‘সব বিষয়ে রাজনীতি নয়’, বিরোধী দলনেতাকে পরামর্শ অর্থমন্ত্রীর
টাটা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ঘিরে এ বার সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতে জড়ালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। বুধবার রাহুলের অভিযোগ, ‘‘টাটা গোষ্ঠীকে অপরাধমূলক ভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। অথচ কোনও শিল্পপতি একটি কথাও বলার সাহস দেখাচ্ছেন না।’’ এর জবাবে নির্মলার কটাক্ষ, প্রতিটি বিষয়কে রাজনীতির রং দেওয়া বন্ধ করা উচিত রাহুলের। অর্থমন্ত্রীর প্রশ্ন, শিল্পপতিদেরও কি তাঁর সঙ্গে মিলে ‘‘অবিশ্বাস ও বিষাক্ত পরিবেশ’’ ছড়াতে প্ররোচিত করতে চাইছেন বিরোধী দলনেতা?
রাজনীতির রং কেন?
রাহুলকে তাঁর সাংবিধানিক পদটির কথা স্মরণ করিয়ে নির্মলা বলেন, ‘‘আমার পরামর্শ, প্রতিটি বিষয়কে রাজনীতির রং দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। তা ছাড়া, বাণিজ্যিক ও আইনি বিষয়কে এত হালকা ভাবে অপরাধ বলে দাগিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।’’
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘আপনি বারবার ভারতীয় শিল্প ও আমাদের উদ্যোগপতিদের সাফল্যকে খাটো করেছেন। এখন কি আমাদের শিল্পপতিদেরও আপনার সঙ্গে মিলে অবিশ্বাস ও বিষাক্ত পরিবেশ ছড়াতে প্ররোচিত করতে চাইছেন? কয়েক দশক ধরে আপনার দল শ্বাসরোধকারী ‘লাইসেন্স-কোটা রাজ’-এর অধীনে ভারতীয় উদ্যোগপতিদের উদ্যমকে দমিয়ে রেখেছিল এবং কোটি কোটি ভারতীয়কে দারিদ্রের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।’’
মোদী সরকার ভারতীয় শিল্পকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখে বলে দাবি করেন নির্মলা। তাঁর কথায়, ‘‘উদ্যোগের বিকাশ, শিল্পকে সহায়তা এবং বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যেই আমাদের নীতি তৈরি করা হয়েছে।’’
রাহুলের তোপ
২৮ অক্টোবর সমাজমাধ্যম এক্সে রাহুল লিখেছিলেন, ‘‘টাটাকে অপরাধমূলক ভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। অথচ কোনও শিল্পপতি একটি কথাও বলার সাহস দেখাচ্ছেন না। আর কত দিন চুপ করে থাকবেন? যত দিন না ওরা আপনাদেরও মালিক হয়ে বসে? ভারতের শিল্প-বাণিজ্য মোদী ও শাহের খেলার পুতুল নয়। আপনাদের সাহস নেই। আমাদের আছে। এই অপরাধের বিচার আমরা নিশ্চিত করব।’’
জবাবে নির্মলা বলেন, ‘‘আমাদের শিল্পকে সহায়তা করা, কৃষকদের শক্তিশালী করা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার সমান দায়িত্ব রয়েছে রাজনৈতিক দল, নেতা, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলির। তাই নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার পরিবর্তে গঠনমূলক ভাবে অংশ নেওয়া জরুরি।’’
‘সর্বত্র ভূত দেখবেন না’
বিচারব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনেও রাহুলকে আক্রমণ করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ভারতের সংবিধান সমস্ত নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। সেই ন্যায়বিচার রক্ষার দায়িত্ব আমাদের মাননীয় আদালতগুলির। আপনি, আপনার দল এবং আপনার দলের প্রধানমন্ত্রীরা যে অসম্মানজনক ভাবে বিচারব্যবস্থাকে হেয় করেছেন, ইতিহাস তার সাক্ষী। তাই রাহুলজি, সর্বত্র ভূত দেখা বন্ধ করুন।’’
নির্মলার বক্তব্যের পাল্টা জবাবে রাহুল প্রশ্ন তোলেন, ‘‘কোন ‘আইনি ও বাণিজ্যিক বিষয়’-এর জন্য অমিত শাহের বাসভবনে টাটা ট্রাস্টস এবং টাটা সন্সের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকের প্রয়োজন হল?’’
