নিজের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নতুন সংস্থা ‘এনিথিং’-এর কাজকর্ম সামলাতে ধ্রুব আমিনের ভরসা এখন কয়েক ডজন সহকর্মী। কখনও নির্বাহী সহকারী গুয়েনকে বলেন বৈঠকের সময় ঠিক করে দিতে, কখনও কোড লেখার সঙ্গী কোডির সঙ্গে বসে মেটান প্রযুক্তিগত সমস্যা। সংস্থার অনলাইন উপস্থিতি বাড়ানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন বেটসির সঙ্গে। নতুন গ্রাহকদের পরিষেবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেন জুনোকে। এমনকি অফিসের রান্নাঘরে জলখাবার ফুরিয়ে গেলেও স্ল্যাকে বার্তা পাঠান অফিস ম্যানেজার জাস্টিনকে।

তবে এই সহকর্মীদের কেউই মানুষ নন। প্রত্যেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এজেন্ট—এমন এক ধরনের সফটওয়্যার, যা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এই প্রযুক্তি নিয়েই এখন বাজি ধরছে একাধিক স্টার্টআপ। তাদের লক্ষ্য, বিক্রিবাটা, বিপণন, কোড লেখা থেকে শুরু করে অফিসের দৈনন্দিন কাজকর্মের বড় অংশই তুলে দেওয়া হবে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের হাতে।

এনিথিংয়ে এই পরিবর্তনের ছবিটা বেশ স্পষ্ট। সেখানে মানুষের সংখ্যা মাত্র ১৫, অথচ এআই এজেন্ট প্রায় ১৫০টি। আমিনের বিশ্বাস, খুব শিগগিরই অধিকাংশ সংস্থায় এমন অনুপাতই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

তাঁর কথায়, “আমার মনে হয়, এক বছরের মধ্যে প্রত্যেক সংস্থাতেই মানুষের চেয়ে এআই সহকর্মীর সংখ্যা বেশি হবে।”

সান ফ্রান্সিসকোর প্রযুক্তি মহলে এআই এজেন্ট এখন কার্যত নতুন মর্যাদার প্রতীক। কম কর্মী নিয়েও কত বেশি কাজ করানো যায়, তা দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিভিন্ন স্টার্টআপ। ইমেলের উত্তর দেওয়া থেকে সম্ভাব্য গ্রাহকের কাছে পণ্য বিক্রির প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই নিজের এআই এজেন্টের দক্ষতা নিয়ে গর্ব করতে দেখা যাচ্ছে কর্মীদের।

কিন্তু এই প্রযুক্তিগত উচ্ছ্বাসের আড়ালেই জমছে উদ্বেগ। এআইয়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা গ্রাহক ও সহকর্মীদের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। কিছু পদ ইতিমধ্যেই উঠে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কর্মীদের রাতারাতি হয়ে উঠতে হচ্ছে এমন সব সফটওয়্যারের ম্যানেজার, যেগুলি নিজেরাই প্রায়ই ভুল করে বসে।

আমিনের মতো প্রযুক্তি-স্টার্টআপের কর্মীরা এই পরিবর্তন প্রথম গ্রহণ করলেও বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলিও খুব পিছিয়ে নেই। ম্যাকিনসির ‘স্টেট অব এআই গ্লোবাল সার্ভে’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বড় প্রতিষ্ঠান অন্তত একটি কাজে এআই এজেন্ট ব্যবহার করেছে। আগের বছরে এই হার ছিল ২৭ শতাংশ। বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, আরও বেশি কাজ এআইয়ের হাতে তুলে দিয়ে আগামী কয়েক বছরে নিজেদের কর্মীসংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করছে সংস্থাগুলি। যদিও এমআইটির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে এআই ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির প্রমাণ এখনও মিলছে না।

