বাংলাস্ফিয়ার: বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পাটনার বাপু সভাগারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। শ্রীকৃষ্ণ সিংহ ‘শ্রীবাবু’ নামেই পরিচিত। সেই মঞ্চ থেকে বিজেপি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস এবং ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান খাড়গে। ভোটাধিকার ও সংবিধান রক্ষায় বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

খাড়গের অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ভোটার তালিকায় কারচুপি করছে এবং নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করছে। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী সমর্থকদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, “মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা না হলে দেশ দাসত্বের দিকে এগিয়ে যাবে। এ হল দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম।” নিজেদের অধিকার ও সংবিধান রক্ষায় বিহারের মানুষকে পথে নামার আহ্বান জানান তিনি।

খাড়গের অভিযোগ, বিহার, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও পশ্চিমবঙ্গে ‘ভোট চুরি’ করে সরকার গঠন করা হয়েছে। এই সরকারগুলিকে তিনি ‘চোরি কি সরকার’, অর্থাৎ চুরি করে গঠিত সরকার বলে অভিহিত করেন। গত দু’বছরে বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলিকে বরখাস্ত করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ২০২৩ সালের একটি আইন বাতিলের দাবি তোলেন। তাঁর অভিযোগ, ওই আইন নির্বাচন কমিশনারদের ব্যাপক আইনি দায়মুক্তি দিয়েছে।

বক্তৃতার মাঝখানে শ্রোতাদের মধ্যে একজন বাধা দিয়ে বলেন, “মোদী নেহি যায়েগা”—মোদী যাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে খাড়গে পাল্টা বলেন, “মোদী কা বাপ ভি যায়েগা”—মোদীর বাপও যাবে। এরপর উপস্থিত লোকজনকে শান্ত হতে বলেন তিনি। খবর অনুযায়ী, কংগ্রেস কর্মীরা ওই ব্যক্তিকে মারধর করে সভাস্থল থেকে বের করে দেন।

এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ২৫ অক্টোবর সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে আজ পাটনায় মোদীজির বাবাকে নিয়ে অভদ্র মন্তব্য করে শালীনতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছেন।”

শাহের বক্তব্য, “এই প্রথম নয় যে কংগ্রেস মোদীজি বা তাঁর পরিবারকে কটূক্তি করল। কখনও তাঁর শ্রদ্ধেয় মাকে নিয়ে কটূক্তি করেছে, কখনও তাঁকে ‘মৃত্যুর সওদাগর’ বলেছে, আবার কখনও ‘চাওয়ালা’ বলে তাঁর দারিদ্র্যকে উপহাস করেছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস প্রতিদিন অভদ্রতার সীমা অতিক্রম করছে।”

তিনি আরও লেখেন, “গত ১২ বছর ধরে ধারাবাহিক নির্বাচনী পরাজয়ে কংগ্রেসের হতাশা ও নিরাশা এতটাই বেড়েছে যে এখন তাদের কোনও নীতি নেই, কোনও বিষয় নেই; আছে শুধু গালিগালাজের রাজনীতি। মানুষের মধ্যে জনভিত্তি হারানো কংগ্রেস এখন নিজের কর্মীদের মধ্যেও সমর্থন হারাচ্ছে। যখনই ওরা মোদীজি বা তাঁর পরিবারকে নিয়ে ঘৃণ্য মন্তব্য করেছে, তখনই মানুষ কংগ্রেসকে কড়া জবাব দিয়েছে।”

মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রতিবাদে পুলিশি দমনপীড়নের কয়েক দিন পরেই এই বাক্‌বিতণ্ডা ঘটল।

ওই অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিহার কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও সামনে আসে। বাপু সভাগারের বাইরে দলের কর্মীরা বিহার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রাজেশ রাম এবং রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কৃষ্ণ আল্লাভারুকে সরানোর দাবিতে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের হাতে থাকা ব্যানারে ওই দুই নেতাকে ‘বিজেপির এজেন্ট’ বলা হয়। দাবি ওঠে, “ওঁদের সরাও, কংগ্রেস বাঁচাও।”

নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে খাড়গে বলেন, ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ এবং এক মহিলা আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে কমিশনের দুই সদস্য দশ মাসে জ্ঞানেশ কুমারকে ১৪ বার চিঠি লিখেছেন। খাড়গের অভিযোগ, ওই মহিলা আধিকারিক নির্বাচনী সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং বুথ লেভেল অফিসারদের ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কেরলে কর্মরত থাকাকালীন জ্ঞানেশ কুমার এক মুখ্যসচিবকে পদত্যাগ করে বিজেপির টিকিটে নির্বাচনে লড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

খাড়গের মন্তব্যের জবাবে বিজেপির তরফেও সমাজমাধ্যমে তীব্র আক্রমণ করা হয়। দলের বক্তব্য, “একসময় যে ভাষাকে গুন্ডা-মস্তানদের ভাষা বলে মনে করা হত, আজ কংগ্রেস সভাপতি সেই ভাষাই ব্যবহার করছেন। তাঁদের যুবরাজও একই হতাশা থেকে কখনও রাস্তায় মহিলা পুলিশকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, কখনও নিজের দলের নেতাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করেন। তাঁদের গোটা কাজকর্মেই মাফিয়াসুলভ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একে রাজনৈতিক দলের চেয়ে মাফিয়া চক্র বলেই বেশি মনে হয়।”

