দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে এক বিচারাধীন বন্দির মৃত্যু ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। মৃত বাসুদেব নস্করের স্ত্রী সোনালি নস্করের অভিযোগ, তাঁর স্বামীকে খুন করা হয়েছে। সোমবার হাসপাতালে গিয়ে স্বামীকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখেছিলেন বলে দাবি করেছেন তিনি। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, তাঁর মৃত্যুর খবর পান। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়েছেন সোনালি।
বাসুদেবের বয়স ৪৪ বছর। বাড়ি বারুইপুরের বেতবেড়িয়া এলাকায়। বৈধ চিকিৎসা সংক্রান্ত ডিগ্রি বা শংসাপত্র ছাড়াই চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা চালানোর অভিযোগে চলতি মাসে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে ভুয়ো মৃত্যুর শংসাপত্র দেওয়ার অভিযোগও ছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে। আদালতের নির্দেশে তিনি জেল হেফাজতে ছিলেন। পরে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
সোনালির বক্তব্য অনুযায়ী, সোমবার তাঁকে জানানো হয় যে তাঁর স্বামী অসুস্থ। সেই খবর পেয়ে প্রথমে সংশোধনাগারে যান তিনি। সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন, বাসুদেবকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এরপর বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে গিয়ে তিনি স্বামীকে দেখতে পান। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালের শয্যায় বাসুদেবের হাত এবং পা বাঁধা ছিল। স্বামীকে ওই অবস্থায় দেখে সেদিন বাড়ি ফিরে যান তিনি।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আবার হাসপাতালে পৌঁছোন সোনালি। তখন তাঁকে জানানো হয়, বাসুদেব মারা গিয়েছেন। স্বামীর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশ তাঁদের যথাযথ ভাবে অবহিত করেনি বলে অভিযোগ তাঁর। বিশেষ করে মৃত্যুসংবাদ আনুষ্ঠানিক ভাবে না জানানোর বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, বাসুদেবের এমন কোনও রোগ ছিল না, যাতে হঠাৎ মৃত্যু হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বামীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার দাবিও করেছেন সোনালি। তাঁর অভিযোগ, হেফাজতে মারধরের জেরেই বাসুদেবের মৃত্যু হয়েছে। স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা ভুয়ো চিকিৎসার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, চিকিৎসা করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা বাসুদেবের ছিল। যদিও তাঁর এই বক্তব্য এবং নির্যাতনের অভিযোগ স্বাধীন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে সেই পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে। এক পুলিশকর্তা জানিয়েছেন, কী কারণে বিচারাধীন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, ময়নাতদন্তের ফল থেকেই তা বোঝার চেষ্টা করা হবে। রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে। আপাতত পুলিশ মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
বাসুদেব ঠিক কী অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, সেখানে তাঁর কী চিকিৎসা চলছিল অথবা পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী কেন তাঁর হাত-পা বাঁধা ছিল, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। পরিবারের অভিযোগ যাচাইয়ের পাশাপাশি এই বিষয়গুলিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। মানবাধিকার কর্মী বিজয়কুমার সিংহও মৃত্যুর ঘটনার যথাযথ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ।
এই ঘটনায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। অসুস্থতার খবর দেওয়া হলেও হাসপাতালে স্থানান্তর এবং মৃত্যুর সংবাদ কখন, কী ভাবে জানানো হয়েছিল, তা নিয়ে সোনালির অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের বক্তব্য মিলিয়ে সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
এর আগে ১৩ অক্টোবর একই হাসপাতালের শৌচাগার থেকে আজহারুল লস্কর নামে আর এক বিচারাধীন বন্দির দেহ উদ্ধার হয়েছিল। তার ঠিক দু’সপ্তাহের মধ্যে বাসুদেবের মৃত্যু ঘটল। একই হাসপাতালে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বন্দির মৃত্যু চিকিৎসাধীন বন্দিদের নিরাপত্তা এবং তাঁদের উপর নজরদারির ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনও যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাসুদেবের ক্ষেত্রেও খুন বা নির্যাতনের অভিযোগ এখনও তদন্তসাপেক্ষ। ময়নাতদন্তের ফল, চিকিৎসার নথি এবং হাসপাতালে তাঁর অবস্থানের সময়কার ঘটনাক্রম যাচাই করা মৃত্যুর পরিস্থিতি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। পরিবারের মূল দাবি, কী ঘটেছিল তার স্পষ্ট উত্তর দিতে হবে।