প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েও শেষ হাসি হাসলেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে চতুর্থ মেয়াদের জন্য জয়ী হলেন বামপন্থী নেতা। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেলেন ৪৮.২১ শতাংশ ভোট। এই জয় শুধু ব্রাজিলের রাজনীতিতেই নয়, লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা।
অথচ চলতি মাসের গোড়ায় প্রথম দফার ভোটে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিওর থেকে পিছিয়ে ছিলেন লুলা। ২০২২ সালে জাইরকে হারিয়েই ক্ষমতায় ফিরেছিলেন তিনি। এবারের প্রথম দফায় ফ্লাভিও পেয়েছিলেন ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট, লুলার ঝুলিতে এসেছিল ৪৫.১৬ শতাংশ। চূড়ান্ত দফায় সেই ব্যবধান উল্টে দিয়ে জয় ছিনিয়ে নিলেন লুলা। ফ্লাভিও অবশ্য এখনও পরাজয় স্বীকার করেননি। নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এই জয় ঐতিহাসিক আরও একটি কারণে। ১৯৮৯ সালে ব্রাজিলে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকে প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা কোনও প্রার্থী চূড়ান্ত দফায় জেতেননি।
লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রবণতারও বিপরীতে গেল ব্রাজিলের এই ফল। ওই অঞ্চলে পরপর সাতটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দক্ষিণপন্থী প্রার্থীদের জয়ের ধারায় ছেদ পড়ল। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়ানোর যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ট্রাম্পের রয়েছে, তাতেও ধাক্কা খেল আমেরিকা।
জয়ের পর লুলার বার্তা, “ব্রাজিল কারও পেছনের উঠোন নয়। আমরা এই দেশ পরিচালনার ধরন বদলাব; সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণ আরও বাড়াব।”
কীভাবে ঘুরল ভোটের অঙ্ক?
১. সংগঠন ও ডিজিটাল প্রচার
প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর লুলার প্রচারশিবির নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যাঁরা ভোট দিতে যাননি, যাঁদের ভোট বাতিল হয়েছিল কিংবা যাঁরা অন্য প্রার্থীদের সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের কাছে পৌঁছনোর উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশে অংশ নেন তরুণ সমর্থকেরা। চূড়ান্ত দফার আগে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে জনসভাও করেন লুলা। এর মধ্যে ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটারসংখ্যার রাজ্য মিনাস জেরাইসের রাজধানী বেলো হরিজন্তে।
ডিজিটাল প্রচারেও নতুন কৌশল নেন লুলা। নিজের মোবাইল ফোন না থাকার কথা প্রচারিত হলেও, অপেক্ষাকৃত তরুণ রাজনীতিকদের পরামর্শে সেলফি ভিডিও রেকর্ড করতে শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি, ‘লুলার বাহিনী’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে যোগ দেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস ওই চ্যানেলের মাধ্যমে সমর্থকদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলেন এবং লুলার পক্ষে প্রচারসামগ্রী ছড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করেন। ব্রাজিলের সংবাদপত্র ‘ফোলিয়া দে সাঁও পাওলো’-র তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত দফার প্রচারে ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে বলসোনারোকে পিছনে ফেলেন লুলা।
জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিও ছিল প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘বোলসা ফামিলিয়া’ নগদ সহায়তা প্রকল্পে অনুদান বাড়ানো এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই টাকা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ ঘোষণা করেন তিনি। পাশাপাশি, বেতন না কমিয়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ কাজের সময় ৪৪ ঘণ্টা থেকে ৪০ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার প্রস্তাবে কংগ্রেসের অনুমোদন আদায় করেন। ১৬ অক্টোবর, চূড়ান্ত দফার ভোটের ন’দিন আগে, সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংশোধনী আনুষ্ঠানিকভাবে জারি হয়।
শেষ পর্যন্ত ভোটদানের হারও বাড়ে। ব্রাজিলের সর্বোচ্চ নির্বাচনী আদালতের তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত দফায় প্রায় ৩০ লক্ষ বেশি মানুষ ভোট দেন। প্রথম দফায় ভোটদানে বিরত থাকার হার ছিল ২১.০৮ শতাংশ, দ্বিতীয় দফায় তা কমে প্রায় ১৯.২ শতাংশে দাঁড়ায়।
এই অতিরিক্ত ভোটারদের অধিকাংশ কাকে সমর্থন করেছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাঁদের সংখ্যা প্রথম দফায় দুই প্রার্থীর মধ্যে থাকা ২২ লক্ষের কিছু বেশি ভোটের ব্যবধানের চেয়েও বেশি।
২. শক্ত ঘাঁটির বাইরেও সমর্থন
ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ন’টি রাজ্যেই জয় পেয়েছেন লুলা। ঐতিহ্যগতভাবে এই অঞ্চল তাঁর শক্ত ঘাঁটি। তবে চূড়ান্ত জয়ের জন্য শুধু পরিচিত সমর্থকদের উপর নির্ভর করলে চলত না। প্রথম দফায় বলসোনারোর পক্ষে থাকা এলাকাগুলিতেও সমর্থন বাড়াতে হয়েছে তাঁকে।
সিএনএন ব্রাজিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৪ অক্টোবরের প্রথম দফায় বলসোনারোকে এগিয়ে রাখা ১৮টি রাজ্যের ২১৩টি পৌর এলাকায় চূড়ান্ত দফায় লুলা এগিয়ে যান। এর মধ্যে মিনাস জেরাইসের ৭৬টি, সাঁও পাওলোর ৩৩টি এবং পারানার ২০টি পৌর এলাকা রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল মিনাস জেরাইসের ফল। ভোটারসংখ্যার বিচারে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই রাজ্যে প্রথম দফায় এগিয়ে ছিলেন বলসোনারো। কিন্তু চূড়ান্ত দফায় সেখানে লুলা পান ৫০.৪৩ শতাংশ ভোট, বলসোনারো ৪৯.৫৭ শতাংশ।
