কারেন বাস দ্বিতীয় বার মেয়র হোন, চেয়েছিলেন নিত্যা রামন। তাঁকে সমর্থনও জানিয়েছিলেন প্রকাশ্যে। তার কিছুদিনের মধ্যেই, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, নিজেই প্রার্থী হয়ে চমকে দেন সবাইকে। তখন তাঁর জয়ের সম্ভাবনা সামান্য বলেই মনে হয়েছিল। সেই রামনই এ বার বাসকে হারিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচিত হলেন। শহর যে পথে চলছিল, তা নিয়ে বাসিন্দাদের অসন্তোষ কতটা বেড়েছে, এই রায় তারই ইঙ্গিত।
পেশায় নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রগতিশীল রাজনীতির মুখ রামন ২০২০ সাল থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের সদস্য। গ্রীষ্মে জনমত সমীক্ষায় দ্রুত বাড়তে থাকে তাঁর সমর্থন। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস শাখা পাশে দাঁড়ানোয় নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে বারবার তাঁর তুলনা টানা হয়। বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস রামনের জয় নিশ্চিত বলে জানায়। তখন পর্যন্ত গণনায় রামন পেয়েছেন ৫২ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট, বাস পেয়েছেন ৪৮ শতাংশ।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দলকে ধাক্কা দিয়ে কংগ্রেসের দুই কক্ষ, প্রতিনিধি সভা ও সেনেটের নিয়ন্ত্রণ জিতেছেন ডেমোক্র্যাটরা। ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি লস অ্যাঞ্জেলেসে অবশ্য লড়াইয়ের চরিত্র ছিল আলাদা। রামন ও বাস দু’জনেই প্রগতিশীল। তাঁরা দুই প্রজন্মের প্রতিনিধি। দলের ভিতরেও তাঁরা এমন দুই ধারার মানুষ, যাদের মধ্যে প্রায়ই মতবিরোধ দেখা দেয়। মেয়র নির্বাচনের প্রচারে সেই লড়াই তিক্ত হয়ে উঠেছিল।
জয়ের পর এক ভিডিয়ো বার্তায় রামন বলেন, “এই শহরকে আমি ভালবাসি। ভালবাসি এখানকার মানুষকে। আপনাদের সকলের সঙ্গে মিলে আরও সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুরু করতে আর তর সইছে না।” একদা তাঁর রাজনৈতিক মিত্র বাসেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন রামন। তাঁর কথায়, “লস অ্যাঞ্জেলেস আজ যে শহর হয়ে উঠেছে, তাকে গড়ে তুলতে জীবনের কয়েক দশক দিয়েছেন কারেন বাস।”
প্রচারের সময় অবশ্য এমন সৌজন্যের সুর শোনা যায়নি। শহরের দুর্দশা কাটাতে কে কোথায় ব্যর্থ হয়েছেন, তা নিয়ে পরস্পরকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন দুই প্রার্থী। এর আগে কোনও নির্বাচনে হারেননি বাস। অথচ এ বার দ্বিতীয় মেয়াদ জেতার পথ গোড়া থেকেই কঠিন ছিল। তাঁর জনপ্রিয়তা নেমে এসেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার কাছাকাছি। শহরের হাল নিয়ে বাসিন্দাদের ক্ষোভের সঙ্গে যোগ হয়েছিল আমেরিকার রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জমে ওঠা অসন্তোষ।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বহু মানুষের মাথার উপর ছাদ নেই। তা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে, সাধ্যের মধ্যে বাড়ি পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে। এ দিকে অভিবাসীদের দেশ থেকে বহিষ্কার করতে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানের বড় ধাক্কা এসে পড়েছে এই অঞ্চলে। হলিউডও সঙ্কটে। তার উপর শহরের বাজেটে বিপুল ঘাটতি।
বৃহস্পতিবার বাস বলেন, “আমরা অন্য ফল আশা করেছিলাম। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের মানুষ তাঁদের রায় দিয়েছেন। আমি কাউন্সিল সদস্য নিত্যা রামনকে ফোন করে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছি। দায়িত্ব হস্তান্তর যাতে নির্বিঘ্নে হয়, সেই অঙ্গীকারও করেছি। শহরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এখন আমাদের সকলের দায়িত্ব।”
