শুভ্রাংশু মুখোপাধ্যায় | ডেটলাইন মিউনিখ

ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষার জন্য কত রকমের তথ্যই না মুখস্থ করতে হত! কোন দেশে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়েছে, কে কতগুলো সোনার পদক জিতেছেন, কোন খেলোয়াড় কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন—এসব ছিল জিকে পরীক্ষার পরিচিত প্রশ্ন। কার্ল লুইসের নামটা তখন বেশ গুরুত্ব পেত। পরবর্তী সময়ে সেই তালিকায় যুক্ত হয় মাইকেল ফেলপ্‌সের নাম। বইয়ের পাতায় পড়া এই মানুষগুলোকে ঘিরেই ধীরে ধীরে অলিম্পিক সম্পর্কে আমার কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।

কলকাতায় বেড়ে ওঠার সময় আমাদের খেলাধুলার জগৎটা প্রধানত ক্রিকেটকে ঘিরেই আবর্তিত হত। স্কুলের টিফিনের সময় থেকে পাড়ার আড্ডা, সর্বত্র ক্রিকেটের আলোচনা। অন্যদিকে অলিম্পিক আসত চার বছর অন্তর। তখন দূরদর্শনের পর্দায় দেখা যেত বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের। অনেক খেলার নিয়ম পুরোপুরি না বুঝলেও দেখতে ভালো লাগত। বিশেষ করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নানা দেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে খেলোয়াড়দের মাঠে প্রবেশ করার দৃশ্যটা ছিল বেশ আকর্ষণীয়।

১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। সেই অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঙ্গীত রচনায় যুক্ত ছিলেন ভারতের প্রখ্যাত তবলাবাদক উস্তাদ জাকির হুসেন। তাঁর এই আন্তর্জাতিক কাজের কথা জানতে পেরে বেশ গর্ব হয়েছিল। অলিম্পিক যে শুধুমাত্র খেলাধুলার প্রতিযোগিতা নয়, সংস্কৃতি ও সঙ্গীতেরও এক আন্তর্জাতিক মিলনমেলা, সেটা তখন আরও ভালোভাবে বুঝতে শুরু করি।

সেই আটলান্টা অলিম্পিকেই লিয়েন্ডার পেজ টেনিসে ব্রোঞ্জ পদক জিতে ভারতকে গর্বিত করেছিলেন। ১৯৫২ সালে খাশাবা যাদবের পর সেটিই ছিল ভারতের প্রথম ব্যক্তিগত অলিম্পিক পদক। পরবর্তী সময়ে মাইকেল ফেলপ্‌সের সাঁতারে অবিশ্বাস্য সাফল্য কিংবা কার্ল লুইসের পুরনো কীর্তির গল্প অলিম্পিকের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।

তখন অবশ্য কখনও ভাবিনি, একদিন এমন একটি শহরে থাকব, যেখানে অলিম্পিকের ইতিহাসের সঙ্গে আমার দৈনন্দিন জীবনের এত কাছাকাছি সম্পর্ক তৈরি হবে।

২০১৫ সালে কর্মসূত্রে জার্মানির মিউনিখে আসি। দেখতে দেখতে এগারো বছর কেটে গেছে। এখন আমার বাড়ি থেকে মাত্র দশ মিনিটের হাঁটাপথে পৌঁছে যাওয়া যায় অলিম্পিয়াপার্কে। ১৯৭২ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের জন্য নির্মিত এই চত্বর আজও মিউনিখের অন্যতম আকর্ষণ।

এখানে রয়েছে বিখ্যাত অলিম্পিক স্টেডিয়াম, অলিম্পিক টাওয়ার, হ্রদ আর বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর। গ্রীষ্মে মানুষের ভিড়, সঙ্গীতানুষ্ঠান, খেলাধুলা আর শীতকালে সম্পূর্ণ অন্যরকম পরিবেশ। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি পরিচিত অবসরযাপনের জায়গা হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বক্রীড়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।

আর সেই মিউনিখই এবার আবার অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্ন দেখছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির বাডেন-বাডেন শহরে জার্মান অলিম্পিক স্পোর্টস কনফেডারেশন বা DOSB-এর বিশেষ অধিবেশনে মিউনিখকে দেশের আনুষ্ঠানিক অলিম্পিক প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ২০৩৬, ২০৪০ অথবা ২০৪৪ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক আয়োজনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামবে মিউনিখ।

