুষের সমস্যা থেকে সরে গিয়েছে বলেই ভোটাররা ক্ষুব্ধ। দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে ভাইস প্রেসিডেন্ট আরও লিখেছেন, “ফল দেখে যাঁরা ভীষণ চটে আছেন, তাঁদের বলছি, রাগ হওয়ারই কথা। আসুন, সেই রাগ নিয়েই দেশকে বাঁচানোর কাজে ফিরি।”

দু’বছর আগে রিপাবলিকান মনোনয়নের লড়াইয়ে ট্রাম্পের কাছে হেরেছিলেন ডিস্যান্টিস। তার পর থেকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কেও টানাপড়েন চলছে। এ সপ্তাহের ভোট নিয়ে তাঁর মন্তব্য, “আর একটু হলে দলটাই বিলুপ্ত হয়ে যেত, এমনই এক বিপর্যয়।”

বুধবার ডিস্যান্টিস বলেন, যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত জেফ্রি এপস্টিনের মামলা এবং কংগ্রেস সদস্যদের শেয়ার কেনাবেচা নিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ভোটারদের চোখে রিপাবলিকানদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন।

ডিস্যান্টিস মনে করিয়ে দেন, রিপাবলিকানরা নিজেরাই এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ওই অর্থলগ্নিকারীকে ঘিরে বিপুল পরিমাণ দলিল ও চিঠিপত্র রয়েছে সেখানে। ডিস্যান্টিস বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছিলেন, তাঁর টেবিলে ভয়াবহ সব তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, দায়ীদের জবাবদিহি করতে হবে। অথচ তার পর দেখা গেল, কংগ্রেসেরই কয়েকজন সদস্য সেই নথি প্রকাশের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন।”

ভোটের আগের কয়েক মাস ধরেই জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কাজকর্ম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ ক্রমে বাড়ছে। ইরান যুদ্ধের জেরে পেট্রল থেকে মুদিখানার জিনিসপত্র, সবেরই দাম বাড়ছিল। সেই চাপ টের পাচ্ছিলেন আমেরিকার সাধারণ মানুষ।

তবু ট্রাম্পের বিশ্বাস ছিল, ভোটাররা তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। তিনি তাঁদের বলেছিলেন, এমন ভাবে ভোট দিন যেন ব্যালটে তাঁর নিজেরই নাম রয়েছে। যে সব আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা ছিল, সেখানে দলীয় প্রার্থীদের হয়ে নিজেও প্রচার করেছেন।

অন্য দিকে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সংসার চালানোর খরচ কমাবেন এবং প্রেসিডেন্টের বিস্তৃত কর্মসূচিতে রাশ টানবেন। সেই প্রতিশ্রুতিতে ভোটারদের মন জিতেছেন তাঁরা। কংগ্রেসের দুই কক্ষই এখন ডেমোক্র্যাটদের দখলে। এ বার যে সব রাজ্যে গভর্নর পদে ভোট হয়েছে, তারও অধিকাংশে জিতেছেন তাঁরা।

মঙ্গলবারের ফল আরও একটি ইঙ্গিত দিয়েছে। ট্রাম্প কোনও প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়ালে এক সময়ে ভোটে তার যতটা প্রভাব পড়ত, এখন সেই প্রভাব কমেছে। প্রতিনিধিসভা ও সেনেটের বেশ কয়েকটি আসনে বিদায়ী রিপাবলিকান সদস্যদের হয়ে সওয়াল করেছিলেন প্রেসিডেন্ট নিজে। কড়া লড়াইয়ে তাঁরাও হেরেছেন ডেমোক্র্যাটদের কাছে।