ভোটারদের কাছে রামনের আবেদন ছিল, এই সময়ে যা দরকার, সেই “সততা ও তৎপরতা” নিয়েই তিনি কাজ করবেন। বাড়িভাড়া কমানো, শহরের রাস্তাঘাটের হাল ফেরানো, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা কমানো এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ছিল তাঁর প্রচারের প্রধান বিষয়।
বাছাই পর্বের নির্বাচনে রামনকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। শহরের উদারপন্থী ভোটারদের একটা বড় অংশ এবং বড় শ্রমিক সংগঠনগুলি তত দিনে বাসের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে, স্পেনসার প্র্যাটের বর্ণাঢ্য প্রচারের আড়ালে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন রামন।
প্রাক্তন রিয়্যালিটি টিভি তারকা প্র্যাট রিপাবলিকান হিসেবে নথিভুক্ত ভোটার। প্যালিসেডসের দাবানলে নিজের বাড়ি হারানোর পর তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। বাস ও রামনকে আক্রমণ করে তাঁর প্রচারের নজরকাড়া বিজ্ঞাপনগুলি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচার জুড়ে বাসকে অস্বস্তিতে রেখেছিলেন প্র্যাট। তাঁর অভিযোগ ছিল, বাসের হাতে শহরের প্রশাসন ঠিকমতো চলছে না। দাবানল সামলানোর যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না প্রশাসনের, আগুন নেভার পরেও পুনরুদ্ধারের কাজে খামতি থেকে গিয়েছে।
বাছাই পর্বে অল্পের জন্য প্র্যাটকে পিছনে ফেলেন রামন। তার পরেই তাঁর প্রচার গতি পায়। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস শাখার আনুষ্ঠানিক সমর্থন তাঁর পালে হাওয়া জোগায়। রামন নিজেও দীর্ঘদিন ধরে এই সংগঠনের সদস্য। শহর জুড়ে স্বেচ্ছাসেবকেরা তাঁর হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে শুরু করেন।
ভোটের কিছুদিন আগে অবশ্য সেই সমর্থন নিয়েও সংগঠনের ভিতরে বিতর্ক বাধে। ইজরায়েলকে বয়কট, সেখান থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিতে যে আন্দোলন চলছে, তা নিয়ে রামনের অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন সংগঠনের জাতীয় নেতারা। রামন অবস্থান স্পষ্ট করা পর্যন্ত স্থানীয় শাখার সমর্থন প্রত্যাহারের প্রস্তাব ওঠে। শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটিতে সেই প্রস্তাব পাশ হয়নি।
শরতে বাসের শিবির রামনের বিরুদ্ধে আক্রমণের সুর চড়ায়। জনমত সমীক্ষায় দু’জনের ব্যবধানও কমে আসে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য শহরের নানা প্রান্তের ভোটারদের সমর্থন পেয়ে জয়ী হন রামন।
মঙ্গলবার রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্রিক থিয়েটারের বাইরে রামনের সমর্থকেরা উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন। তাঁদেরই একজন সাউথ সেন্ট্রাল লস অ্যাঞ্জেলেসের হাইস্কুল শিক্ষক ম্যাক্স রিকো। হ্যালোউইনে ব্যালট বাক্স সেজেছিলেন, সেই পোশাক পরেই এসেছিলেন এ দিনের জমায়েতে। তাঁর আশা ছিল, তরুণ ভোটারদের ব্যালট গোনা হলে রামন এগিয়ে যাবেন।
এক সময় বাসের সমর্থক ছিলেন রিকো। মেয়র হিসেবে তাঁর কাজ দেখে হতাশ হয়েছেন। রিকোর মতে, যে সব এলাকার মানুষের সাহায্য সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, বাসের নীতিতে তাঁদের উপকার হয়নি। রামনের যে প্রতিশ্রুতি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী করেছে, তা হল সাধ্যের মধ্যে আবাসনের ব্যবস্থা। শিক্ষক হিসেবে রিকো বহু বার দেখেছেন, শিক্ষাবর্ষের মাঝপথেই ছাত্রছাত্রীরা স্কুল ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কারণ, খরচ সামলাতে তাদের পরিবারকে এমন কোথাও উঠে যেতে হচ্ছে, যেখানে থাকা সস্তা।
রিকোর কথায়, “আশা করি, এ বার আরও বেশি পরিবার এই শহরেই থেকে যেতে পারবে।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।