আইজেনকট এবং নেতানিয়াহু—দু’জনের জোটই অবশ্য আরবদের নেতৃত্বাধীন দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উপর নির্ভর করতে অনিচ্ছুক। ইজরায়েলের নীতির সমালোচক এই দুই গোষ্ঠীই এখন সরকার গঠনের নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে, আরব দলগুলির কাছে এমন সমঝোতার অর্থ হবে এমন একটি সরকারকে সমর্থন করা, যার ইজরায়েলের যুদ্ধগুলি বন্ধ করার কিংবা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণে রাশ টানার সম্ভাবনা কম।

তা হলে নির্বাচনের পরে ইজরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দর-কষাকষি কোন দিকে এগোতে পারে? সামনে রয়েছে তিনটি সম্ভাবনা।

প্রথমে দেখা যাক, কার অবস্থান কোথায়

ইজরায়েলের ১২০ সদস্যের সংসদ নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। নেতানিয়াহু বা আইজেনকট—কারও জোটই সেই সংখ্যা পায়নি।

নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলির জোট জিতেছে ৫৩টি আসনে। অন্য দিকে, আইজেনকটের মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টি এবং বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী ও মধ্য-বাম দলকে নিয়ে গঠিত, অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।

কিন্তু আরব ভোটারদের ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যাওয়ায় আরবদের নেতৃত্বাধীন দুই জোট মিলিয়ে অভূতপূর্ব ভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে। ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আম পার্টি জিতেছে আটটি আসনে। হাদাশ, তা’আল ও বালাদ দলকে নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি আসন।

আইজেনকট যদি জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম—দুই পক্ষের সমর্থনই গ্রহণ করেন, তা হলে তাঁর পিছনে থাকবেন ৬৭ জন সাংসদ। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১-এর সীমা পেরিয়ে যাবেন তিনি।

এ দিকে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শরিক, অতি-গোঁড়া ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরা জুডাইজম বা ইউটিজে রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগের কাছে প্রধানমন্ত্রী পদে কোনও প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে অস্বীকার করেছে। ফলে নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশ করেছেন মাত্র ৪৬ জন সাংসদ।

বুধবার সংসদীয় নির্বাচনের প্রত্যয়িত ফলাফলকে আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলক বলে গ্রহণ করেছেন হারজগ। আরব ভোটাররা ভোট চুরি করেছেন বলে নেতানিয়াহুর শিবির যে অভিযোগ তুলেছিল, তা প্রমাণহীন বলে খারিজ করেছেন তিনি। এর পরে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন রাষ্ট্রপতি। যাঁর পক্ষে সরকার গঠনের উপযোগী জোট তৈরি করা সবচেয়ে সম্ভব বলে তাঁর মনে হবে, সেই সাংসদকেই তিনি সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। রবিবারের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন হারজগ।

দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রার্থী জোট গড়ার জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ আইজেনকটের নাম সুপারিশ করেছেন মানেই যে তাঁরা সংসদের আস্থাভোটেও তাঁকে সমর্থন করবেন, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।

আইজেনকট ও তাঁর জোট কী ভাবে সরকার গঠনের দাবি জানাতে পারে?

প্রথম সম্ভাবনা: আরবপ্রধান দলগুলির সঙ্গে সমঝোতা

আরবপ্রধান জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আমের বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারে। উভয় পক্ষই পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য আইজেনকটের নাম সুপারিশ করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সংসদের আস্থাভোটেও তারা অবশ্যই তাঁকে সমর্থন করবে।

রা’আম সরকারে যোগ দিতে রাজি। অন্য দিকে, জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, ইজরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার শর্তে তারা বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী।

অঙ্কের হিসাবে, এই দলগুলির ১৯টি আসন যোগ হলে আইজেনকট শিবিরের শক্তি দাঁড়াবে ৬৭। কিন্তু অভিন্ন মূল্যবোধের অভাবের কথা বলে আইজেনকট দীর্ঘদিন ধরেই আরব দলগুলির সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে এসেছেন।

