তিন সপ্তাহ আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ফল প্রকাশের পর বামপন্থী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা নাকি ঘনিষ্ঠদের কাছে আক্ষেপ করেছিলেন, তাঁর তিন দফার শাসনের মধ্যে এবারের সরকারকেই তিনি সবচেয়ে সফল বলে মনে করেন। তা হলে ভোটে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করলেন কী করে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি নিজেও।
লুলার শিবিরে তখন হতাশা। প্রথম দফায় অন্য প্রার্থীরা মিলিয়ে পেয়েছিলেন প্রায় ৯০ লক্ষ ভোট। তাঁদের অধিকাংশই দক্ষিণপন্থী হওয়ায় সেই ভোটের বড় অংশ কট্টর দক্ষিণপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর দিকে যাবে বলে ধরে নিচ্ছিলেন অনেকে। বিশ্লেষকদের একাংশের চোখে, লুলার হার তখন প্রায় নিশ্চিত।
কিন্তু রাজনীতির হিসাব যে সব সময় অঙ্ক মেনে চলে না, তা বুঝিয়ে দিল পরের তিন সপ্তাহ।
ভোটের পরের রাতেই ব্রাজিলের নিটেরোই শহরের রাস্তায় নেমে আসেন ফ্লুমিনেন্স ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। গুয়ানাবারা উপসাগরের অন্য পারে, রিও দে জেনেইরোর মুখোমুখি এই শহরে তাঁদের প্রতিবাদ ছিল বলসোনারো পরিবারের ফের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনার বিরুদ্ধে। ফ্লাভিওর বাবা, ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো, অভ্যুত্থানের চেষ্টার দায়ে তখন গৃহবন্দি।
দু’দিন পরেই রিওর কেন্দ্রস্থলে আর এক ছাত্রবিক্ষোভ। তার পরের কয়েক দিনে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে একই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। লুলা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনই তাঁর প্রচারে নতুন অক্সিজেন জুগিয়েছিল। দ্বিতীয় দফার ভোটে পিছিয়ে পড়া লুলার ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এই জনসমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
রবিবার রাতে ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারানোর পর বিজয়ভাষণে লুলা বলেন, “গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে ব্রাজিলের যে তরুণেরা রাস্তায় নেমেছেন, তাঁদের উদারতার জন্য আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফাবিও ভাসকনসেলোসের মতে, লুলার প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে ছিল তিনটি শক্তির মেলবন্ধন—রাস্তার আন্দোলন, সমাজমাধ্যমে প্রচার এবং সরকারি ব্যবস্থার ব্যবহার। ব্রাজিলের নির্বাচনী ইতিহাসে এই প্রথম কোনও প্রার্থী প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থেকেও দ্বিতীয় দফায় সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে জয় ছিনিয়ে নিলেন।
ভোটের আগে আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও একাধিক পদক্ষেপ করেছিলেন লুলা। নির্বাচনী আইনে যতটা অনুমতি ছিল, তার শেষ সীমা পর্যন্ত গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলির জন্য প্রধান নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে অর্থের পরিমাণ বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই সেই অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়।
পারানা ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বৈধতা’ গবেষকগোষ্ঠীর সদস্য ভাসকনসেলোসের কথায়, “রাস্তা আর সমাজমাধ্যম প্রায় একাকার হয়ে গিয়েছিল।”
হোয়াটসঅ্যাপেই ভোটযুদ্ধ
প্রথম দফার ভোটের মাত্র দু’দিন পর লুলার সহযোগী তথা কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস হোয়াটসঅ্যাপে খুলে ফেলেন ‘লুলার বাহিনী’ নামে একটি চ্যানেল। সেখানে অডিয়ো বার্তা ও ভিডিয়ো পাঠাতেন তিনি। অনেক বার্তার শুরুতেই শোনা যেত তাঁর চিৎকার, “বন্ধুরা, জরুরি খবর!”
