কলকাতার সরশুনায় এক তরুণ, তাঁর বাবা ও বন্ধুকে নগ্ন করে রাস্তায় হাঁটানোর অভিযোগের পরে পুলিশের ভূমিকাতেও বিতর্ক। ওই ঘটনায় গ্রেফতার তিন অভিযুক্তকে মঙ্গলবার খালি গায়ে, অন্তর্বাস পরিয়ে এবং কোমরে দড়ি বেঁধে এলাকায় হাঁটানো হয়। পুলিশের দাবি, অপরাধের ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতেই তাঁদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকাশ্যে অপমানের অভিযোগের তদন্তে নেমে অভিযুক্তদের একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনায় শাসক বিজেপি ও বিরোধী তৃণমূলের মধ্যে শুরু হয়েছে চাপানউতোর।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তিন অভিযুক্ত খালি পায়ে হাঁটছেন। তাঁদের কোমরে দড়ি বাঁধা, পাশে রয়েছেন পুলিশকর্মীরা। রাস্তার লোকজন মোবাইলে সেই দৃশ্য তুলছেন। যে এলাকায় তরুণ ও তাঁর পরিবারের সদস্যকে অপমানের অভিযোগ উঠেছিল, সেখানেই অভিযুক্তদের নিয়ে যায় পুলিশ। স্থানীয়দের একাংশ পুলিশের এই পদক্ষেপকে তাৎক্ষণিক বিচার বলে স্বাগত জানিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে অভিযোগগুলির তদন্ত তখনও চলছিল; অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচারপর্ব শেষ হওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠেনি।
ঘটনার সূত্রপাত রবিবার, ২৫ অক্টোবর। পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, তেরো বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন ওই তরুণ। সঙ্গে ছিলেন তাঁর এক বন্ধু। কিশোরীকে চুম্বন করার খবর তার পরিবারের কাছে পৌঁছনোর পরেই পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ, মেয়েটির বাবা ও মামা ওই দু’জনকে জোর করে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে আটকে রেখে তাঁদের মারধর করা হয়। পরে তরুণকে দিয়ে তাঁর বাবাকে ডেকে পাঠানো হয়।
ছেলের খবর পেয়ে বাবা সেখানে পৌঁছলে তাঁকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। সংবাদসংস্থা পিটিআইকে এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠে এসেছে। বাবাকে নাকি বলা হয়েছিল, হয় নিজের ছেলেকে হত্যা করতে হবে, নয়তো নগ্ন হয়ে রাস্তায় হাঁটতে হবে। প্রাণের ভয়ে বাবা ও ছেলে অপমানজনক নির্দেশ মেনে নেন বলে পরিবারের অভিযোগ। তরুণের বন্ধুকেও একইভাবে নিগ্রহ করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তরুণের বাবা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন, সেখানে পৌঁছনোর পরে অন্তত ছ’জন তাঁর উপর চড়াও হন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মেয়েটির মামাই আগ্নেয়াস্ত্র এনে ওই ভয়াবহ শর্ত দেন। শেষ পর্যন্ত তিনজনকে পোশাক খুলতে বাধ্য করে বাড়ির সামনের রাস্তায় প্রায় পঞ্চাশ মিটার হাঁটানো হয়। সেই দৃশ্যও মোবাইলে রেকর্ড করা হয়। মারধরের পাশাপাশি প্রকাশ্যে এই অপমানের কথা বলতে গিয়ে তিনি তাঁদের অসহায় অবস্থার বিবরণ দিয়েছেন। পরিবারের অভিযোগ, নির্দেশ অমান্য করলে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়েছিল।
নিগ্রহের ঘটনায় তরুণের মাকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরে তাঁর চিকিৎসাগত পরীক্ষা হয়েছে। কাচের বোতল দিয়ে মারধরের অভিযোগও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। বিশেষভাবে যাচাই করা হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ। ফলে পরিবারের দেওয়া বিবরণ, পুলিশের প্রাথমিক তথ্য এবং তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিষয়গুলির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, ঘটনার প্রত্যেকটি অংশের প্রমাণ সংগ্রহ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ক্ষোভ তৈরি হয়। পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তেজিত বাসিন্দাদের একাংশ মেয়েটির পরিবারের বাড়িতে ভাঙচুরের চেষ্টা করেন। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এক আধিকারিক জানিয়েছেন, পুলিশ পৌঁছনোর আগে পরিবারের কয়েকজন সরে যান। মেয়েটির মামাকে স্থানীয় বাসিন্দারা ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন। সংবাদসংস্থাটি অবশ্য মূল নিগ্রহের ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে। সোমবারের গ্রেফতারির পরে মঙ্গলবার অভিযুক্তদের এলাকায় নিয়ে আসা হয়।
তরুণের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে। তার মধ্যে খুনের চেষ্টা, আঘাত করা, বেআইনি আটকে রাখা, ভয় দেখানো ও অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশি পদযাত্রা সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি। তবে এক পদস্থ আধিকারিক সংবাদপত্রটিকে বলেছেন, ধৃতদের অপরাধের ঘটনা পুনর্নির্মাণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। রাজ্যের মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা ইন্দ্রনীল খান অভিযোগ করেছেন, অভিযুক্তদের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের সময় এঁরা অস্ত্র নিয়ে এলাকায় ভয় দেখানো ও ভোটে কারচুপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রভাব কমলেও পুরনো মানসিকতা বদলায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, এমন অপরাধের পরিকল্পনা করলে কী পরিণতি হতে পারে, তা অপরাধীদের বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। অভিযুক্তদের রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি অবশ্য তাঁর অভিযোগ হিসেবেই এসেছে।
অন্যদিকে তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায় ঘটনাকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দু’পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার দায় ও পুলিশি ব্যবস্থার মূল্যায়ন নিয়ে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। বিজেপি নেতৃত্ব কঠোর পরিণতির কথা বলছেন, আর বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে।
মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্রের অভিযোগ, পুলিশের এমন আচরণ জনতাকেও আইন হাতে তুলে নিতে উৎসাহ দিতে পারে। ফলে ঘটনাটি একটি পরিবারের নিগ্রহ কিংবা অভিযুক্তদের গ্রেফতারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। আইন প্রয়োগের পদ্ধতি জনসাধারণের কাছে কী বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, প্রশ্নও উঠছে। পুলিশের পদক্ষেপ ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে তদন্তের প্রয়োজন এবং প্রকাশ্য অপমানের সীমারেখা।
সরশুনার ঘটনায় তাই পাশাপাশি রয়েছে দুটি প্রশ্ন। প্রথমটি, তরুণ ও তাঁর পরিবারের উপর অত্যাচারের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণ। দ্বিতীয়টি, সেই তদন্তের নামে ধৃতদের প্রকাশ্যে অর্ধনগ্ন অবস্থায় হাঁটানোর প্রয়োজনীয়তা। স্থানীয় ক্ষোভ প্রশমনের সঙ্গে তদন্তের পদ্ধতিকে এক করে দেখা যায় কি না, সেই বিতর্কই সামনে এসেছে। অপরাধের পুনর্নির্মাণে কী তথ্য পাওয়া গেল এবং কেন এমন পোশাকে অভিযুক্তদের নিয়ে যাওয়া হল, পুলিশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।