৩১ অক্টোবরের একটি বিবৃতিতে সম্ভাব্য সরকারের জন্য চারটি শর্ত ফের তুলে ধরেন তিনি। ইজরায়েলকে একটি ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদার এবং সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করতে হবে; স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে চলতে হবে; সমস্ত নাগরিককে সামরিক, জাতীয় অথবা অসামরিক সেবায় অংশ নিতে হবে; এবং গাজায় হামাসের সামরিক শক্তি ও শাসনক্ষমতা ভেঙে দিতে হবে।

আইজেনকট জানিয়েছেন, যে কোনও নির্বাচিত সাংসদ এই নীতিগুলি মেনে নিলে তাঁর সরকারে যোগ দিতে পারেন। কিন্তু এই শর্তগুলিই আরবপ্রধান দলগুলির সঙ্গে আলোচনা জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষত ইজরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্রসত্তা এবং প্যালেস্টাইন সংঘাতের প্রশ্নে মতপার্থক্য গভীর।

আরব দলগুলির সঙ্গে সমঝোতা নেতানিয়াহু-বিরোধী শিবিরের অন্য নেতা, যেমন নাফতালি বেনেট এবং আভিগদর লিবারম্যানের পক্ষেও সমস্যার হতে পারে। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে তাঁরা আরব দলগুলির উপর নির্ভরশীল সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আগেই ব্যাখ্যা করেছে, ইজরায়েলের শাসক জোটে আরব দলগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রতিরোধ থাকলেও, এ বার সেই দলগুলিই সরকার গঠনের সম্ভাব্য নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা: অতি-গোঁড়া হারেদি ইহুদিদের সঙ্গে সমঝোতা

বিকল্প হিসেবে আইজেনকট অতি-গোঁড়া ইহুদি দল ইউটিজে-র সমর্থন চাইতে পারেন। দলটি দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর শরিক। কিন্তু আদালতের হস্তক্ষেপের পরে হারেদি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি বহাল রাখতে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির ব্যর্থতায় তারা ক্ষুব্ধ।

২৯ অক্টোবর চ্যানেল ১২-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতির প্রশ্নে ছাড় পাওয়ার বিনিময়ে আইজেনকটের জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন করার কথা বিবেচনা করেছিলেন ইউটিজে-র নেতারা।

একটি সম্ভাবনা হল, আস্থাভোটে দলটির সাত জন সাংসদ ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আরব দলগুলি এবং অন্য সাংসদেরাও ভোটদানে বিরত থাকলে, আইজেনকটের পক্ষে ৪৮ ভোটের বিপরীতে নেতানিয়াহুর পক্ষে থাকবে ৪৬ ভোট। এর ফলে আরব দলগুলির সমর্থনসূচক ভোট ছাড়াই আইজেনকট সরকার গঠন করতে পারেন।

নেসেটে আস্থাভোটে জয়ী হতে সব সময় ৬১টি ভোট পাওয়ার প্রয়োজন হয় না। যাঁরা ভোট দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই সরকার আস্থা অর্জন করতে পারে। তবে আইন ও বাজেট পাশ করাতে আইজেনকটের নির্ভরযোগ্য সংসদীয় সমর্থন প্রয়োজন হবে। সেই সমর্থনের অভাব সংখ্যালঘু সরকারকে পতনের ঝুঁকির মধ্যে রাখবে।

প্রধান বাধাটি হল বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা। আইজেনকট তাঁর সরকারে যোগ দেওয়ার শর্ত হিসেবে সমস্ত ইজরায়েলির জন্য জাতীয় সেবায় অংশগ্রহণের কথা বলেছেন। অন্য দিকে, ইউটিজে হারেদি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি বজায় রাখতে চায়। ফলে কোনও চুক্তিতে পৌঁছতে হলে একটি পক্ষকে, অথবা উভয় পক্ষকেই, তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অবস্থান থেকে সরে এসে আপস করতে হবে।