তার পর একের পর এক নির্দেশ—কী ভাবে সমাজমাধ্যমে লুলার সমর্থনে তৈরি পোস্ট, ভিডিয়ো ও অন্যান্য বিষয়বস্তু আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। অর্থাৎ, শুধু প্রচার নয়, সমর্থকদেরও সক্রিয় প্রচারক হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু হয়।
প্রথম দিনেই চ্যানেলটির অনুসারীর সংখ্যা পৌঁছে যায় ৬০ হাজারে। রবিবার, ভোটের দিন, সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় এক কোটি। ডিজিটাল প্রচারের ময়দানে বলসোনারোকে টেক্কা দিতে সক্ষম হয় লুলার শিবির।
বিজয়ভাষণে জানোনেসকে ‘আমাদের সেনাপতি’ বলে উল্লেখ করেন লুলা। তাঁর কথায়, জানোনেসের দায়িত্ব ছিল “প্রতিদিন আমাদের বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা রাখা”।
সেই দায়িত্ব পালনে কতটা মরিয়া ছিলেন জানোনেস, তার প্রমাণ মেলে ভোটের আগের দিন। ইউটিউবে টানা ২৪ ঘণ্টা সরাসরি সম্প্রচার করেন তিনি। নিরলস প্রচারের ধকলের জেরে গত সপ্তাহে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলটিও নীরব ছিল মাত্র এক দিন—যে দিন জানোনেস হাসপাতালে ছিলেন।
অনলাইন প্রচারের ধরনেও বড়সড় বদল আনেন লুলার শিবির। আগামী মঙ্গলবার যাঁর বয়স ৮১ হবে, সেই বিদায়ী প্রেসিডেন্টের নিজের কোনও মোবাইল ফোনই ছিল না। তা সত্ত্বেও প্রচারের শেষ পর্যায়ে সেলফি ভিডিয়ো রেকর্ড করতে শুরু করেন তিনি। রবিবার রাতে বিজয়ের পর জানান, তাঁকে একটি ফোন দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, “এখন থেকে ব্রাজিলের মানুষের সঙ্গে আমি অনেক কথা বলব, দিনে বহু বার, সরাসরি।”
ভাসকনসেলোসের মতে, রাস্তায় প্রতিবাদ এবং সমাজমাধ্যমের এই যৌথ প্রভাবেই তিন সপ্তাহের মধ্যে বদলে যায় রাজনৈতিক আবহ। তাঁর কথায়, “পরাজয়ের মনোভাব ক্রমশ সরে গিয়ে জায়গা করে দেয় ঘুরে দাঁড়ানোর আশাকে।”
ভয়ের ভোট, বদলের ভোট
ব্রাজিলের নতুন দক্ষিণপন্থা নিয়ে গবেষণারত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কামিলা রোশার মতে, লুলার প্রত্যাবর্তন ছিল একই সঙ্গে “ব্রাজিলকে নিয়ে বলসোনারোপন্থীদের প্রকল্পের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রত্যাখ্যান”।
মে মাস থেকে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন রোশা। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ভোটারদের একাংশের মধ্যে অধিকার হারানোর ভয় এবং বলসোনারোর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এই উদ্বেগ লক্ষ করেছেন তিনি। ফলে লুলাকে ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ না করলেও অনেকে তাঁকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথম দফায় ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছিলেন ৫ কোটি ৬১ লক্ষ ভোট। দ্বিতীয় দফায় তাঁর ভোট বেড়ে হয় ৫ কোটি ৯৮ লক্ষ। অন্য দিকে, লুলার ভোট ৫ কোটি ৩৯ লক্ষ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৪২ লক্ষে। অর্থাৎ, দ্বিতীয় দফায় লুলার ভোট বেড়েছে এক কোটিরও বেশি।
এই বাড়তি ভোটের পিছনে ছিল একাধিক কারণ। প্রথম দফায় ঐতিহাসিক ভাবে বেশি সংখ্যক ভোটার ভোট দেননি। দ্বিতীয় দফায় তাঁদের একাংশকে বুথে আনা সম্ভব হয়। পাশাপাশি, প্রথম দফায় অন্য প্রার্থীদের ভোট দেওয়া মানুষেরও একাংশ লুলার দিকে ঝোঁকেন। তাঁদের মধ্যে এমন ভোটারও ছিলেন, যাঁরা প্রথমে বলসোনারোকে সমর্থন করেছিলেন।