অর্থাৎ, নিজের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রভাবাধীন এলাকাতেও ভোট বাড়াতে পেরেছেন লুলা। তাঁর জয়ের অন্যতম চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে এই ভৌগোলিক বিস্তার।
জয়ের পরেও কঠিন পথ
রক্ষণশীল কংগ্রেস ও অর্থনীতির চাপ
প্রেসিডেন্ট পদে ফিরলেও লুলার সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। তাঁকে এমন এক কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে রক্ষণশীল শক্তিগুলি যথেষ্ট প্রভাবশালী। বলসোনারোর লিবারাল পার্টি ও তার সহযোগীদের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়তে পারেন তিনি।
সরকারি ঋণও বড় উদ্বেগের বিষয়। লুলার বর্তমান মেয়াদে জিডিপির অনুপাতে সরকারি ঋণ ১০ শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি বেড়ে ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে সুদের হার ছিল ১৩.৭৫ শতাংশ। ঋণতথ্য সংস্থা সেরাসার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮ কোটি ৪০ লক্ষ ব্রাজিলীয় নাগরিক এবং ৯৩ লক্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না।
বেকারত্বের হার রেকর্ড নিম্নস্তরে থাকা এবং মজুরি মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়া সত্ত্বেও ঋণের এই সংকট জনজীবনে চাপ তৈরি করছে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি পূরণ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে লুলার বড় পরীক্ষা।
নির্বাচনী ফল ঘিরে বিতর্ক
ভোটগ্রহণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ফ্লাভিও। পরিবহণ ও আবহাওয়াজনিত সমস্যার কথা জানিয়ে দুই প্রার্থীর প্রচারশিবিরই ভোটের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই আবেদনের পর ব্রাজিলের সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি ক্রিশ্চিয়ানো জানিন ভোটগ্রহণের সময় দু’ঘণ্টা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। তবে ভোট শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়ের ঠিক আগে নির্দেশ জারি হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ততক্ষণে কিছু ভোটকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পরে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ নির্বাচনী আদালত স্পষ্ট করে জানায়, সময় বাড়ানোর নির্দেশ কেবল তখনও খোলা থাকা ভোটকেন্দ্রগুলির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এই বিতর্ক বিচারবিভাগের ক্ষমতা নিয়েও পুরনো প্রশ্নকে সামনে এনেছে। নির্বাচন এবং অনলাইনে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের জন্য বিচারবিভাগ সমালোচিত হয়েছে। অন্য দিকে, বিচারবিভাগের বক্তব্য, গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই এমন পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ধাক্কা
ফ্লাভিও জিতলে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলে ট্রাম্প একজন গুরুত্বপূর্ণ মিত্র পেতেন। বিশেষ করে, এই অঞ্চলের দক্ষিণপন্থী সরকারগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ করার যে চেষ্টা ওয়াশিংটন চালাচ্ছে, তাতে তা বড় সাফল্য হতে পারত।
ফ্লাভিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন মাদকচক্রবিরোধী জোট ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’-এ যোগ দেবেন। ব্রাজিলের অপরাধী গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথাও বলেছিলেন তিনি।
কিন্তু ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগের কারণে এই জোটে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন লুলা।
ট্রাম্পের সঙ্গে লুলার সংঘাতও নতুন নয়। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে লুলা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে ২০২৫ সালে ব্রাজিলের পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বলসোনারোর অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলার বিচারপ্রক্রিয়া তদারক করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসের উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন।
এই মার্কিন হস্তক্ষেপকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করে তোলেন লুলা। ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব এবং বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা দেন তিনি। ট্রাম্পের ভূমিকা ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করেছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ফলাফলে স্পষ্ট, ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ব্রাজিলকে কাছে পাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ধাক্কা খেল।
পরে অনেক শুল্কই শিথিল করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও লুলার পুনর্নির্বাচনের অর্থ, লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার সামরিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়, এমন একটি সরকারের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে ওয়াশিংটনকে।
লুলার এই জয় তাই শুধু এক নেতার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়। ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার প্রভাব—দুই ক্ষেত্রেই নতুন করে হিসাব কষতে হবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে।