হলদিয়া পুরসভার আসন্ন নির্বাচনে ৩০টি আসনের সবকটিতে বিজেপিকে জেতানোর লক্ষ্য বেঁধে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার, ২৬ অক্টোবর, পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে দলের নতুন জেলা কার্যালয়ের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে তাঁর নির্দেশ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খালি হাতে ফেরাতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাশে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি ‘দিমাগি নকশাল’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ এবং ‘ককরোচ’ শব্দ ব্যবহার করে বিরোধী শক্তিগুলিকে আক্রমণ করেন।

দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে শুভেন্দুর বক্তব্য, জেলার সমস্ত স্তরের সংগঠনকে পূর্ণ শক্তিতে হলদিয়ার নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে হবে। কোনও আসনেই বিরোধীদের জিততে দেওয়া চলবে না। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করতে গিয়ে তিনি ভিক্ষাপাত্রের প্রসঙ্গও তোলেন। অতীতে তাঁদের অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করে শুভেন্দু বলেন, ভবিষ্যতে বিরোধীরা যাতে আবার ক্ষতি করার সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কর্মীদেরই নিতে হবে।

পুরভোটের সাংগঠনিক প্রস্তুতির সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির প্রসঙ্গও জুড়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর আহ্বান, মোদীর হাত শক্ত করতে হবে এবং একজোট থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিদারদেরও তিনি একই আক্রমণের মধ্যে আনেন। তাঁর বক্তব্যে বিরোধীদের মাথাচাড়া দেওয়া এবং প্রভাব বিস্তার ঠেকানোর কথা উঠে আসে। জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, সনাতন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি।

তমলুকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার পশ্চিমবঙ্গকে ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’-এ পরিণত করার পরিকল্পনা করেছিল। তৃণমূলের জাতীয়তাবোধ ছিল না এবং তারা তোষণের রাজনীতি করত বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই বক্তব্যের পক্ষে তিনি রাজ্যের জন্য পৃথক গান, পতাকা এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান গ্রহণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।

শুভেন্দুর অভিযোগ, আগের সরকার অনুপ্রবেশকারীদের বাংলায় বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছিল। তাঁর দাবি, বর্তমান বিজেপি সরকার তাঁদের দেশ ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ করেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলনরত সিজেপিকেও নিশানা করেন তিনি। তবে ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’ তৈরির পরিকল্পনা এবং অনুপ্রবেশে সরকারি সহযোগিতার বক্তব্যগুলি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ; প্রকাশিত সংবাদগুলিতে সেগুলির সমর্থনে নির্দিষ্ট নথি বা তদন্তের সিদ্ধান্তের উল্লেখ নেই।

বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ভাষাটিও এই বক্তৃতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তুলনা তাদের মানুষ হিসেবে মর্যাদাকে খাটো করে। নির্বাচনে কাউকে পরাজিত করার আহ্বান গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ; কিন্তু প্রতিপক্ষকে কীটপতঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা অবমাননাকর। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের এই দিকটি তাই কেবল নির্বাচনী আস্ফালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; রাজনৈতিক মতভেদ প্রকাশের ভাষা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

নতুন দলীয় কার্যালয় নির্মাণের প্রসঙ্গেও পূর্ববর্তী সরকারকে আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, তমলুকের কার্যালয়ের জমির শ্রেণি পরিবর্তন, মিউটেশন এবং ভবনের নকশার অনুমোদন পেতে বিজেপিকে প্রায় দু’বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। দলের জমি থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের আরও ১৫টি জেলা কার্যালয়ের কাজ আটকে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের পরে প্রশাসন নিয়ম মেনে কাজ করছে এবং নির্ধারিত ফি দিয়েই দল প্রয়োজনীয় অনুমতি পেয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে বিজেপির ১০টি স্থায়ী জেলা কার্যালয় রয়েছে এবং আরও ১৫টির কাজ শুরু হয়েছে। তমলুকের প্রস্তাবিত কার্যালয়ে দলীয় কাজের পাশাপাশি একটি পাঠকক্ষ ও গ্রন্থাগার থাকবে। সেখানে বাংলার ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদ এবং ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে বই ও তথ্য রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তাম্রলিপ্তের ইতিহাস এবং বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, সতীশ সামন্ত, সুশীল ধাড়া ও অজয় মুখোপাধ্যায়ের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন শুভেন্দু। পূর্ণসময়ের দলীয় কর্মীদের থাকার ব্যবস্থাও ওই ভবনে করা হবে। মাঝে মাঝে সেখানে রাত কাটানোর জন্য নিজের জন্যও একটি ঘর রাখতে জেলা সভাপতিকে বলেছেন বলে জানান তিনি।

দুর্গাপুজোর আয়োজন নিয়েও নিজের সরকারের ভূমিকা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এ বছর রাজ্যে প্রায় ৬৬ হাজার দুর্গাপুজো হয়েছে। প্রায় ১৩ হাজার নতুন পুজো অনুমোদন পেয়েছে এবং অনুমতি আদায়ের জন্য আয়োজকদের আদালতে যেতে হয়নি। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর সরকার কাজ চালিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

উত্তর কলকাতার চোরবাগানে পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় শোকপ্রকাশও করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার কথা বলেন তিনি। শোকাহত পরিবারগুলির বাড়িতে ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছেন বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।

এর আগের দিন রামনগরে শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয়তাবোধ গড়ে তোলার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন শুভেন্দু। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বক্তৃতা, বিতর্ক ও কুইজ প্রতিযোগিতার পক্ষে সওয়াল করেন তিনি। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এবং রাজ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি কার্যকর করার কথাও বলেন। এনসিসির প্রসার বাধাগ্রস্ত করা এবং ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে সিঙ্গুর থেকে টাটাদের বিদায়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ তুলে পূর্ববর্তী সরকারকে আক্রমণ করেছিলেন তিনি। তাঁর যুক্তি, এনসিসির প্রশিক্ষণ তরুণদের অগ্নিবীর হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিতে সাহায্য করতে পারত। আগের সরকারের জয় হিন্দ বাহিনী গড়ার উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

দুই দিনের বক্তব্য মিলিয়ে স্পষ্ট, হলদিয়ার পুরভোটকে বৃহত্তর আদর্শগত প্রচারের সঙ্গে যুক্ত করছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্থানীয় নির্বাচনের লক্ষ্য হিসেবে সমস্ত আসন জয়ের নির্দেশের পাশাপাশি সামনে আনছেন মোদীর নেতৃত্ব, জাতীয়তাবাদ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। ফলে হলদিয়ার প্রচারে নাগরিক পরিষেবার প্রশ্নের সঙ্গে এই রাজনৈতিক বিষয়গুলিও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে মমতাকে সম্পূর্ণ শূন্য হাতে ফেরানোর লক্ষ্য পূরণ হবে কি না, তার নির্ধারক শেষ পর্যন্ত হলদিয়ার ভোটারদের রায়।