বিজেপির ওই পোস্টে আরও বলা হয়, “খাড়গেজির বক্তব্যে যে স্বপ্নের কথা উঠে এসেছে, তা পূরণ করতে তৎকালীন কংগ্রেস সভানেত্রী দশ বছর ধরে সব কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসই ক্ষমতা থেকে ছিটকে যায়। আজ তাঁর ছেলে সেই স্বপ্নপূরণের জন্য কখনও ভিয়েতনাম, কখনও কলম্বিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেশের মানুষ আপনাদের এই স্বপ্ন কোনও দিন পূরণ হতে দেবেন না।”

খাড়গে জানান, ইন্ডিয়া জোট রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে একগুচ্ছ দাবি পেশ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ২০২৩ সালের আইন প্রত্যাহার, এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করা, বেআইনিভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা ভোটারদের নাম ফিরিয়ে আনা এবং সমস্ত নির্বাচনে কাগজের ব্যালট ব্যবহারের ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়া।

বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে জোট করার জন্য বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারকেও আক্রমণ করেন খাড়গে। তিনি বলেন, “নীতীশ কুমার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আদর্শ থেকে উঠে এসেছিলেন। কী এমন বাধ্যবাধকতা তৈরি হল যে তিনি বিজেপি ও আরএসএসের কোলে গিয়ে পড়লেন, তা আমি বুঝতে পারছি না।”

খাড়গের মন্তব্যের সমালোচনা করে নিতিন নবীন সমাজমাধ্যমে লেখেন, “আজ পাটনায় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজির প্রতি যে ধরনের অমর্যাদাকর ও অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা কংগ্রেসের আদর্শগত দেউলিয়াপনাই প্রকাশ করে।”

তাঁর বক্তব্য, “রাজনৈতিক বিরোধিতারও একটা মর্যাদা আছে। কিন্তু প্রকাশ্য মঞ্চের বক্তৃতায় প্রয়াত পরিজনদের টেনে আনাই এখন রাহুল গান্ধী এবং সমগ্র বিরোধী পক্ষের প্রকৃত ‘সংস্কার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি খাড়গেজির ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়; গোটা কংগ্রেসের শিষ্টাচারহীন মানসিকতারই প্রকাশ।”

তিনি আরও লেখেন, “দেশের উন্নয়ন, নীতি ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক করার মতো কোনও সুনির্দিষ্ট বিষয় যখন বিরোধীদের হাতে থাকে না, তখন তারা এই ধরনের হতাশা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের আশ্রয় নেয়। দেশের মানুষ এই অমর্যাদাকর রাজনীতি ভালই দেখছেন এবং সময় এলে তার কড়া জবাব দেবেন।”

আরএসএসকে আক্রমণ করতে গিয়ে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ সিংহের অবস্থানের কথা তুলে ধরেন খাড়গে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাধা সত্ত্বেও ১৯৫৩ সালে দেওঘরের বৈদ্যনাথ ধাম মন্দিরে দলিতদের প্রবেশের ব্যবস্থা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ সিংহ। দেওঘর তখন অবিভক্ত বিহারের অংশ ছিল; এখন তা ঝাড়খণ্ডে।

উত্তরাখণ্ডের হলদোয়ানির রামলীলা ময়দানে তাঁর সভার পর কথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ ঘিরে বিতর্কের প্রসঙ্গও তোলেন খাড়গে। গত ৮ অগস্ট সেখানে একটি জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। কংগ্রেসের অভিযোগ, দলিত নেতা খাড়গের সভার পর ওই আচার পালন আসলে তাঁর প্রতি জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের প্রকাশ। অন্যদিকে, যে সংগঠন ওই আচার পালন করেছিল, তাদের বক্তব্য ছিল, ময়দানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতেই ওই আয়োজন। বিজেপি ওই সংগঠন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ঘটনার সঙ্গে কোনও যোগ থাকার কথা অস্বীকার করেছিল।

খাড়গে বলেন, বিজেপি নেতা জে পি নড্ডা সংসদে ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই তদন্ত আদৌ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ওই ঘটনা সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য না করায় মোদীরও সমালোচনা করেন কংগ্রেস সভাপতি। উত্তরাখণ্ড সফরের সময় করা মন্তব্যের জেরে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।

মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ কার্যকর করতে কেন নির্বাচনী কেন্দ্রের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন খাড়গে। মহিলা সংরক্ষণ আইন প্রণয়নের দাবিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব দেন কংগ্রেস নেতৃত্বকে, বিশেষ করে সনিয়া গান্ধীকে।

আগামী ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে নির্ধারিত সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য সমর্থকদের আহ্বান জানান খাড়গে। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ নিয়ে কংগ্রেসের আন্দোলন চলবে। তিনি বলেন, “সত্যের কণ্ঠস্বর আর দমিয়ে রাখা যাবে না। মানুষের অধিকার এভাবে মুছে দেওয়া যায় না।” ইন্ডিয়া জোট এবং কংগ্রেসের এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।