বাংলাস্ফিয়ার: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের মন্তব্য ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রবিবার পাটনার একটি অনুষ্ঠানে এক শ্রোতার কথার জবাবে খাড়গে বলেন, ‘মোদি কা বাপ ভি জায়েগা।’ বিজেপি এই মন্তব্যকে প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত বাবার প্রতি অপমান বলে অভিযোগ করে সোমবার, ২৬ অক্টোবর দেশজুড়ে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে। কংগ্রেস পাল্টা দাবি করেছে, মন্তব্যটির অর্থ ও প্রেক্ষাপট বিকৃত করা হচ্ছে।

বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পাটনার বাপু সভাগারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন খাড়গে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এবং কথিত ভোট চুরি নিয়ে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি। সেই সময় দর্শকাসন থেকে শোনা যায়, মোদি যাবেন না। উত্তেজিত খাড়গে ওই মন্তব্যের জবাব দেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সভাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীন ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে সাংগঠনিক বৈঠকের পর প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। রাজ্য সদরগুলিতে বিক্ষোভের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। শাহের অভিযোগ, বারবার নির্বাচনী পরাজয়ে হতাশ কংগ্রেস নীতিগত বিতর্কের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ নিয়েছে। তাঁর দাবি, অতীতেও মোদির মা এবং তাঁর সামাজিক পটভূমি নিয়ে কংগ্রেস নেতারা অপমানজনক কথা বলেছেন।

নিতিন নবীন বলেন, রাজনৈতিক বিরোধিতারও শালীনতা থাকা প্রয়োজন; প্রয়াত পরিজনদের বক্তৃতায় টেনে আনা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ-সহ একাধিক বিজেপি নেতা মন্তব্যটির নিন্দা করেছেন। খাড়গে ও কংগ্রেস নেতৃত্বের ক্ষমা চাওয়ার দাবিও উঠেছে। এনডিএর শরিক জেডিইউ এবং লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) একইভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। ঘটনায় পাটনার কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

কংগ্রেসের পক্ষে পবন খেরা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, খাড়গের নিশানা ছিলেন মোদির আদর্শগত অভিভাবক আরএসএস এবং মোহন ভাগবত। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যকে অপমান করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। খেরার অভিযোগ, প্রবীণ দলিত নেতা খাড়গেকে বারবার অসম্মান করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তিনি উত্তরাখণ্ডে খাড়গের সভার পর তথাকথিত শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান ঘিরে আগের বিতর্কের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি সেই অপমানের প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে।

তবে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন সভায় বাধা দেওয়া ব্যক্তি নিজেই। ছপরার বাসিন্দা সন্তোষ কুমার জানিয়েছেন, তিনি বিজেপির সমর্থক নন, কংগ্রেসের নিবেদিত কর্মী। তাঁর দাবি, কংগ্রেস বড় ধরনের আন্দোলন বা বিদ্রোহ গড়ে না তুললে মোদিকে সরানো যাবে না—এই কথাই বলতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে ভুল বোঝা হয়। তাঁর অভিযোগ, কয়েকজন কংগ্রেস কর্মী তাঁকে বিজেপি সমর্থক ভেবে মারধর করেন এবং বাইরে বার করে দেন। ফলে খেরার বর্ণনার সঙ্গে সন্তোষের নিজের পরিচয় ও ঘটনার ব্যাখ্যার অমিলও সামনে এসেছে।

খাড়গের মূল বক্তৃতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভোটাধিকার রক্ষা। তাঁর অভিযোগ, এসআইআরের মাধ্যমে বিরোধী সমর্থকদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ভোট চুরি করে সরকার গঠনের অভিযোগও তোলেন তিনি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে খাড়গে এই আন্দোলনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম হিসেবে বর্ণনা করেন। এসআইআর বন্ধ করা, বেআইনিভাবে বাদ পড়া ভোটারদের নাম ফেরানো এবং ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালট পেপারে নির্বাচন করার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

আগামী ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে ভোট চুরির অভিযোগের বিরুদ্ধে দলের সমাবেশে যোগ দেওয়ার আবেদনও জানান খাড়গে। ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের প্রচারের মধ্যেই তাঁর মন্তব্য বিজেপিকে নতুন প্রতিবাদের বিষয় এনে দিয়েছে। একদিকে ব্যক্তিগত অপমানের অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামার প্রস্তুতি, অন্যদিকে বক্তব্যের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়ে দলীয় সভাপতিকে রক্ষার চেষ্টা—এই দুই অবস্থানেই আপাতত অনড় দুই শিবির।