চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্যে দু’টি পৃথক পুলিশি ‘এনকাউন্টারে’ মৃত্যু হল দুই অভিযুক্তের। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনে ধৃত প্রহ্লাদ দাস এবং মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় অভিযুক্ত শামাউল শেখ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। দু’টি ক্ষেত্রেই পুলিশের দাবি, তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরে অভিযুক্তরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ায় গুলি চালাতে হয়। পরপর দুই মৃত্যুতে পুলিশি ভূমিকা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এই আবহে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, নেশামুক্তি এবং মহিলাদের উপর অত্যাচার মোকাবিলায় পুলিশকে পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, “পুলিশকে দুটো বিষয়ে কমপ্লিটলি ছাড় দেওয়া আছে।” প্রয়োজন হলে পুলিশকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাসও দেন তিনি। তবে নির্দিষ্ট এনকাউন্টারের কারণ সম্পর্কে পুলিশই বক্তব্য জানিয়েছে বলে আলাদা মন্তব্য এড়িয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। সুজিতের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠক সেরে কলকাতায় ফেরার পরে এই মন্তব্য করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্য থেকে দুষ্কৃতীদের সরাতে আইন মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে; পুলিশ বিপদে পড়লে তিনি তাদের রক্ষাকবচ হবেন।
প্রথম ঘটনাটি গাইঘাটার। ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া প্রহ্লাদের বয়স ২৩ বছর। শনিবার রাতে বাড়ির কাছে একটি গানের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিল একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী। পরিবারের বক্তব্য, রাতের দিকে একটি ফোন আসার পরে সে অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে যায়; আর ফেরেনি। রবিবার সকালে তার দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনার তদন্তে প্রহ্লাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিশোরীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, সোমবার গভীর রাতে প্রহ্লাদকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণে বেরিয়েছিলেন তদন্তকারীরা। ফেরার সময়ে সে এক পুলিশ আধিকারিকের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায় বলে অভিযোগ। পুলিশ সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত তিন রাউন্ড গুলি চালানোর পরে আত্মরক্ষায় পাল্টা চার রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ প্রহ্লাদকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত ঘোষণা করা হয়। এক পুলিশকর্মী গুলি থেকে বাঁচতে রাস্তার পাশের জলে ঝাঁপ দেন বলেও পুলিশের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
প্রহ্লাদের পরিবার অবশ্য এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তার মায়ের বক্তব্য, তাঁরা ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন; অপরাধ করে থাকলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছিলেন, এনকাউন্টারে মৃত্যু চাননি। এত পুলিশকর্মীর উপস্থিতিতে একজন ধৃত কীভাবে অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করতে পারে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বাবা-মা। পুলিশের কাছ থেকে মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরে তাঁরা হাসপাতালে যান। ছেলের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের আপত্তি তদন্তকারী বাহিনীর বক্তব্যের পাশাপাশি সামনে এসেছে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি মঙ্গলবার সামশেরগঞ্জের পুরনো ডাকবাংলো এলাকায়। সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় অভিযুক্ত শামাউলকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন সিআইডির তদন্তকারীরা। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে সে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং গুলি চলে। পাল্টা গুলিতে আহত হওয়ার পরে হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। জঙ্গিপুর পুলিশ জানিয়েছে, মূল খুনের তদন্ত করছে সিআইডি। শামাউলের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
সুজিতের নিখোঁজ হওয়া এবং পরে তাঁর দেহাংশ উদ্ধারের ঘটনা ঘিরে আগেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তিনি ২৮ অগস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে দেহাংশ উদ্ধারের ভিত্তিতে খুনের তদন্ত এগোয়। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতি এবং সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। সেই অভিযোগের জেরে কয়েকজন পুলিশ আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়, বদলিও করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তভার যায় সিআইডির হাতে। সেই মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন শামাউল।
জোড়া ঘটনার পরে শাসক বিজেপির নেতারা পুলিশের পদক্ষেপ সমর্থন করেছেন। রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, পুলিশের উপরে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন; কখনও এমন পদক্ষেপও করতে হয়, যা সকলের পছন্দ হবে না। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার ফলে অপরাধীদের ভয় কমে গিয়েছিল। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও ঘটনাগুলিকে পুলিশের আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করছে পুলিশ।
বিরোধীরা পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের হাতে বারবার পুলিশের অস্ত্র পৌঁছচ্ছে কীভাবে। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, অপরাধ যত গুরুতরই হোক, দোষ নির্ধারণ ও সাজা দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাইলেও বিচারপ্রক্রিয়া মানতে হবে। কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর অভিযোগ, আইনি ব্যবস্থার সমান্তরালে এনকাউন্টারকে একটি ধারাবাহিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে অভিযুক্তের মৃত্যু হলে অপরাধের অন্য যোগসূত্র এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা আড়ালেই থেকে যেতে পারে।
তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ও সরকারের ব্যাখ্যা এবং তদন্ত দাবি করেছেন। গাইঘাটার ঘটনা নিয়ে তাঁর বক্তব্য, বারুইপুরের পরে আবার একই ধরনের মৃত্যু ঘটায় পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন। জুলাই মাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। সেখানেও পুলিশের দাবি ছিল, পুনর্নির্মাণের সময়ে অভিযুক্ত অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালানোয় আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি ছুড়তে হয়।
ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন একই প্রশ্ন: পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রম কতটা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে প্রমাণে। গুরুতর অপরাধের তদন্ত করতে নিয়ে যাওয়া ধৃতদের নিরাপত্তা, পুলিশকর্মীদের অস্ত্র সুরক্ষিত রাখা এবং গুলি চালানোর পরিস্থিতি—সবই যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। অপরাধ দমনে কঠোরতার পক্ষে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হলেও, পরপর একই ধরনের মৃত্যুর ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রশ্নটি তাতে মিটছে না। দুই মূল অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি এই মৃত্যুগুলির পরিস্থিতি স্পষ্ট করাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।