কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ১৯ বছরের নেলিসা মুকুডি। ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নিজের জীবনে বদল টের পেতে শুরু করেছিলেন তিনি।

“আমার সামাজিক জীবন একেবারে তলানিতে ঠেকেছিল। মনে হচ্ছিল, সোশ্যাল মিডিয়া আর পড়াশোনার মধ্যেই গোটা জীবনটা আটকে গিয়েছে,” বললেন তিনি।

নিজেকে সংযত রাখার নিরন্তর লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে মুকুডি ডাউনলোড করেন ‘ওপাল’ নামের একটি অ্যাপ। এতে এমন ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে মনোযোগ নষ্ট করে এমন কোনও অ্যাপ আবার খুলতে গেলে আগে অঙ্ক কষতে হয়। ডিজিটাল আসক্তি কাটানোর ক্রমবর্ধমান বাজারে ওপালের মতো সংস্থার সংখ্যা বাড়ছে। তাদের প্রতিশ্রুতি, ব্যবহারকারীদের নিজেদের ডিজিটাল যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করা। এই প্রতিশ্রুতিকেই পুঁজি করে গ্রাহক টানতে চাইছে তারা—এমন গ্রাহক, যাঁরা প্রয়োজনে সেই পরিষেবার জন্য টাকাও দিতে রাজি। এই শিল্পের বাজারমূল্য এখন প্রায় ১০০ কোটি ডলার। অনুমান, ২০৩৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে।

যে ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ও সোশ্যাল মিডিয়া মঞ্চের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে জেন জ়ি, সেগুলি নিয়েই এই প্রজন্মের মধ্যে ক্রমশ ক্লান্তি জমছে। বহু সংস্থা সেই ক্লান্তিকেই ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখছে। এপ্রিলের একটি জনমত সমীক্ষায় জেন জ়ি-র প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত বলে জানিয়েছেন। অন্য দিকে, ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, এই প্রজন্মের এক-তৃতীয়াংশ অন্তত কিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ মুছে দিয়েছেন।

এই পরিবর্তনের পিছনে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা ক্ষোভও কাজ করছে। জেন জ়ি-র অনেকেরই মনে হচ্ছে, মুনাফার জন্য তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

গুগলের প্রাক্তন প্রোডাক্ট মার্কেটার এবং ওপালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ৩৯ বছরের কেনেথ শ্লেঙ্কার বলেন, “অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত প্রযুক্তিব্যবস্থাগুলি জেন জ়ি-কে কার্যত ডোপামিনের উদ্দীপনায় সাড়া দেওয়ার মতো করে গড়ে নিয়েছিল। কিন্তু এই প্রজন্ম এখন এটাও বুঝতে পারছে, তারা কী চায় না। এই ব্যবস্থার প্রভাব নিজেদের জীবনে কী ভাবে পড়ছে, সেটাই তারা বদলানোর চেষ্টা করছে।”

কেউ কেউ আবার অ্যাপের বদলে যন্ত্রটাই বদলে ফেলছেন। দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ দেয় ‘দ্য অ্যাটেনশন স্টুডিয়ো’। সেই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ২৩ বছরের কেন্ডাল শ্রোয়ে জানিয়েছেন, তিনি স্মার্টফোন ছেড়ে ‘লাইট ফোন’ ব্যবহার শুরু করেছেন। ৩৪৯ ডলারের এই ফোনে স্মার্টফোনের সুযোগসুবিধা রাখা হয়েছে অত্যন্ত সীমিত।

শ্রোয়ের কথায়, “বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির এই মঞ্চগুলি বছরের পর বছর মানুষের ক্ষতি করে এসেছে। এখন আমরা তার ফল অনুভব করতে শুরু করেছি। আমাদের প্রজন্মকে বিগ টেকের গিনিপিগ হতে হয়েছে। আমাদের দুর্ভোগ আর এই অ্যাপগুলির প্রতি আমাদের আসক্তি থেকেই তারা মুনাফা করেছে।”

ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রী ১৯ বছরের শ্রেয়া নল্লামোথু অনলাইনে আট ডলারে কেনা নিয়ার-ফিল্ড কমিউনিকেশন বা এনএফসি ট্যাগ দিয়ে নিজেই তৈরি করেছেন ‘ব্রিক’-এর মতো একটি যন্ত্র। এর সাহায্যে বেছে নেওয়া কিছু অ্যাপের ব্যবহার আটকে রাখা যায়।

নল্লামোথু বলেন, “প্রযুক্তির সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক রাখার অধিকার সবার আছে। খরচ যেন সেই অধিকারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। প্রযুক্তি সংস্থাগুলির পক্ষে যা সবচেয়ে লাভজনক, তা অনেক সময়ই ব্যবহারকারীদের পক্ষে সবচেয়ে ভাল নয়। ভাল প্রযুক্তি মানুষের জন্য যা করতে পারে, সোশ্যাল মিডিয়া তার থেকে সরে গিয়েছে। মানুষ সেটা বুঝতে পেরেছে।”