এজেন্টই নতুন স্ট্যাটাস

এআই এজেন্টের এই প্রসারে ইন্ধন জোগাচ্ছে একাধিক স্টার্টআপ ও বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল সহকর্মীর স্বপ্ন দেখিয়ে নিজেদের পণ্য বিক্রি করছে তারা।

যেমন, ‘ভিক্টর’ নামে একটি সংস্থা অন্য প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের ‘এআই চিফ অব স্টাফ’ তৈরি করার সুযোগ দেয়। ‘লিন্ডি’ তৈরি করছে প্রয়োজনমতো সাজিয়ে নেওয়া যায় এমন এজেন্ট, যারা বিক্রিবাটা, গ্রাহক সহায়তা ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে পারে। অন্যদিকে, ওপেনএআইয়ের ‘ডটস’, অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড কোওয়ার্ক’ এবং মাইক্রোসফটের ‘স্কাউট’ হাজার হাজার ডিজিটাল সরঞ্জামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। কর্মীরা অফিস ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যেতে পারে এই এজেন্টগুলি।

এই প্রযুক্তির হাত ধরে সংস্থাগুলির সামনে খুলে যাচ্ছে এক লোভনীয় সম্ভাবনা। প্রয়োজনমতো নতুন সহকর্মী তৈরি করে নেওয়া যাবে, যারা কাজের সময় শেষ হওয়ার অজুহাত দেবে না, ছুটি চাইবে না, অভিযোগ করবে না। কর্মী পরিচালনার ঝামেলাও নেই। তার উপর একজন মানুষকে নিয়োগ করার তুলনায় এজেন্ট ব্যবহার অনেক সস্তা। ফলে কোনও সংস্থায় মানুষের তুলনায় এজেন্টের সংখ্যা বেশি হওয়াটাই এখন গর্বের বিষয় হয়ে উঠছে।

সান ফ্রান্সিসকোর এআই সরঞ্জাম নির্মাতা স্টার্টআপ ‘ওয়ার্ডওয়্যার’-এর চিফ অব স্টাফ রাফায়েল লোপেস মুনিয়োসের কথায়, “ওটাই এখন মর্যাদার প্রতীক।” তাঁর মতে, কাজের একটা বড় অংশ এজেন্টের হাতে তুলে দিতে পারলে বিপুল সময় বাঁচানো সম্ভব।

‘লিন্ডি’র উদাহরণই ধরা যাক। একসময় সংস্থাটিতে প্রায় ৫০ জন কর্মী ছিলেন। পরে এক-তৃতীয়াংশ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়। বর্তমানে কর্মীসংখ্যা প্রায় ২০। বহু শূন্যপদে নতুন মানুষ নিয়োগ না করে সেখানে এআই এজেন্ট বসিয়েছে সংস্থাটি। যদিও কিছু পদে এখনও মানুষ নিয়োগ করা হচ্ছে।

লিন্ডির সিনিয়র গ্রোথ মার্কেটিং ম্যানেজার হানিন আজহারের বক্তব্য, মানুষের কাজের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দুটো হাত এবং দিনে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় কারও হাতে নেই। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তাঁর কথায়, “এখন আপনার একটি ল্যাপটপের পর্দাতেই ১৬টি আলাদা এজেন্ট পাশাপাশি কাজ করতে পারে। এই সরঞ্জামগুলি ব্যবহার করলে নিজেকে অসম্ভব শক্তিশালী মনে হয়।”

নিজের ক্যালেন্ডার সামলানো, বিজ্ঞাপনের কোন স্লোগানে গ্রাহকেরা বেশি সাড়া দিচ্ছেন তা পরীক্ষা করা, কিংবা ব্র্যান্ডের জন্য ছবি তৈরি—এমন বহু কাজই এখন এজেন্টকে দিয়ে করিয়ে নেন আজহার।

তবে এর একটা অস্বস্তিকর দিকও রয়েছে। অন্য মানুষের কাজ হারানোর পিছনে নিজের ভূমিকা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। লিন্ডির পণ্য ঘোষণার প্রচার, সমাজমাধ্যমের পোস্ট এবং বিপণনের ভিডিও এখন তৈরি করছে এআই এজেন্ট। অথচ আগে এই কাজগুলির দায়িত্বে ছিলেন সংস্থার ‘ক্রিয়েটর প্রোগ্রাম’-এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১০০ জন।

পরবর্তী প্রজন্মের কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন আজহার। তাঁর কথায়, “আমি যদি এখন কাজের জগতে প্রথম ঢোকার চেষ্টা করতাম, তা হলে এক বছর আগের তুলনায় অনেক খারাপ অবস্থায় থাকতাম।”

মানুষ নেই, এজেন্ট আছে

কিছু ক্ষেত্রে কর্মীর অভাব পূরণেও বড় ভূমিকা নিচ্ছে এআই এজেন্ট। লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রযোজনা সংস্থার মালিক জে ব্লুমেনফিল্ডের অভিজ্ঞতা তেমনই।

তাঁর সংস্থা তৈরি করে ‘ভার্টিক্যাল মাইক্রোড্রামা’—মোবাইল ফোনের খাড়া পর্দায় দেখার উপযোগী ছোট ছোট চিত্রনাট্যনির্ভর ধারাবাহিক। এই ধরনের কাজের জন্য শুটিংয়ের সময় খুব কম, বাজেটও সীমিত। সম্প্রতি একটি শুটিং চলাকালীন এক সহকারী পরিচালককে বরখাস্ত করতে হয় ব্লুমেনফিল্ডকে। শেষ মুহূর্তে নতুন কাউকে নিয়োগ করার বদলে তিনি এআই এজেন্টের সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

চিত্রনাট্য আপলোড করে এজেন্টকে নির্দেশ দেন, সহকারী পরিচালকের যাবতীয় দায়িত্ব তাকে সামলাতে হবে। নির্দেশ পেয়ে এজেন্ট তৈরি করে শুটিংয়ের সময়সূচি, অভিনেতা ও কলাকুশলীদের কখন কোথায় উপস্থিত থাকতে হবে সেই ‘কল শিট’ এবং সেদিনের শুটিংয়ের প্রয়োজনীয় চিত্রনাট্য। এমনকি সব তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠিয়েও দেয় সে। শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই নিজের কাজ ঠিকমতো সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।

ব্লুমেনফিল্ডের কথায়, “পুরো ব্যাপারটা চূড়ান্ত বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু এটা একরকম আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল।”

এখন ব্লুমেনফিল্ড ও তাঁর অংশীদার টনি মার্শ—এই দু'জনেই একগুচ্ছ এআই এজেন্টের সাহায্যে সংস্থাটি চালান। তাঁর কথায়, “এখন আমাদের একজন সহকারীও নেই।”

চিত্রনাট্য পড়া, সমাজমাধ্যম সামলানো থেকে শুরু করে সফরের পরিকল্পনা—সব কাজেই রয়েছে আলাদা এজেন্ট। নিজের চিফ অব স্টাফ হিসেবে কাজ করার জন্য ‘শার্লি’ নামে একটি এজেন্টও তৈরি করেছেন ব্লুমেনফিল্ড। অন্য একটি এজেন্ট আগামী শুটিংয়ের জন্য উপযুক্ত লোকেশন খুঁজে দেয়, এমনকি বুকিংও করে।

ব্লুমেনফিল্ডের দাবি, আগে এই কাজগুলি করানোর জন্য তাঁকে দু-তিনজন কর্মীকে দু-তিন সপ্তাহের জন্য নিয়োগ করতে হত। এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেরে যাচ্ছে সব কাজ।

তবে এতগুলি এজেন্টের উপর নির্ভর করতে গিয়ে তাঁরও মনে হয়, যেন কোনও নিষেধের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ছবি তৈরির অর্থনীতি এতটাই বদলে গিয়েছে যে অন্য কোনও পথ খোলা নেই বলেই মনে করেন তিনি। এজেন্ট ব্যবহারের ফলেই এখন এমন মাইক্রোড্রামা তৈরির খরচ বহন করতে পারছেন, যেখানে অন্তত এখনও অভিনয় করছেন মানুষই।

সৃজনশীল পেশায় এআই মানুষের কাজ কেড়ে নিতে পারে—হলিউডে এই আশঙ্কা নতুন নয়। সেই প্রসঙ্গে ব্লুমেনফিল্ডের বক্তব্য, “হলিউডে অলিখিত নিয়ম হল, এআই ব্যবহার করার কথা বলা চলবে না। আমি চাই না, এটা মানুষের জায়গা নিয়ে নিক। কিন্তু কীভাবে এটা আমাদের সাহায্য করছে, তা নিয়ে আমাদের সৎ থাকা উচিত।”

কাজ কমছে, নজরদারি বাড়ছে

নিয়মিত এআই এজেন্ট ব্যবহার করেন এমন বেশ কয়েকজন কর্মীর বক্তব্য, এই প্রযুক্তি পুরো মানবকর্মীবাহিনীর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। তবে এজেন্ট ব্যবহারের ফলে কর্মীদের দক্ষতা ও দায়িত্বের ধরন বদলে যাচ্ছে।

তাঁদের অভিজ্ঞতায়, এআই কোড লিখতে পারায় গতানুগতিক প্রোগ্রামিং দক্ষতার গুরুত্ব কিছুটা কমছে। কিন্তু এজেন্টকে ঠিকঠাক নির্দেশ দেওয়া, তার কাজের ফল যাচাই করা এবং ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এখনও মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ, কাজের ধরন বদলাচ্ছে—কাজের দায়িত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না।

লোপেস মুনিয়োস জানিয়েছেন, নিজের স্টার্টআপে নিয়োগের দায়িত্ব এআই এজেন্টের হাতে তুলে দেওয়ার পর তাঁর বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে এজেন্টের ভুল শুধরোতে। কখনও কাছাকাছি নামের দুই চাকরিপ্রার্থীকে গুলিয়ে ফেলেছে তারা, কখনও আবার জীবনবৃত্তান্তের তথ্য নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছে।

নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, তা-ও বদলাচ্ছে বলে জানিয়েছেন আজহার। তাঁর কথায়, “আমরা যে গুণগুলি খুঁজছি, সেগুলি বদলে যাচ্ছে।” এখন বহু বছরের অভিজ্ঞতার তুলনায় সমন্বয় করার ক্ষমতা এবং অন্যদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়ার দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

‘রিভার’ নামে একটি সংস্থা বিক্রির জন্য ফোনালাপ চালাতে পারে এমন এআই এজেন্ট তৈরি করে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা তারেক আবিলামার মতে, কর্মীদের এখন সারাক্ষণ এজেন্টের কাজ পরীক্ষা করতে হয় এবং সেই কাজ সম্পর্কে মতামত দিতে হয়।

তাঁর কথায়, “আমরা সবাই ম্যানেজার হয়ে গিয়েছি। একসঙ্গে একাধিক কাজ সামলাতে খুব দক্ষ হতে হচ্ছে। কারণ এখন আপনি ছ'টি এজেন্ট চালাচ্ছেন, যারা ছ'রকম কাজ করছে।”

আবিলামার প্রথম এজেন্টটি ছিল তাঁর নিজেরই ডিজিটাল প্রতিরূপ। সেটি সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে রিভারের পণ্যের কার্যকারিতা তুলে ধরত। পরে সেই এজেন্টের জায়গায় তিনি আনেন ‘লিভ’ নামে এক নারী-পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব দেওয়া এআই এজেন্ট। গ্রাহক ও তাঁদের সংস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া, পণ্যের কার্যকারিতা বোঝানো এবং বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া সামলানো—সবই করে লিভ। যে কোনও ভাষায়, দিনের যে কোনও সময়ে।

