কেন্দ্রীয় সরকারের বিতর্কিত ‘ডিজিটাল ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা আইন ২০২৩’ (DPDP Act)-এর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিধানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলো ভারতের ২১টি শীর্ষস্থানীয় নিউজ পাবলিশিং বা সংবাদ প্রকাশনা সংস্থা। নেটওয়ার্ক১৮, এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস ইন্টারনেটের মতো প্রথম সারির ডিজিটাল ও প্রিন্ট সংবাদ মাধ্যমগুলি যৌথভাবে ‘ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (DNPA)-এর মাধ্যমে গত ৬ অক্টোবর এই রিট পিটিশনটি দায়ের করে, যা মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানির জন্য উঠতে চলেছে। সংবাদ মাধ্যমগুলির স্পষ্ট দাবি, বর্তমান বয়ানে আইনটি কার্যকর হলে তা দেশের স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল ভিতকে দুর্বল করে দেবে এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে বড়সড় বাধার সৃষ্টি করবে।
সংবাদ সংস্থাগুলির মূল আইনি আপত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আইনের ৫, ৬ এবং ১২ নম্বর ধারা। ৫ ও ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করার পূর্বে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিস দিতে হবে এবং তাঁর লিখিত বা স্পষ্ট সম্মতি (Consent) গ্রহণ করতে হবে। মিডিয়া হাউসগুলির যুক্তি, কোনো রাজনৈতিক দুর্নীতি, করপোরেট কারচুপি বা সামাজিক অপরাধমূলক ঘটনার সত্যতা উন্মোচনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সময় যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে আগাম নোটিস পাঠাতে হয় বা তাঁর সম্মতি নিতে হয়, তবে সেই সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে। এর ফলে অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যেতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ধ্বংস করে ফেলা হতে পারে অথবা সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মুখ বন্ধ করিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এছাড়া, আইনের ১২ নম্বর ধারায় নাগরিকদের দেওয়া ‘তথ্য সংশোধন ও মুছে ফেলার অধিকার’ (Right to Erasure) নিয়েও তীব্র আপত্তি জানিয়েছে মিডিয়া জোটটি। তাঁদের মতে, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা নিজেদের অতীত অপকর্ম সংক্রান্ত সত্য প্রকাশিত প্রতিবেদন বা অনুসন্ধানমূলক খবর ইন্টারনেট ও ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে মুছে ফেলার জন্য এই আইনি অধিকারকে অসদ্ব্যবহার করতে পারেন। আইনে সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থে প্রকাশিত খবরের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট ছাড় বা বিশেষ সুরক্ষাকবচ (Explicit Exemption) রাখা হয়নি, যা ভবিষ্যৎ নিউজ রুমগুলির জন্য চরম আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
একই সাথে, পিটিশনে সরকারের তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা সংক্রান্ত বিধানগুলি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত খবরের ক্ষেত্রে সরকার বা তদন্তকারী সংস্থা যদি ডেটা প্রসেসিং সংস্থার কাছ থেকে তথ্য দাবি করে, তবে সাংবাদিকদের গোপনীয় সূত্রের (Confidential Sources) পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার বিশাল ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো সাধারণ নাগরিক বা হুইসেলব্লোয়ার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কাছে মুখ খুলতে ভয় পাবেন।
উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসে কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে বৈঠকের সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও আইনে কোনো লিখিত ছাড় না থাকায় অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে মিডিয়া হাউসগুলি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে কেন্দ্র সরকার পর্যায়ক্রমে এই আইন বাস্তবায়নের বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যার অধীনে এই বিতর্কিত ৫, ৬ ও ১২ ধারাগুলি আগামী ২০২৭ সালের ১৩ মে থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে চলেছে। আইনটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগেই সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে, সেদিকেই এখন নজর পুরো দেশের।