স্কুলে পড়ার সময় নল্লামোথু যে গবেষণা করেছিলেন, তা ইলিনয়ের রাজ্য সেনেটরদের একটি সাম্প্রতিক বিল এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় বাবা-মায়ের হাতে শিশুদের শোষণ ঠেকানোই ওই বিলের উদ্দেশ্য। সন্তানদের দিয়ে তৈরি বিষয়বস্তু থেকে আয় হলে বাবা-মাকে তাদের প্রাপ্য অর্থ দিতে বাধ্য করে ইলিনয়ে যে আইন পাশ হয়েছে, তার পিছনেও এই গবেষণার ভূমিকা ছিল।

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এই প্রবণতাকে কাজে লাগাতে চাইছে সামনাসামনি অনুষ্ঠান ও জমায়েতকে কেন্দ্র করে তৈরি নতুন অ্যাপগুলিও। ‘পাই’—পুরো নাম ‘পিপল আই এনজয়’—এমনই একটি অ্যাপ। স্থানীয় অস্থায়ী বার-আয়োজন, পাঁচ কিলোমিটার দৌড় কিংবা কনসার্টে একসঙ্গে যাওয়ার মতো জমায়েতের খবর তুলে ধরে এটি। মাত্র এক মাসে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১৫০ শতাংশ—জুলাইয়ে ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে অগস্টে ৩ লক্ষ।

সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাদিয়া ওকামোতো পাই-কে সামনাসামনি মেলামেশার একটি সক্রিয় সামাজিক নেটওয়ার্ক হিসেবে বর্ণনা করেন।

ওকামোতোর কথায়, “আমার কাছে সোশ্যাল মিডিয়া মানে নিষ্ক্রিয়ভাবে একের পর এক বিষয়বস্তু দেখে যাওয়া। পাই তার থেকে আলাদা। এখানে ব্যবহারকারীরা সক্রিয়ভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, নিজেদের সামাজিক বৃত্ত গড়ে তুলছেন।”

পাই-এর আর এক সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি ডান পুরুষদের পোশাকের ব্র্যান্ড ‘বোনোবোস’-এরও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, “এই অ্যাপের প্রতিটি দিক এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ওই মানুষগুলির সঙ্গে গিয়ে মিশতে, তাঁদের সঙ্গী হতে আপনার ইচ্ছে হয়। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এতে অনেক বেশি আপনার হাতে থাকে।”

তবে ডিজিটাল আসক্তি কাটানোর এই পরিষেবাগুলির খরচে বিস্তর ফারাক। ওপালের বার্ষিক সাবস্ক্রিপশনের দাম ৯৯.৯৯ ডলার। ‘ব্রিক’ নামে ছোট একটি যন্ত্রের দাম ৫৯ ডলার; ফোন দিয়ে সেটিকে ছোঁয়ালে অ্যাপ বন্ধ বা চালু করা যায়। আবার ‘শিফট’ নামে একটি অ্যাপের প্রতিশ্রুতি, সেটি স্মার্টফোনকে তথাকথিত ‘ডাম্বফোনে’ বদলে দেবে—যাতে শুধু ফোন করা বা টেক্সট মেসেজ পাঠানো যাবে। এর জন্য এককালীন দিতে হয় ১৫০ ডলার।

এই খরচের কারণেই ডিজিটাল আসক্তি কাটাতে আগ্রহী জেন জ়ি-র সদস্যদের নতুন কোনও অ্যাপের জন্য টাকা দিতে রাজি করানো কঠিন হতে পারে। ওপালের এক কোটি ব্যবহারকারীর প্রায় ৯৫ শতাংশই বিনামূল্যের সংস্করণ ব্যবহার করেন। মুকুডিও তাঁদেরই একজন। সংস্থাটির মোট ব্যবহারকারীর ৭৫ শতাংশ জেন জ়ি-র সদস্য।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর স্পষ্ট কথা, “নিজের জীবনটা ফিরে পাওয়ার জন্য কোনও অ্যাপকে টাকা দিতে আমি রাজি নই।”

আবার কারও কারও ক্ষেত্রে স্রেফ অ্যাপ মুছে ফেললেই কাজ হয়। ২৬ বছরের হান চোই গত বছর সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ মুছে দিয়েছেন, যাতে সন্ধ্যার কুইজের আসর আর শরীরচর্চায় আরও বেশি সময় দিতে পারেন।

চোই বলেন, “আমাদের নিয়ম মেনে চলা থেকে যাঁরা মুনাফা করেন, তাঁদের তৈরি ব্যবস্থাগুলিকেই মানুষ প্রত্যাখ্যান করছেন। অবিরাম স্ক্রল করে নেতিবাচক খবর দেখে যাওয়ার এই ‘ডুমস্ক্রলিং’ অর্থনীতিতে আমাদের অংশ নিতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই।”