রিভার অবশ্য গ্রাহকদের জানিয়ে দেয় যে লিভ কোনও মানুষ নয়, একটি এআই এজেন্ট। তবু আবিলামার পর্যবেক্ষণ, কথোপকথনের সময় অনেক গ্রাহকই তাকে মানুষ বলে ভাবতে শুরু করেন। লিভের সঙ্গে কথোপকথনের প্রতিলিপি ঘেঁটে তিনি দেখেছেন, কেউ কেউ তার সঙ্গে ফ্লার্টও করছেন। আবার কেউ কেউ নির্ধারিত কথাবার্তার বাইরে গিয়ে এজেন্টের কাছ থেকে বেশি ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছেন।

মানুষের বদলে যন্ত্র নয়

সান ফ্রান্সিসকোর কৃত্রিম কণ্ঠপ্রযুক্তির স্টার্টআপ ‘কোভাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা ব্রুক হপকিন্স অবশ্য এআই এজেন্টকে সহকর্মী হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁর মতে, এগুলি কাজের সরঞ্জাম মাত্র। কাজের গতি বাড়াতে নিজের সংস্থায় এজেন্ট ব্যবহার করলেও গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এভাবে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা আলস্যের পরিচয় এবং এতে ভুল বার্তা পৌঁছতে পারে।

হপকিন্সের কথায়, “একটা ইমেল দেখেই আমি বুঝতে পারি, সেটা এআই লিখেছে কি না। কোনও ইমেল পেয়ে যদি মনে হয়, একজন মানুষ লিখেছেন, তা হলে সাধারণত আমি সেটা পড়ি।”

তাঁর মতে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ হারিয়ে যাওয়াই এখন বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। কোনও সংস্থার পণ্য সম্পর্কে গ্রাহককে বোঝানো কিংবা নিয়োগের প্রক্রিয়া এআই দিয়ে সামলালে সময় বাঁচতে পারে ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে কী হারাতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নও জরুরি।

ডানকান ম্যাকক্লুর চুক্তির ভিত্তিতে এআই মডেলের মূল্যায়নের কাজ করেন। সম্প্রতি তাঁকে নিয়োগ করার জন্য একের পর এক ইমেল ও ফোন এসেছে এআই এজেন্টের কাছ থেকে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, এই যোগাযোগ রীতিমতো বিরক্তিকর।

ম্যাকক্লুরের কথায়, “এর মাধ্যমে যে বার্তাটা দেওয়া হয়, তা হল—আপনার জন্য বাস্তবে কোনও চেষ্টা করার মতো গুরুত্ব আমরা আপনাকে দিচ্ছি না।”

এই অভিজ্ঞতার পর ওই নিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহই হারিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এআই এজেন্ট ব্যবহার করে নিয়োগকারীদের হয়তো কয়েক ঘণ্টা সময় বাঁচছে, “কিন্তু তারা তো আমার সময় নষ্ট করছে।”

এআইয়ের সাহায্যে মানুষের কাজের সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল অংশগুলি স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব। কিন্তু তাতে মানুষের কাজের চাপ কমছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বরং কয়েকটি স্টার্টআপের কর্মীদের অভিজ্ঞতা বলছে, কাজের পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে।

ধ্রুব আমিনের কথাই ধরা যাক। এআই এজেন্টের সাহায্যে আগের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করতে পারছেন তিনি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁর অবসর বাড়ছে। উল্টে সপ্তাহান্তের ছুটিতেও কাজ করে যেতে হচ্ছে তাঁকে।

অর্থাৎ, অফিসে মানুষের সংখ্যা কমছে, এআই সহকর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কাজের চাপ কি সত্যিই কমছে? আপাতত সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। বরং কর্মক্ষেত্রে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—মানুষ শুধু নিজের কাজই করছেন না, পাশাপাশি সামলাচ্ছেন একদল ডিজিটাল কর্মীকেও।