ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা লাতিন আমেরিকায় দক্ষিণপন্থীদের একের পর এক নির্বাচনী জয়ের ধারায় ছেদ টেনেছেন। তবে এই অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলির মধ্যে এখন বামপন্থী সরকার রয়েছে কেবল ব্রাজিল ও মেক্সিকোয়। জলবায়ু রক্ষায় বামপন্থীরা বেশি আগ্রহী, আর দক্ষিণপন্থীরা উদাসীন—এমন সরল সমীকরণ অবশ্য বাস্তবকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে না। তবু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশের ভিতরে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গেলে লুলাকে বেশ কয়েকটি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।
লুলার সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ, জলবায়ু রক্ষায় ব্রাজিলের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে তোলা। এ ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থানও বেশ অনন্য। ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি, আয়তনে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ এবং আমাজন অরণ্যের সিংহভাগের ধারক। তার উপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, America, চিন, ব্রিকসের সদস্যদেশ-সহ বহু উন্নয়নশীল অর্থনীতির সঙ্গে ব্রাজিলের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জলবায়ু চুক্তির পথে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠা আন্তর্জাতিক বিভাজনগুলি দূর করে আলোচনার নতুন পরিসর তৈরি করতে পারেন লুলা।
বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। দু’সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তুরস্কে শুরু হতে চলা কপ৩১ সম্মেলনে এই প্রযুক্তির উপর শুল্কের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে চিন। বেজিং বাণিজ্যিক সংরক্ষণবাদের বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও America চিনা উৎপাদকদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই টানাপড়েনের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধনের সুযোগ রয়েছে ব্রাজিলের সামনে।
আমাজন বাঁচাতে আঞ্চলিক ঐক্য
ব্রাজিলের চ্যালেঞ্জ অবশ্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাজন অঞ্চলে বন উজাড়, বেআইনি খনন, দাবানল এবং নদী অববাহিকার ক্রমাবনতি—সবক’টি সমস্যার মোকাবিলাতেই প্রয়োজন আঞ্চলিক সহযোগিতা। সেই সহযোগিতায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি।
আমাজন সহযোগিতা চুক্তি সংস্থা বা অ্যাক্টো-র মাধ্যমে এই উদ্যোগকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে লুলার ভূমিকা প্রশংসনীয়। ২০২৩ সালে বেলেম শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন এবং ২০২৫ সালে বোগোটা শীর্ষ সম্মেলনে নতুন কিছু অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
তবে আশাবাদের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাগুলিও স্পষ্ট। ২০২৩ সালের বেলেম ঘোষণায় আমাজনের বন উজাড় বন্ধ করার জন্য কোনও বাধ্যতামূলক অভিন্ন সময়সীমা নির্ধারণ করা যায়নি। ওই অঞ্চলে নতুন তেল প্রকল্প গড়ে তোলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়েও ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এর পিছনে রয়েছে দেশগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থের পার্থক্য। কোনও দেশের অর্থনীতি কৃষির উপর বেশি নির্ভরশীল, কোনও দেশের কাছে পেট্রোলিয়াম বা খনিশিল্প বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবার বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্যেও বিস্তর ফারাক। তার উপর রাজনৈতিক পালাবদল আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে লুলার চতুর্থ মেয়াদ অ্যাক্টো-কে আরও কার্যকর করে তোলার সুযোগ এনে দিতে পারে। বিশেষত, সীমান্তের দুই পারে সমন্বিত আইন প্রয়োগ এবং পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনার মঞ্চ হিসেবে সংস্থাটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। দেশগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং দুর্বল জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে অ্যাক্টো-কে যৌথ নজরদারি ও অর্থায়নের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের দ্বৈত ভূমিকা
আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ব্রাজিলের গুরুত্বের পিছনে রয়েছে তার এক দ্বৈত অবস্থান। একদিকে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক, অন্যদিকে বিশেষত লুলার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতার অন্যতম সমর্থক।
লুলার নির্বাচনী জয়ের পরদিনই নেদারল্যান্ডস ঘোষণা করেছে, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ব্রাজিলের ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফেসিলিটি’ বা টিএফএফএফ-এ দশ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এর ফলে এই উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত ঘোষিত মোট অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি দাঁড়িয়েছে ৭৮০ কোটি ডলারে। ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে সেই অঙ্ক ১,০০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