রোশা বলেন, “আমরা যে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তাঁদের কেউ কেউ বলেছিলেন, বলসোনারো একজন আমোদপ্রিয় ধনীর দুলাল, যিনি বড় ব্যবসার পক্ষ নেন। একই সঙ্গে তাঁরা নিজের থেকেই বলছিলেন, তিনি জিতলে একনায়কতন্ত্র আসবে এবং মানুষ অধিকার হারাবে।”
সম্প্রতি একাধিক বিতর্কেও জড়িয়েছেন বলসোনারো। তিনি বলেছিলেন, নতুন এবং আরও রক্ষণশীল কংগ্রেসকে কাজে লাগিয়ে সংবিধান বদলাবেন এবং ব্রাজিলকে ‘ফের গণতান্ত্রিক’ করবেন। পাশাপাশি, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ফেডারেল পুলিশের দু’টি তদন্তও চলছে।
তবে লুলার জয়ের ব্যাখ্যা শুধু বলসোনারোর বিরুদ্ধে ক্ষোভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, লুলার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও বড় ভূমিকা নিয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেলসিমারা দে সুজার মতে, “অন্য কোনও প্রার্থী হলে বলসোনারো প্রথম দফাতেই জিতে যেতেন।”
লুলার প্রচারপ্রধান মার্কো অরেলিও দে কারভালিয়োও জয়ের কৃতিত্ব দিতে গিয়ে দ্বিধা করেননি। তাঁর কথায়, “প্রেসিডেন্ট লুলা। আমাদের দলে একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক রয়েছেন। আমাদের একজন তারকা খেলোয়াড় আছেন। তিনিই যে ফারাকটা গড়ে দিয়েছেন, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।”
লুলার পর কে?
ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের আনন্দের মধ্যেই ব্রাজিলের বামপন্থীদের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন—এর পরে কী?
লুলা ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, এটাই ছিল তাঁর শেষ নির্বাচন। ফলে তাঁর পর কে দলের নেতৃত্ব দেবেন, কী ভাবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বাইরে বামপন্থীরা কতটা সমর্থন ধরে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রোশার কথায়, “এটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ, এ বিষয়ে জনমত সমীক্ষাগুলিতে এখনও লুলার প্রাধান্য অত্যন্ত প্রবল। তাঁর দলে একই মাপের নেতৃত্ব আর কারও নেই।”
তবে ভাসকনসেলোস মনে করেন, এই প্রচারাভিযান ব্রাজিলের বামপন্থীদের সামনে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগও তৈরি করেছে। তাঁর মতে, “রাস্তায় আমরা যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে বলা যায়, ব্রাজিলের বামপন্থীদের সামনে নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার একটি সুযোগ এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে লুলার দল তরুণদের এবং শহরের সেই সব ভোটারের সঙ্গে আরও নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারে, যাঁদের মনে হচ্ছে তাঁদের উদ্বেগের কথা কেউ শুনছে না।
প্রথম দফার ধাক্কা থেকে দ্বিতীয় দফার জয়—লুলার এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু ভোটের অঙ্ক বদলের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাস্তায় নেমে আসা তরুণদের প্রতিবাদ, ডিজিটাল প্রচারের সংগঠিত শক্তি, আর অধিকার হারানোর আশঙ্কায় থাকা ভোটারদের সিদ্ধান্ত। তবে এই সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তিতে বদলানোই এখন ব্রাজিলের বামপন্থীদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।