তাঁর আরও প্রশ্ন, ‘‘আপনাদের এক নম্বর সাঙাত কখন এই খেলায় নামবেন? আর টাটার কোন কোন অংশ তাঁর ভাগে পড়বে? সবশেষে বলি, আপনাদের তিন-চার জন ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি ছাড়া ভারতের বাকি সমস্ত ব্যবসায়ী ইতিমধ্যেই আপনাদের সবাইকে ঘৃণা করেন। তাঁদের কোনও প্ররোচনার প্রয়োজন নেই।’’
টাটার অন্দরে ক্ষমতার লড়াই
টাটা গোষ্ঠী বর্তমানে সাম্প্রতিক কালের অন্যতম গুরুতর পরিচালনাগত সংঘাতের মুখোমুখি। টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা এবং গোষ্ঠীর প্রধান হোল্ডিং সংস্থা টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদের মধ্যে বিরোধ ক্রমশ বাড়ছে। দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নই এখন সংঘাতের কেন্দ্রে।
বিরোধ তীব্র হয় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। পাশাপাশি, সংস্থাকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনাও সামনে আসে। নোয়েল টাটা দু’টি সিদ্ধান্তেরই বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি, এই সিদ্ধান্তগুলি টাটা ট্রাস্টসের গৃহীত অবস্থানের পরিপন্থী। পরিচালন পর্ষদের এক্তিয়ার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্য দিকে, টাটা ট্রাস্টসের দুই ট্রাস্টি ভেনু শ্রীনিবাসন এবং বিজয় সিং ট্রাস্টের পরিচালনসংক্রান্ত প্রশ্ন তুলে চ্যারিটি কমিশনারের দ্বারস্থ হন। প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতি বা কোরাম না থাকায় টাটা সন্সের বার্ষিক সাধারণ সভাও স্থগিত হয়ে যায়।
টাটা ট্রাস্টসের হাতে সম্মিলিত ভাবে টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানার সুবাদে গোষ্ঠীর পরিচালনায় ট্রাস্টগুলির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে রতন টাটার মৃত্যুর পরে টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান হন নোয়েল টাটা। তার পর থেকেই ট্রাস্টি নিয়োগ, পরিচালন পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব এবং গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে মতপার্থক্য সামনে এসেছে।
তালিকাভুক্তি নিয়েই মূল সংঘাত
বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয়, টাটা সন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে কি না। ২০২৪ সালের মার্চে সংস্থার পরিচালন পর্ষদ সর্বসম্মত ভাবে শেয়ারবাজারের বাইরে থাকার পক্ষে মত দিয়েছিল। পরে ২০২৫ সালে গৃহীত প্রস্তাবে দু’টি প্রধান টাটা ট্রাস্টও সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাটা সন্সের নিবন্ধন সমর্পণের আবেদন খারিজ করলে বিষয়টি ফের সামনে আসে। টাটা সন্সকে ‘আপার লেয়ার’ বা উচ্চস্তরের ব্যাঙ্কবহির্ভূত আর্থিক সংস্থা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে সংস্থাটির উপর একাধিক নিয়ন্ত্রক বিধান প্রযোজ্য হয়, যার মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
নোয়েল টাটার যুক্তি, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চিঠিতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়াকে স্পষ্ট ভাবে বাধ্যতামূলক বলা হয়নি। তাই সংস্থার বিকল্প সমাধানের পথ খতিয়ে দেখা উচিত।
চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ নিয়েও প্রশ্ন
চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ ঘিরেও বিরোধ তৈরি হয়েছে। নোয়েল টাটার নেতৃত্বাধীন টাটা ট্রাস্টস পরিচালন পর্ষদের ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, চেয়ারম্যানের নির্ণায়ক বা ‘কাস্টিং ভোট’ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পুনর্নিয়োগের প্রস্তাবে নোয়েল টাটা বিরোধিতা করলেও ট্রাস্টের আর এক মনোনীত প্রতিনিধি ভেনু শ্রীনিবাসন তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে টাটা গোষ্ঠীর অন্দরের মতবিরোধ এখন শুধু পরিচালনাগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই; তা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।