লুলার সরকার বহাল থাকলে টিএফএফএফ-এর প্রাথমিক পর্যায়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে। উদ্যোগটি ভবিষ্যতে একটি নতুন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রূপ নিতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমর্থন এবং নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সরে আসার প্রশ্নেও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে ব্রাজিল। গত এপ্রিলে কলম্বিয়া ও নেদারল্যান্ডস যৌথভাবে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। তাতে ব্রাজিল-সহ ৫৭টি দেশ অংশ নেয়। সম্মেলনে আর্থিক সহযোগিতার বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয় এবং ২০২৭ সালে দ্বিতীয় বৈঠকের পরিকল্পনাও করা হয়।
এর আগে, গত বছর ব্রাজিলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার একটি আন্তর্জাতিক রূপরেখা তৈরির প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন লুলা। ৮০টিরও বেশি দেশ তাতে সমর্থন জানায়। কিন্তু রাশিয়া ও সৌদি আরব-সহ কয়েকটি দেশের বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত সম্মেলনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। ফলে এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি বিকল্প মঞ্চ হিসেবে উঠে এসেছে।
বাণিজ্যেও জলবায়ুর শর্ত
এই লক্ষ্য পূরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মেরকোসুরের সম্পর্ক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ আমেরিকার এই বাণিজ্যজোট জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি ও অংশীদারিত্ব চুক্তিতে সই করেছে। অংশীদারিত্ব চুক্তিটির চূড়ান্ত অনুমোদন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে, কারণ এই চুক্তিগুলিতে সরকারগুলির প্যারিস জলবায়ু চুক্তি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এর ফলে রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু আলোচনার বাইরেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে নিজের জলবায়ু কূটনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন লুলা। একই সঙ্গে তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অঙ্গীকার, যা পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগকে আরও স্থায়ী ভিত্তি দেবে।
তবে এই সম্পর্কের উল্টো দিকও রয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে বনভূমিকে কৃষি বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করার প্রবণতাও বাড়তে পারে। তাই শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করলেই চলবে না। বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে বন সংরক্ষণের ভারসাম্য বজায় রাখতে লুলা ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রনেতাদের আরও কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিশ্রুতি নয়, চাই ফল
সব মিলিয়ে, কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেই সহযোগিতার ফলে বাস্তবে নির্গমন না কমলে তার মূল্য সীমিতই থেকে যাবে। জলবায়ু কূটনীতি আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলিকে পিছিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে, কিন্তু তাতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত হয় না।
রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ কর্মসূচি ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে, সমস্ত দেশ প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের অঙ্গীকার পূরণ করলেও চলতি শতাব্দীর শেষে বিশ্বের গড় উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, বর্তমান প্রতিশ্রুতিগুলিও জলবায়ু বিপর্যয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
দেশের ভিতরেও বাধার মুখে পড়তে পারেন লুলা। ব্রাজিলের নতুন রক্ষণশীল কংগ্রেস তাঁর সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাঁর চতুর্থ মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ দিলেও রাজনৈতিক ও আর্থিক বাধাগুলি থেকেই যাবে।
২০৩০ সাল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু সংক্রান্ত বহু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে এই বছরটিকে চূড়ান্ত সময়সীমা অথবা অগ্রগতির নির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে লুলার সরকারের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কী হবে, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। লুলার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্তৃত্বের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল কর্মসূচিগুলি তাঁর বিদায়ের পর ধাক্কা খেতে পারে। তাই শুধু নিজের শাসনকালে উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট নয়; এমন প্রতিষ্ঠান, অর্থায়ন ও নীতিকাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি, যা সরকার বদলালেও টিকে থাকবে।
লুলার চতুর্থ জয় তাই একদিকে ব্রাজিলের জলবায়ু নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ, অন্যদিকে তাঁর প্রতিশ্রুতির কঠিন পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমর্থন আদায় করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি হবে একটাই—বন কতটা বাঁচল, নির্গমন কতটা কমল এবং ঘোষিত অঙ্গীকার কতটা বাস্তবে রূপ পেল।