তৃতীয় সম্ভাবনা: নেতানিয়াহুকে নিয়েই জাতীয় ঐক্যের সরকার

তৃতীয় বিকল্প হতে পারে এমন একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার, যেখানে নেতানিয়াহু এবং তাঁর কয়েক জন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ একসঙ্গে থাকবেন। সে ক্ষেত্রে পালা করে প্রধানমন্ত্রিত্ব করার ব্যবস্থাও হতে পারে।

বার বার নির্বাচন এড়াতে রাষ্ট্রপতি হারজগ দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের ব্যবস্থার পক্ষে। কিন্তু তা করতে হলে বিরোধী নেতাদের তাঁদের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি—নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো—ত্যাগ করতে হবে।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সহযোগিতার নজির অবশ্য রয়েছে। যেমন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাক্তন প্রধান তথা রাজনীতিক বেনি গানৎস এবং আইজেনকট নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন সরকারে যোগ দিয়েছিলেন।

তবে ২০২০ সালে নেতানিয়াহু ও গানৎসের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির যে ব্যবস্থা হয়েছিল, গানৎসের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পালা আসার আগেই তা ভেঙে পড়ে।

আইজেনকট অবশ্য বার বার জানিয়েছেন, তিনি নেতানিয়াহুর অধীনে সরকারে থাকবেন না। বিরোধী শিবিরের নির্বাচনী প্রচারেরও মূল সুর ছিল প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা থেকে সরানো। ফলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গড়তে হলে রাজনৈতিক অবস্থানে বড়সড় পরিবর্তন আনতে হবে। যদিও কোনও বড় নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে এই হিসাব বদলে যেতে পারে।

দীর্ঘ অচলাবস্থায় কী ভাবে লাভবান হতে পারেন নেতানিয়াহু

৬৭ জন সাংসদ তাঁর নাম সুপারিশ করলেও, সেই সুপারিশকে কার্যকর শাসক জোটে পরিণত করাই আইজেনকটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সম্ভাব্য সহযোগীদের মধ্যে মতাদর্শগত বিভেদ অত্যন্ত গভীর।

ইজরায়েলের মৌলিক আইন অনুযায়ী, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী সরকার নিজের কাজ চালিয়ে যায়। ফলে আইজেনকট সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেও নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী পদে থেকে যেতে পারেন।

রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি যদি ২৮ দিনের মধ্যে সরকার গড়তে ব্যর্থ হন—যে সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে—তা হলে হারজগ অন্য কোনও সাংসদকে ২৮ দিন সময় দিতে পারেন। অথবা নেসেটকে জানাতে পারেন যে সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে না।

এর পরবর্তী পর্যায়ে, অন্তত ৬১ জন সাংসদের সমর্থনপ্রাপ্ত কোনও প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য শেষ বার ১৪ দিনের সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানাতে পারেন সাংসদেরা। তাতেও ব্যর্থ হলে নতুন করে নির্বাচন হবে।

এই ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে নেতানিয়াহু আগেও লাভবান হয়েছেন। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইজরায়েলে বার বার নির্বাচন হলেও স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গড়ে ওঠেনি। সেই সময়ে তিনি একের পর এক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ অচলাবস্থার ফলে টেকসই জোট গড়তে না পেরেও প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকতে পেরেছিলেন তিনি।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনী রায় তাঁকে আবার সেই সুযোগ করে দিতে পারে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আগেই ব্যাখ্যা করেছে, ইজরায়েলের ভোটাররা নেতানিয়াহুর জোটকে দুর্বল করেছেন, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বকে চূড়ান্ত ভাবে প্রত্যাখ্যান করেননি। তাঁর বৃহত্তর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, ২৭টি আসন জিতে লিকুদই হয়েছে একক বৃহত্তম দল।

নতুন নির্বাচন হলে নেতানিয়াহু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার আরও একটি সুযোগ পেতে পারেন। যদিও পরের ফল তাঁর পক্ষে বেশি অনুকূল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে তাৎক্ষণিক ভাবে নতুন সরকার গঠনের ব্যর্থতা তাঁকে নতুন সংসদীয় জনাদেশ ছাড়াই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আরও কিছু দিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দেবে।