জার্মানির অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে কোলন-রাইন-রুর অঞ্চলকে পিছনে ফেলে ৬৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়েছে মিউনিখ। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে শহরের গণভোটেও অংশগ্রহণকারী ভোটদাতাদের ৬৬.৪ শতাংশ অলিম্পিক আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

তবে জার্মানির প্রার্থী হওয়া মানেই অলিম্পিক আয়োজনের অধিকার পাওয়া নয়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি। ২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ২০৩২ সালে ব্রিসবেনে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হবে। ফলে মিউনিখের সামনে প্রথম সুযোগ ২০৩৬ সাল।

এই নতুন পরিকল্পনার অন্যতম আকর্ষণ হল ১৯৭২ সালের পুরনো অলিম্পিক পরিকাঠামোকে আবার কাজে লাগানো। অলিম্পিয়াপার্ককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রস্তাব রয়েছে। নতুন নির্মাণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব আয়োজনের উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।

মিউনিখের এই পরিকল্পনার কথা শুনলেই আমার মনে পড়ে ১৯৭২ সালের ভারতীয় হকি দলের কথা।

সেই অলিম্পিকে ভারতের একমাত্র পদক এসেছিল পুরুষদের হকি থেকে। হরমীক সিংয়ের নেতৃত্বে ভারতীয় দলে ছিলেন অজিত পাল সিং, অশোক কুমার, বি পি গোবিন্দ ও হরচরণ সিংয়ের মতো খেলোয়াড়রা। সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হলেও ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে হারায় ভারত।

আর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল মিউনিখের অলিম্পিয়াপার্কের হকি মাঠেই!

ভাবলে বেশ অবাক লাগে। কলকাতায় বড় হতে হতে ভারতীয় হকির সোনালি যুগের গল্প পড়েছি। অথচ সেই ইতিহাসেরই একটি অধ্যায় যে শহরে লেখা হয়েছিল, আজ সেখানেই আমার বসবাস। যে মাঠে একদিন ভারতীয় খেলোয়াড়রা অলিম্পিক পদকের জন্য লড়েছিলেন, তার পাশ দিয়েই এখন আমার নিয়মিত যাতায়াত।

তবে ১৯৭২ সালের অলিম্পিকের সঙ্গে এক বেদনাদায়ক ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর অলিম্পিক ভিলেজে প্যালেস্তিনীয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের হামলা ও পরবর্তী পণবন্দি সংকটে ইজরায়েলি দলের ১১ জন সদস্য এবং একজন পশ্চিম জার্মান পুলিশকর্মী প্রাণ হারান। সেই ঘটনা আজও অলিম্পিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়।

নতুন করে অলিম্পিক আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে অবশ্য প্রশ্নও রয়েছে। মিউনিখ এমনিতেই জার্মানির অন্যতম ব্যয়বহুল শহর। বিপুল খরচ, নিরাপত্তা, আবাসন ও পরিবহণ ব্যবস্থার উপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে পুরনো ক্রীড়া পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

আমার কাছে অবশ্য এই অলিম্পিক স্বপ্নের একটা আলাদা ব্যক্তিগত তাৎপর্য রয়েছে।

কলকাতায় ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে অলিম্পিকের আয়োজক শহরগুলোর নাম মুখস্থ করতাম। আটলান্টা, সিউল, বার্সেলোনা কিংবা সিডনি—সবই ছিল অনেক দূরের শহর। টেলিভিশনের পর্দায় তাদের স্টেডিয়াম দেখতাম। বাস্তবে সেখানে বসে খেলা দেখার কথা তখন ভাবিনি।

আজ এমন একটি শহরে থাকি, যেখানে একদিন অলিম্পিক হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আবার হতে পারে। সত্যিই যদি মিউনিখ আবার অলিম্পিক আয়োজনের সুযোগ পায়, তাহলে হয়তো নিজের চোখে সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতে পারব। আর সেখানে কোনও ভারতীয় খেলোয়াড় পদক জিতলে আনন্দটা নিঃসন্দেহে আরও বেশি হবে।

শেষ পর্যন্ত অলিম্পিক মিউনিখে ফিরবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে অলিম্পিয়াপার্কের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, যে স্টেডিয়াম এতদিন শুধুই পুরনো ইতিহাসের স্মারক ছিল, সেখানেই হয়তো আবার নতুন ইতিহাস তৈরি হবে।

আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে কলকাতায় বসে অলিম্পিক দেখা এক বাঙালির নিজের জীবনের ছোট্ট একটা অধ্যায়।