বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের আশঙ্কা নিয়ে অনেকেই ভাবতে শুরু করেন। যাঁরা দিব্যি সুস্থ বোধ করেন, কোনও দিন হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়নি, তাঁদের মনেও প্রশ্ন জাগে, রোজ কোনও ওষুধ খেলে কি ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি কমবে?

অনলাইন প্রশ্নোত্তর মঞ্চ কোয়ারাতেও এক জন জানতে চেয়েছেন, চিকিৎসকের বিচারে সুস্থ কোনও ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি যদি অ্যাসপিরিন ও স্ট্যাটিন খান, তা হলে কি তাঁর হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমবে? হয়তো আয়ুও বাড়বে? প্রথম বার হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঠেকাতে এই দুই ওষুধের ভূমিকা নিয়ে একটি সংবাদমাধ্যম কথা বলেছে আইএসআইসি মাল্টিস্পেশ্যালিটি হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের অধিকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ডা. অসীম ঢলের সঙ্গে।

সুস্থ মানুষের বয়স ষাট পেরোলেই কি ওষুধ দরকার?

ডা. ঢল বলেন, “ষাট পেরোলেই যে অ্যাসপিরিন বা স্ট্যাটিন খেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। বয়সের পাশাপাশি হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির রোগের সামগ্রিক ঝুঁকি বিচার করে এই ওষুধ দেওয়া হয়।”

যাঁর আগে কখনও হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়নি, তাঁকে ষাটের পর শুধুমাত্র প্রথম বার তা ঠেকানোর জন্য সাধারণত অ্যাসপিরিন খাওয়া শুরু করতে বলা হয় না। স্ট্যাটিনের ক্ষেত্রে অবশ্য হিসেবটা আলাদা। ডা. ঢলের কথায়, “আগে হৃদ্‌যন্ত্র বা রক্তনালির রোগ হয়নি, এমন কারও ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে সেই রোগের ঝুঁকি যথেষ্ট বেশি বলে মনে হলে স্ট্যাটিন দেওয়া যেতে পারে।”

স্ট্যাটিনের প্রয়োজন চিকিৎসক কী ভাবে বোঝেন?

ডা. ঢল বলেন, “চিকিৎসকেরা কোলেস্টেরলের মাত্রার পাশাপাশি দেখেন, সব মিলিয়ে ওই ব্যক্তির হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির রোগ হওয়ার ঝুঁকি কতটা।” রক্তচাপ কত, ডায়াবিটিস বা কিডনির অসুখ আছে কি না, তিনি ধূমপান করেন কি না, পরিবারে কারও অল্প বয়সে হৃদ্‌রোগ হয়েছিল কি না, এ সবই বিবেচনায় আসে। সেই সঙ্গে দেখা হয় রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও অন্যান্য লিপিডের মাত্রা।

তাঁর কথায়, “ঝুঁকি আরও ভাল করে বুঝতে সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় লিপোপ্রোটিন (এ) এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে অ্যাপোলিপোপ্রোটিন বি-র মাত্রাও বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।” কারও কারও ক্ষেত্রে ‘করোনারি আর্টারি ক্যালসিয়াম স্ক্যান’ করে হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিতে জমে থাকা প্লাক সম্পর্কেও বাড়তি তথ্য পাওয়া যায়।

বয়স্কদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ঝুঁকির এই হিসেবের পাশাপাশি চিকিৎসক দেখেন, মানুষটির সামগ্রিক স্বাস্থ্য কেমন, শরীর কতটা দুর্বল, তিনি আর কী কী ওষুধ খান। সম্ভাব্য আয়ু এবং চিকিৎসা নিয়ে তাঁর নিজের পছন্দও গুরুত্ব পায়।

ষাটের পর রোজ অ্যাসপিরিন খাওয়ায় ঝুঁকি কোথায়?

অ্যাসপিরিন রক্তের অণুচক্রিকাগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে যেতে বাধা দেয়। তাতে রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কা কমে। কিন্তু এই একই কারণে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও বাড়ে। বয়স্ক কোনও ব্যক্তির আগে কখনও হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক না হয়ে থাকলে, তাঁকে অ্যাসপিরিন দেওয়ার আগে এই দিকটি বিশেষ ভাবে বিবেচনা করতে হয়।

ডা. ঢল বলেন, “রোজ অ্যাসপিরিন খেলে পাকস্থলী বা অন্ত্রে রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ এবং রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।” বয়স বেশি হলে, আগে আলসার বা রক্তক্ষরণের সমস্যা থাকলে কিংবা অন্য কিছু ওষুধ খেলে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই ষাটের পর প্রথম হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঠেকানোর জন্য নিয়ম করে অ্যাসপিরিন শুরু করার পরামর্শ সাধারণত দেওয়া হয় না। তাঁর কথায়, “চিকিৎসক সুনির্দিষ্ট কারণ দেখলে তবেই অ্যাসপিরিন খাওয়া উচিত।”

আগে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়ে থাকলে কী বদলায়?

আগে হৃদ্‌যন্ত্র বা রক্তনালির রোগ হয়নি, এমন কারও প্রথম হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঠেকানোর চেষ্টাকে চিকিৎসার পরিভাষায় বলা হয় ‘প্রাথমিক প্রতিরোধ’। ডা. ঢলের কথায়, “এ ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন থেকে সম্ভাব্য উপকার সামান্য হতে পারে। রক্তক্ষরণের ঝুঁকি সেই উপকারকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।”

অন্য দিকে, যাঁর এক বার হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়েছে, কিংবা হৃদ্‌যন্ত্র বা রক্তনালির রোগ ইতিমধ্যেই ধরা পড়েছে, তাঁর ক্ষেত্রে লক্ষ্য পরবর্তী হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঠেকানো। একে বলা হয় ‘সেকেন্ডারি প্রিভেনশন’। ডা. ঢল বলেন, “এই রোগীদের ক্ষেত্রে স্ট্যাটিনের ভূমিকা অনেক বেশি স্পষ্ট। উপযুক্ত ক্ষেত্রে অণুচক্রিকাকে জমাট বাঁধতে বাধা দেয় যে সব ওষুধ, সেগুলিরও স্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে।” কার জন্য কোন চিকিৎসা উপযুক্ত, তা স্থির করতে হয় তাঁর রোগের ইতিহাস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে।

ষাট বা সত্তরের কোঠায় প্রথমে কোন দিকে নজর দেবেন?

ডা. ঢলের কথায়, “হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের ভিত কোনও বড়ি নয়।” তিনি গুরুত্ব দেন নিয়মিত শরীরচর্চা, হৃদ্‌যন্ত্রের পক্ষে উপকারী খাবার, ওজন স্বাস্থ্যকর মাত্রায় রাখা এবং রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার উপর। তামাক এড়ানো, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও জরুরি। তিনি বলেন, “কোলেস্টেরলের মাত্রাও নিয়মিত দেখতে হবে। সামগ্রিক ঝুঁকি বিচার করে চিকিৎসায় উপকার হবে বলে মনে হলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।”

বয়স্ক মানুষ কতটা নিজের কাজ নিজে করতে পারেন, তাঁর অন্য কী অসুখ আছে, কী ওষুধ চলছে এবং তাঁর সম্ভাব্য আয়ু কত, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার সিদ্ধান্তে সবই বিবেচ্য। ডা. ঢলের কথায়, “লক্ষ্য হল, মানুষটি যাতে নিজের মতো জীবন কাটাতে পারেন এবং তাঁর জীবনযাত্রার মান বজায় থাকে, সে দিকে খেয়াল রেখেই হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো।”